২০২১ সালের জুনের মধ্যেই পদ্মাসেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল

২০২১ সালের জুনের মধ্যেই পদ্মাসেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল

স্বপ্নের পদ্মাসেতুর কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে জানিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, পদ্মাসেতু প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৭৩ শতাংশ। কাজ যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে ২০২১ সালের জুনের মধ্যেই পদ্মাসেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল শুরু করবে।

বৃহস্পতিবার (২৯ আগস্ট) সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সম্মেলনকক্ষে এক অনুষ্ঠানে সেতুমন্ত্রী এ কথা জানান।

অর্থ বিভাগ ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের মধ্যে পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ চুক্তি স্বাক্ষর উপলক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

সেতু কর্তৃপক্ষের পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) ড. মো. মনিরুজ্জামান এবং অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. এখলাছুর রহমান চুক্তিতে সই করেন।  

ওবায়দুল কাদের বলেন, আমরা আশা করছি ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে পদ্মাসেতুর নির্মাণ কাজ শেষ করতে পারবো। চালু করতে করতে হয়তো আরও ৩-৪ মাস সময় লাগবে। সর্বশেষ ২০২১ সালের জুনের মধ্যে পদ্মাসেতুতে যানবাহন চলাচল করবে। আমরা যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে পারবো ইনশাআল্লাহ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করবেন, আমরা এই প্রত্যাশাই করছি।

সেতু বিভাগের সিনিয়র সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, পদ্মাসেতু যেহেতু একটি ইন্টারজেনারেটিং প্রজেক্ট সেজন্য আমরা একটা নির্দিষ্ট শর্তে এই টাকাটা সরকারকে ফেরত দেবো। তারই চুক্তি সই।

তিনি বলেন, সম্প্রতি কিছু মিডিয়ায় এসেছে পদ্মাসেতুর ব্যয় এত বেড়ে যাচ্ছে। আমরা আপনাদের আশ্বস্ত করছি, আমরা প্রজেক্টের প্রায় শেষ পর্যায়ে, এখন পর্যন্ত যে মূল সেতু নির্মাণবাবদ ব্যয় ১২ হাজার ১০০ কোটি টাকা, এটা বাড়ার কোনো ইঙ্গিত আমরা পাচ্ছি না। নদীশাসনের বিষয়ে আমরা জোর গলায় বলতে পারি আট হাজার ৭০০ কোটি টাকার বাইরে যাবে না।

‘টাকা যেটা বেড়েছে যেহেতু জমির দাম তিনগুণ হয়ে গেছে, আর কিছু কিছু ট্যাক্স বৃদ্ধি হয়েছে। যেগুলোকে চার্জ এক্সপেনডিচার বলে। সেই কারণে বৃদ্ধি হয়েছে। পদ্মাসেতু যদিও ২০১০ সালের ডিজাইন অ্যান্ড এস্টিমেট, আলহামদুলিল্লাহ আমরা খুবই লাকি এবং আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের রহম করেছেন, ওইরকম নোটেবল কোনো চেঞ্জ হয়নি। এখন বাড়ার কোনো ইঙ্গিত আমি পাচ্ছি না।’
 
সর্বশেষ অগ্রগতি
ওবায়দুল কাদের জানান, পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্পে মূল সেতুর বাস্তব কাজের অগ্রগতি ৮৩ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৭২ শতাংশ। আর সার্বিক অগ্রগতি ৭৩ শতাংশ।

মূল সেতুর সবক’টি পাইল ড্রাইভিংয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। মূল সেতুর ৪২টি পিয়ারের মধ্যে ৩১টি পিয়াবের কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং বাকি ১১টির কাজ চলমান রয়েছে এবং তা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হবে।

মাওয়া সাইটে এ পর্যন্ত ট্রাস (স্প্যান) এসেছে ২৭টি, যার মধ্যে ১৪টি স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া অবশিষ্ট স্প্যানগুলোর কাজ চীনে প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। মাওয়া ও জাজিরা ভায়াডাক্টের পাইলিং এবং পিয়ারের কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে পিয়ার ক্যাপের কাজ শেষ পর্যায়ে এবং গার্ডার স্থাপনের কাজ চলছে।

রেললাইনের জন্য মোট দুই হাজার ৯৫৯টি প্রি-কাস্ট স্ল্যাবের প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে দুই হাজার ৭৫৪টি স্ল্যাব তৈরির কাজ শেষ হয়েছে এবং বাকি স্লাব তৈরির কাজ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ হবে।

সড়কপথের জন্য মোট দুই হাজার ৯১৭টি প্রি-কাস্ট রোডওয়ে ডেকস্ল্যাবের প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে এক হাজার ২৬৯টি স্ল্যাব তৈরির কাজ শেষ হয়েছে এবং বাকি স্ল্যাব তৈরির কাজ চলমান রয়েছে।

মূল সেতু কাজের চুক্তিমূল্য ১২ হাজার ১৩৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা এবং এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে আট হাজার ৭৩২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।

নদীশাসন কাজের বাস্তব অগ্রগতি ৬২ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৪৮ শতাংশ জানিয়ে সেতুমন্ত্রী বলেন, মোট ১৪ কিলোমিটার নদীশাসন কাজের মধ্যে ৬ দশমিক ৬০ কিলোমিটার সম্পন্ন হয়েছে। নদীশাসন কাজের চুক্তিমূল্য আট হাজার ৭০৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা। এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে চার হাজার ১৮৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা।

সংযোগ সড়কের কাজের অগ্রগতি শতভাগ বলে জানান ওবায়দুল কাদের।

ঋণ চুক্তির বিস্তারিত
ওবায়দুল কাদের বলেন, পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সরকার বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষকে ২৯ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে। সেতু কর্তৃপক্ষকে এই ঋণ অর্থ বিভাগের মাধ্যমে প্রদান করা হয়। পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের পর প্রাপ্ত আয় থেকে পর্যায়ক্রমে সেতু কর্তৃপক্ষ সরকারকে সুদ-আসলসহ সমুদয় অর্থ ফেরত দেবে। সে লক্ষ্যে সেতু কর্তৃপক্ষ ও অর্থ বিভাগের মধ্যে ‘ঋণ পরিশোধ’ চুক্তি স্বাক্ষরিত হচ্ছে।

চুক্তি মোতাবেক সেতু কর্তৃপক্ষ ২০২১-২২ অর্থবছর হতে অর্থবিভাগ তথা সরকারকে ঋণ পরিশোধ করবে। ১ শতাংশ সুদে ঋণ পরিশোধের মেয়াদ ৩৫ বছর। ঋণ পরিশোধের সিডিউল অনুযায়ী প্রতি অর্থবছরে প্রায় সর্বনিম্ন ৮২৬ কোটি হতে সর্বোচ্চ এক হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা পরিশোধ করা হবে।

সেতু কর্তৃপক্ষ বঙ্গবন্ধু সেতু প্রকল্পে তিনটি দাতা সংস্থা আইডিএ, এডিবি এবং ওইসিএফ এর নিকট থেকে গৃহীত ঋণ সেতু কর্তৃপক্ষ অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সম্পাদিত ঋণ চুক্তি অনুযায়ী ঋণের আসল ও সুদসহ প্রতি বছর চার কিস্তিতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে পরিশোধ করছে। ঋণ বাবদ সেতু কর্তৃপক্ষ প্রতি অর্থবছরে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা সরকারকে পরিশোধ করে আসছে। ২০৩৩-৩৪ অর্থবছরে এই ঋণ সুদসহ সম্পূর্ণ পরিশোধ হবে।

চট্টগ্রামে নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল (কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ প্রকল্প) এর ব্যয়ও সেতু কর্তৃপক্ষ সরকারকে পরিশোধ করবে।