৩ হাজার টাকার স্যালাইন স্ট্যান্ড ৬০ হাজারে কেনার প্রস্তাব!

৩ হাজার টাকার স্যালাইন স্ট্যান্ড ৬০ হাজারে কেনার প্রস্তাব!

ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পর্দাকাণ্ডের খবর এখন পুরনো। শত আলোচনা-সমালোচনার পর এমন কাণ্ড থেমে নেই। স্বাস্থ্যখাতে সামনে যেসব বরাদ্দ পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব আকারে পেশ করা হচ্ছে সেখানেও থাকছে পুকুর চুরির ফাঁদ।
 


সম্প্রতি মেডিক্যাল কলেজ হাসাপাতাল ৫০ বেডেড ও জেলা সদর হাসপাতালে ১০ বেডেড কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপন উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) তিন হাজার টাকার স্যালাইন স্ট্যান্ডের দাম প্রস্তাব করা হয়েছে ৬০ হাজার টাকা। প্রকল্পের আওতায় পরিকল্পনা কমিশনে এ প্রস্তাব করেছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। 

এখানেই শেষ নয়, ওই ডিপিপিতে এমন আরও অনেক অসঙ্গতি রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় আসবাবপত্র কেনা বাবদ ১০ কোটি ৮১ লাখ টাকা, যন্ত্রপাতি সংগ্রহ বাবদ ২২০ কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র ও যানবাহন কেনাকাটায়ও রয়েছে নানান অসঙ্গতি।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, প্রচলিত সরকারি বিধি অনুসারে ৫০ কোটি টাকার ওপর কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর আগে প্রস্তাবিত স্থানের সম্ভাব্যতা (ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি) যাচাই করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে পরিকল্পনা কমিশনের আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগে পাঠানো হয়। প্রকল্পের সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি কেনার খরচের যে প্রস্তাবনাটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে সেই প্রস্তাবে রয়েছে নানান অসঙ্গতি।

সম্প্রতি শেরেবাংলা নগরের পরিকল্পনা কমিশনে এ প্রস্তাবিত প্রকল্পের ওপর পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সভাকক্ষে সদস্য (সচিব) আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। পিইসি সভায় উঠে আসে প্রস্তাবিত প্রকল্পের অসঙ্গতিগুলো। 

এর আগে জনবলের অভাবে কয়েক কোটি টাকার যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে গেছে। তারপরও যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্রের ব্যয় প্রাক্কলনের বড় রকমের অসঙ্গতিগুলো পরিকল্পনা কমিশনের পিইসি সভায় তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, কোনো হাসপাতালে স্যালাইন স্ট্যান্ডের মূল্য ৩ হাজার টাকা, কোথাও ৬০ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। এছাড়া লুকিং গ্লাসের মূল্য কোথাও ৫ হাজার আবার কোথাও ২০ হাজার টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে।

সভায় উপস্থিত থাকা পরিকল্পনা কমিশনের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রস্তাবিত প্রকল্পে কয়েকটি খাতে অস্বাভাবিক ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। যেমন একটি তিন হাজার টাকার স্যালাইন স্ট্যান্ডের দাম ৬০ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। এমন প্রকল্প আমরা কিছুতেই অনুমোদন দিতে পারি না। তাই ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) সংশোধনের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রকল্পটি ফেরত পাঠিয়েছি।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের প্রকল্পে দেখা যায়, কিডনি রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ ও চিকিৎসার উপকরণ (মেডিসিন অ্যান্ড সার্জিক্যাল রিকুইজিট—এমএসআর) কেনার প্রাক্কলন ও এমএসআর-এর অন্তর্ভুক্ত সামগ্রীতে বড় ধরনের অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। যেমন মোট ৪৭টি প্রকল্পে এমএসআর স্থানের জন্য মোট ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৫০ লাখ ১ হাজার টাকা। এমন ব্যয় প্রাক্কলনের বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করেই অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে ডিপিপি পাঠানোর জন্য সভায় ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। 

যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র ও এমএসআর এর পরিমাণ, ধরন ও প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণে মন্ত্রণালয় পর্যায়ে গঠিত একটি কমিটি তৈরি করা হয়েছে। যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্রের পাশাপাশি কম্পিউটার  ও আনুষঙ্গিক বাবদ ১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করা হলেও কোনো বিভাজন দেওয়া হয়নি। ডিপিপিতে ব্যাখ্যাও নেই। একটি ধারণার ওপর ভিত্তি করেই এমন ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। 

প্রকল্পের আওতায় স্ট্যাম্প, সিল ও স্টেশনারির ক্ষেত্রে বিভিন্ন ব্র্যান্ড উল্লেখ করা হয়েছে যা গ্রহণযোগ্য নয়। ডিপিপিতে দুই ধরনের ক্রয় পরিকল্পনা দেওয়া হয়েছে যা বিভ্রান্তিমূলক বলে উল্লেখ করেছে কমিশন।

প্রকল্পের আওতায় যানবাহন কেনার ক্ষেত্রেও বড় অসঙ্গতি দেখা গেছে। প্রকল্প পরিচালকের জন্য ৯১ লাখ ৬৭ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি জিপ কেনার কথা বলা হয়েছে যা স্বাভাবিকের থেকে অনেক বেশি দামের। প্রকল্পের মালামাল পরিবহনের জন্য ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি ডাবল পিক-আপ কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। যেহেতু কোনো নির্মাণকাজ এ প্রকল্পের আওতায় গ্রহণ করা হয়নি সেহেতু ডাবল পিকআপ কেনার প্রস্তাব বাতিল করা হয়েছে।

এই প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যুগ্ম-সচিব (উন্নয়ন অধিসাখা) সাইফুল্লাহিল আজম বলেন, প্রকল্পটি একেবারেই নতুন। প্রকল্পের আওতায় মেডিক্যাল কলেজ হাসাপাতালে ৫০ বেডেড ও জেলা সদর হাসপাতালে ১০ বেডেড কিডনি ডায়লাইসিস সেন্টার স্থাপন করা হবে।

প্রকল্পের কিছু খাতে ব্যয় তারতম্য প্রসঙ্গে সাইফুল্লাহিল আজম বলেন, আমি উন্নয়ন শাখায় নতুন এসেছি। তাই এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারবো না।

অন্যদিকে প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য কিডনি রোগের মানসম্মত চিকিৎসা সেবা সম্প্রসারণ, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবল সরবরাহের মাধ্যমে কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা উন্নীতকরণ এবং কিডনি রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমানো। এই লক্ষ্যে প্রকল্পটি ২৫৩ কোটি ২ লাখ টাকা ব্যয়ে চলতি সময় থেকে জুন ২০২২ মেয়াদে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।