ইতিহাস বিকৃতকারীরা যেন ক্ষমতায় আসতে না পারে

ইতিহাস বিকৃতকারীরা যেন ক্ষমতায় আসতে না পারে

স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা অফিস : জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেস্কোর বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়ায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আনন্দ শোভাযাত্রায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশকে গড়ে তোলার প্রত্যয় জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, রাজাকার, আলবদর, যুদ্ধাপরাধী, খুনি, যারা ইতিহাস বিৃকতকারী তারা যেনো এদেশে কোনোদিন ক্ষমতায় আসতে না পারে। এই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আমরা বাংলাদেশকে গড়ে তুলব। শনিবার আনন্দ শোভাযাত্রা শেষে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সারা দেশে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে দিনটিকে উদযাপন করা হয়। কেন্দ্রীয়ভাবে রাজধানীতে দুপুর ১২টায় ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে সরকারি উদ্যোগে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির এই উদযাপন শুরু হয়। প্রথমে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম, মুখ্য সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সচিব সুরাইয়া বেগম বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোজাম্মেল হক খান, এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হকসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবরা ।

 

 

৩২ নম্বরে পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে সেখান থেকে আনন্দ শোভাযাত্রা নিয়ে সোহরাওয়ার্দীতে যান সরকারি কর্মকর্তারা। শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। শোভাযাত্রার সামনে ছিল হাতি আর ঘোড়ার গাড়ি, এরপর ছিল বর্ণাঢ্য সাজে সজ্জিত ট্রাক। শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের হাতে থাকা ব্যানার-ফেস্টুনে ‘সাত কোটি মানুষকে দাবায় রাখতে পারবা না’, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’- বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের বিভিন্ন অংশ লেখা ছিল। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে থেকেই শাহবাগ মোড়, রমনা পার্ক, হাইকোর্ট মোড়, দোয়েল চত্বর, টিএসসি এলাকা জনস্রোতে পরিণত হয়। বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পোশাক পরে জাতীয় পতাকা, রঙিন টুপি মাথায় সভাস্থলে যোগ দেয়। ১৯৭১ সালে এই উদ্যানেই ৭ মার্চের ভাষণ রাখেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বিকাল ৩টায় শুরু হয় মূল সমাবেশ, যাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হন। প্রধানমন্ত্রীর সমাবেশস্থলে আসার পর জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে সমাবেশের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলমের স্বাগত বক্তব্যের পর ৭ মার্চের ভাষণের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন মুখ্য সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী। এরপর ৭ মার্চের ভাষণ বাজানো হয়। অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে নাচ, গান, আবৃত্তি পরিবেশনা চলে। পরে বেলা পৌনে ৪টার দিকে শুরু হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণ। সভামঞ্চের সামনের দর্শক সারিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশারফুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, ড. হাছান মাহমুদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

২২ মিনিটের বক্তব্যের শুরুতেই ৭ মার্চ দিনটিকে ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা সেদিন এসেছিলাম, বক্তৃতা শুনেছিলাম, আন্দোলন তরঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল, তাও দেখেছিলাম।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের আধেয় বিশ্লেষণ করে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা বলেন, এত দুরদর্শী ও এত নির্দেশনা বিশ্বের আর কোনো ভাষণে নেই। এই ভাষণে বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের কথা বলেছিলেন, গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলেছিলেন। তিনি জয়বাংলা বলে তাঁর ভাষণ শেষ করেছিলেন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু এ দেশের মানুষকে রাজনৈতিক মুক্তি দিয়েছেন, অর্থনৈতিক মুক্তি দেওয়ার পথে হাঁটা শুরু করেছিলেন। দেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু তখনই স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। বাংলাদেশ নামটাও বঙ্গবন্ধুর দেওয়া। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেদিন শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যাই করা হয়নি, তাঁর আদর্শ নষ্ট করে এ দেশে রাজাকার-খুনিদের ক্ষমতায় বসানো হয়েছিল।

৭৫ এর পর এই দেশে ৭ মার্চের ভাষণ বাজাতে দেওয়া হয়নি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৭৫ এর পর এই ভাষণ ছিল নিষিদ্ধ। বাজাতে গিয়ে বাধা এসেছে। কতো মানুষ জীবন দিয়েছে ভাষণ বাজানোর অপরাধে। এই ভাষণ এখন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। প্রমাণ হয়েছে ইতিহাস সত্য, চিরভাস্বর। ভাষণ প্রচারের বিরোধিতাকারীদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, আজকে তারা কোথায় মুখ লুকাবে। তারা এই ভাষণ সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলতে চেয়েছিল।

ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ কী হবে- সেটাও বঙ্গবন্ধু ভাষণে বলে গেছেন মন্তব্য করে সরকারপ্রধান বলেন, আমরা আজকে স্বাধীন জাতি। যে বাংলাদেশকে একসময় মানুষ একেবারে একটা দরিদ্র দেশ হিসেবে করুণার চোখে দেখতো, আল্লার রহমতে ২১ বছর পর সরকারে এসে জাতির পিতার আদর্শ নিয়ে আমরা কাজ করেছি। আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় এসেছে তখন থেকেই আন্তর্জাতিকভাবে বাঙালি জাতি মর্যাদা পেয়েছে। আজকে বিশ্বে আমরা উন্নয়নের রোল মডেল। আজকে কেউ আমাদের করুণা করতে পারে না। আজকে আমরা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। এই ভাষণের মধ্য দিয়েই জাতির পিতা বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ দিয়েছেন। বাংলাদেশ হবে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ, ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ দেশ। বাংলাদেশ হবে জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ। ইনশাল্লাহ সেই বাংলাদেশকে আমরা গড়ে তুলব। বঙ্গবন্ধুর ভাষণকে স্বীকৃতি দেওয়ার কারণে তিনি ইউনেস্কোকে ধন্যবাদ জানান।