২০২১ সালের মধ্যে দারিদ্র্যমুক্ত করার দাবি

২০২১ সালের মধ্যে দারিদ্র্যমুক্ত করার দাবি

আতাউর রহমান মিটন : লোভের আগুনে আবারও পুড়লো ঢাকা। পুরান ঢাকার নিমতলীর পরে চকবাজারের চুড়িহাট্টা। সর্বশেষ বনানী হয়ে গুলশান কাঁচা বাজার। দেশবাসী জানেন গত ২৮ মার্চ এফ আর টাওয়ারের অগ্নিকান্ডে ২৬ জন অকালে মারা গেছেন। আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও অনেকেই। ৩০ মার্চ গুলশানের অগ্নিকান্ডে অবশ্য কেউ মারা যাননি, সেখানে অনেকগুলো দোকানঘর পুড়ে ছাই হয়েছে। বনানীর অগ্নিকান্ডে নিহতদের শোকাহত চিত্তে স্মরণ করছি এবং গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি নিহতদের পরিবার ও আহতদের প্রতি। অগ্নিকান্ডের এই ঘটনাগুলো তদন্ত করার জন্য কমিটি গঠিত হয়েছে। জনগণ চায়, তদন্ত রিপোর্ট জনসমক্ষে প্রকাশ করা হোক এবং দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। পাশাপাশি অগ্নিকান্ড প্রতিরোধসহ সামগ্রিক দুর্যোগ মোকাবেলায় জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক।
ঢাকার অগ্নিকান্ডের ঘটনা এখন আমাদের মনোজগত জুড়ে। ফলে আমরা অন্যান্য অনেক কিছুই এখন হয়তো ভুলে গেছি বা আমাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেছে। যেমন সড়কে মৃত্যুর মিছিল। ইতোমধ্যে আমরা জেনেছি যে, বাংলাদেশে প্রায় ৩৩ লক্ষ রেজিষ্টার্ড গাড়ি আছে এবং সারাদেশে ছোট-বড় মিলিয়ে চলমান মোট গাড়ির সংখ্যা প্রায় ৬০ লক্ষ। অথচ আমাদের লাইসেন্সধারী চালকের সংখ্যা মাত্র প্রায় ২০ লাখ। অর্থাৎ প্রায় এক তৃতীয়াংশ যানবাহন চলছে লাইসেন্সবিহীন চালকের দ্বারা। সড়ক দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ অদক্ষ চালকদের দ্বারা গাড়ি চালানো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনায় আমাদের ক্ষতির পরিমাণ  জিডিপি’র ২%, যা প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। এই টাকা দিয়ে একটা পদ্মা সেতু তৈরি করা যায়। অন্য এক হিসেব বলছে, প্রতিদিন রাজধানীতে ট্রাফিক জ্যামে পড়ে একজন মানুষের গড়ে ২ ঘন্টা সময় নষ্ট হলে এই শহরের প্রায় ২৫ লক্ষ কর্মজীবী মানুষের প্রায় ৫০ লক্ষ কর্মঘন্টা নষ্ট হয় প্রতিদিন! এরই মধ্যে চলছে মেট্রোরেল নির্মাণের মহা আয়োজন। সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষের প্রশ্ন এই মেট্রোরেল কাদের জন্য? গরীব মানুষ এই রেলে চড়তে পারবে তো?
‘উন্নয়ন কার জন্য?’ প্রশ্নটা প্রায় সবারই। বিশ্বে মাত্র ২৬ জন মানুষের হাতে যা সম্পদ রয়েছে তা ৩৫০ কোটি মানুষের মোট সম্পদের সমান। বাংলাদেশেও মাত্র কয়েকজন ব্যক্তি বা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেশের অধিক সম্পদ জমা হয়েছে। প্রচলিত উন্নয়নের চাকা ঘুরছে বটে কিন্তু বিরাজমান এই চরম বৈষম্য কমাতে সহায়তা করছে না। প্রশ্ন হচ্ছে এর কারণ কি? আমাদের মহান সংবিধানের প্রস্তাবনাতে উল্লেখ করা হয়েছে, “আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠাÑযেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।” আমাদের বর্তমানের বাংলাদেশ কি সেই পথে হাঁটছে?
আমরা সকলেই জানি, পাকিস্তান রাষ্ট্রে আমাদের এই ভূখন্ডের মানুষদের প্রতি চরম অবহেলা ও উদাসীনতা প্রদর্শন করা হয়েছিল। আমাদের কষ্টের সম্পদ নিয়ে গিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে উন্নয়নের প্রাসাদ নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছে। আমাদের প্রতি প্রদর্শন করা হয়েছে চরম অবহেলা, আমাদের বঞ্চিত করা হয়েছে অমানবিকভাবে। ওরা আমাদের মুখের ভাষাই শুধু কেড়ে নিতে চায়নি, ওরা আমাদের ভবিষ্যত, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার থেকে আমাদের বঞ্চিত করতে চেয়েছে। কিন্তু আমরা সেটা মেনে নেইনি। আমরা প্রতিবাদ করেছি। ওরা ভেবেছিল আমাদের দাবায়ে রাখবে কিন্তু বাঙালিকে দাবায়ে রাখা যায় না!
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে স্পষ্ট করে বলেছিলেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম”। বঙ্গবন্ধু বাঙালীর স্বাধীনতা ও মুক্তিকে যুগপৎ ও সমার্থক করে আমাদের সামনে তুলে ধরেছিলেন। পাকিস্তানীদের শোষণের বিরুদ্ধে আমরা সেদিন শ্লোগান দিয়েছিলাম, “কেউ খাবে তো, কেউ খাবে না, তা হবে না হবে না”। এই শ্লোগানের তাৎপর্য অনেক গভীর এবং এটাই আমাদের মুক্তির প্রেরণা! অর্থাৎ বৈষম্যহীন, সুন্দর আগামী গড়ার প্রেরণাতেই জন্ম নিয়েছিল আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ!  দেশ গড়ার দায়িত্ব নিয়ে বঙ্গবন্ধু আরও বলেছিলেন, “এ স্বাধীনতা আমার ব্যর্থ হয়ে যাবে যদি আমার বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না খায়। এই স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়। এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি এদেশের মানুষ যারা আমার যুবক শ্রেণী আছে তারা চাকুরি না পায় বা কাজ না পায়।” (দ্রষ্টব্য: আওয়ামী লীগ এর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনী ইশতেহার) লাখো মানুষের রক্তে লেখা আমাদের সংবিধানের ১৫ (ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সকল নাগরিকের মৌলিক চাহিদাসমূহ পূরণের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের অন্যতম ‘মৌলিক দায়িত্ব’। বর্তমান সরকার এই দায়িত্ব পালনে অঙ্গীকারবদ্ধ। ক্ষমতাসীন দলের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনী ইশতেহারে “দারিদ্র্য নির্মূল” বিশেষ অঙ্গীকার হিসেবে ঘোষিত। এই ইশতেহারে ২০২৩ সালের মধ্যে দরিদ্র জনসংখ্যা ২.২ কোটির নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ব্যক্ত হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা কমিশন প্রণীত ‘প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০১০-২০২১’ দলিলে বলা হয়েছে, ‘মাথাগুণতি জাতীয় দারিদ্র্য ১৯৯১-৯২ সালের ৫৮.৮ শতাংশ থেকে কমে গিয়ে ২০১০ সালে ৩১.৫ শতাংশে দাঁড়ায় এবং একই সময়কালে চরম দারিদ্র্য হার ৪১ থেকে ১৭.৬ শতাংশে নেমে আসে। ... আয় বৈষম্য পরিস্থিতির সামান্য উন্নতিসহ এই ধারাগুলো বজায় থাকলে ২০১৫ সালে মাথাগুণতি দারিদ্র্য হার হ্রাস পেয়ে ২২.৫ শতাংশে উপনীত হবে এবং ২০২১ সালে তা এসে দাঁড়াবে ১৩.৫ শতাংশে। অর্থাৎ এটা স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে যে, ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে দারিদ্র্য সম্পূর্ণ দূর করার কোন পরিকল্পনা সরকারের নেই। পরিকল্পনাতেই যদি না থাকে তাহলে তা বাস্তবায়নের কোন উদ্যোগ নেয়া হবে না সেটাই স্বাভাবিক। সরকারের এই অবস্থানের প্রেক্ষিতে আমাদের প্রশ্ন কারা এই হতভাগ্য ২.২ কোটি জনগণ? কেন তাদের দারিদ্র্য দূরীকরণের পরিকল্পনার বাইরে রাখা হচ্ছে? এরা কি এদেশের জনগণ নয়?
আমাদের সংবিধানের ১৯.২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “মানুষে মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য বিলোপ করিবার জন্য, নাগরিকদের মধ্যে সম্পদের সুষম বন্টন নিশ্চিত করিবার জন্য এবং প্রজাতন্ত্রের সর্বত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমান স্তর অর্জনের উদ্দেশ্যে সুষম সুযোগ-সুবিধাদান নিশ্চিত করিবার জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।” অসাম্য বিলোপের সেই সুমহান চেতনা থেকেই ২০২১ সালের মধ্যে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য নির্মূলে গত ৩০ মার্চ নাগরিক সংগঠন ‘প্রত্যাশা ২০২১ ফোরাম’ ঢাকায় এক সম্মেলনে দারিদ্র্য নির্মূল সংক্রান্ত নানা প্রস্তাব পেশ করেছে।
টেকসইভাবে দারিদ্র্য নির্মূল করতে হলে স্থানীয় উদ্যোগ বৃদ্ধিতে সহায়তা জোরদার করতে হবে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং সামাজিক অন্তর্ভূক্তিমূলক সমন্বিত কর্মসূচিগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। মূল কথাটা হচ্ছে, গন্ডির বাইরে বেরিয়ে চিন্তা করা। ফুটো পাত্র দিয়ে পানি সেচলে যেমন ফল হয় না, ঠিক তেমনি পুরনো, গতানুগতিক, উপর থেকে চাপিয়ে দেয়া চিন্তা দিয়ে দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। টেইসইভাবে দারিদ্র্য নির্মূল করতে চাইলে দরিদ্র মানুষদেরই দায়িত্ব দিতে হবে। তাদের কথা হৃদয় দিয়ে শুনতে হবে, সক্ষমতা বাড়াতে হবে, তাদের সহযোগিতা করতে হবে আন্তরিকতার সাথে। মানুষের মনে ভরসা জাগিয়ে তুলতে হবে। লুটপাট ও অনিয়ম রোধ এবং সরকারী কর্মসূচিগুলোর সুষ্ঠু বাস্তবায়ন, তথা ‘প্রকৃত সেবাগ্রহিতা’ চিহ্নিত করে সেবাদান করা হলে দেশের চেহারা পাল্টে যাবে। এর জন্য সম্ভাব্য সকল ক্ষেত্রে সেবাদানে ‘ডিজিটালাইজেশন’ করতে হবে। ভিক্ষা দিয়ে ভিক্ষুক বানানো যায়, দারিদ্র্য দূর করা যায় না। আমরা সরকারের শুভ উদ্যোগের সাফল্য কামনা করি। প্রত্যাশা করি, সরকার খোলামন নিয়ে নাগরিক সমাজের ভাবনাগুলো বিবেচনা করবেন।
লেখক : সংগঠক-প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৭১১-৫২৬৯৭৯