এখনও সেমিফাইনালের স্বপ্ন দেখছেন মাশরাফি

হেরেও মন জয় টাইগারদের

হেরেও মন জয় টাইগারদের

স্পোর্টস ডেস্ক : এত রান করা যায়! যায়। ওয়ানডেতে এর চেয়ে বেশি রান তাড়া করে জেতার রেকর্ডও আছে। তবে এমনটা ঘটেছে একবারই। ২০০৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার দেয়া ৪৩৫ রান তাড়া করে জিতেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। কালেভদ্রে দেখা যায় এমন ম্যাচ। তবে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশ যেভাবে খেলেছে তাও নিত্যদিন দেখা যায় না। বিশ্বকাপে দ্বিতীয় ইনিংসে এত রান আগে হয়েছে মাত্র দুইবার। আর ৫টা রান হলে ইংল্যান্ডের সে রেকর্ডও ভেঙে যেত। বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ড আয়ারল্যান্ডের। ২০১১ সালে তারা ইংল্যান্ডের দেয়া ৩২৯ রানের লক্ষ্য তাড়া করেছিল আইরিশরা। যে রেকর্ড ভেঙে দিতে পারতো বাংলাদেশ, যদি বাংলাদেশের আগের ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজ আরো কিছু রান করতো। বাংলাদেশ অবশ্য বৃহস্পতিবার আয়ারল্যান্ডের সেই ইনিংসও টপকে গেছে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার পুঁজি ছিল আরো অনেক বেশি!
টস জিতে আগে ব্যাট করতে নেমে ৩৮১ রান করে অস্ট্রেলিয়া। এর আগের ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৩২১ রান তাড়া করতে বাংলাদেশের লেগেছিল ৪১ ওভার। তাই হয়তো অজিদের রান পাহাড়ে পিষ্ট হওয়ার পরেও সমর্থকদের অনেকেই জয়ের আশা ছেড়ে দেননি। রানের চাপে ভেঙে পড়েননি তামিম-মুশফিকরাও। সেমির লড়াইয়ে এগিয়ে যাওয়ার জন্য জয়টা দরকার ছিল খুব। অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে তাই জ্বলে উঠতে হতো বোলিং, ব্যাটিং, ফিল্ডিং-তিন বিভাগেই। কিন্তু টস হেরে আগে  ফিল্ডিংয়ে নেমে বোলারা নিজেদের কাজটা ঠিকমতো করতে পারলেন না। তবে বিশাল টার্গেটে ঘাবড়ে যায়নি টাইগারা। আর তাইতো ৭১৪ রানের ধুন্দুমার এক ম্যাচ উপহার দিয়েছে তারা।
৮ উইকেটে তুলে নিয়েছে ৩৩৩ রান। উইকেটকিপার মুশফিকুর রহিম করেন বিশ^কাপে তাদের প্রথম সেঞ্চুরি। ফলে লড়াইটা খারাপ হয়নি। এ জন্য হেরেও টাইগার ভক্তদের মন জয় করেছেন সাকিব-মাশরাফি-মুশফিকরা। প্রশংসা কুড়াচ্ছেন ক্রিকেট পন্ডিতদেরও। অবশ্য কঠিন হয়ে গেছে তাদের সেমিফাইনালে উঠার সমীকরণ। পয়েন্ট টেবিলের দিকে তাকালে ও বাংলাদেশের ওপরে থাকা দলগুলোর শক্তি সামর্থ্য ও অবস্থান বিবেচনা করলে বোঝা যায়, কাগজে কলমে টাইগারদের সেমিফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা খুবই কম।  যে সম্ভাবনাটুকু আছে সেটা নিজেদের জয়ে নয় বরং অন্য দলগুলোর টানা পরাজয়ের ওপর নির্ভর করছে।
তবে বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মতুর্জা শেষ চারের আশা এখনো ছাড়ছেন না। জানালেন, শেষ ম্যাচ পর্যন্ত লড়াই করে যাবে তার দল। এখন পর্যন্ত ৬ ম্যাচে মাত্র দুটি জয় নিয়ে পয়েন্ট টেবিলের পঞ্চম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। টাইগারদের চেয়ে  এক ধাপ এগিয়ে থাকা ভারতের সংগ্রহ ৭ পয়েন্ট। মাশরাফিদের চেয়ে দুটি ম্যাচ কম খেলেছে কোহলির দল। ১০,৯ ও ৮ পয়েন্ট নিয়ে পয়েন্ট টেবিলের সেরা তিন দল অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ইংল্যান্ড। বাংলাদেশের চেয়ে একটি করে কম ম্যাচ খেলেছে নিউজিল্যান্ড ও ইংল্যান্ড। বাংলাদেশ তাদের শেষ তিনটি ম্যাচ খেলবে আফগানিস্তান, ভারত এবং পাকিস্তানের বিপক্ষে। এই তিনটি ম্যাচ জিতলে টাইগারদের পয়েন্ট হবে ১১। তাই খোলা চোখে দেখলে বলা যায়, বাংলাদেশের সেমিফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা কম। তবে এখনই আশাহত হতে নারাজ মাশরাফি।
ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে টাইগার অধিনায়ক বলেন, ‘কে জানে কত কী হতে পারে! এখনও আমরা পারব, তিন ম্যাচ বাকি আছে। কাজটি কঠিন হবে। আগে আমাদের শেষ তিনটা ম্যাচ জিততে হবে। আপাতত গুরুত্বপূর্ণ হলো বাকি তিনটি ম্যাচ একটি একটি করে এগোনো এবং জেতা।’ মাশরাফি আরো বলেন, ‘এখন আমাদের প্রতিটি ম্যাচে জিততে হবে সেই সাথে অন্য ম্যাচগুলোর দিকেও নির্ভর করতে হবে।’
বাংলাদেশ অবিশ্বাস্য লড়াকু, বললেন শোয়েব : মাশরাফি বিন মুর্তজার দলের লড়াকু মানসিকতার তাই প্রশংসা করেছেন পাকিস্তানের কিংবদন্তি পেসার শোয়েব আখতার। সেমিফাইনালে ওঠার আশা জিইয়ে রাখতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয়টা গুরুত্বপূর্ণ ছিল বাংলাদেশের জন্য। আগে ব্যাট করে ৫ উইকেটে ৩৮১ রান তুলেছিল অস্ট্রেলিয়া। দলটির ইনিংসের শেষ ৭-৮ ওভারে অনেক বেশি রান দিয়ে ফেলেন বাংলাদেশের বোলাররা। তাড়া করতে নেমে গোটা ৫০ ওভারই খেলেছে বাংলাদেশ। সেঞ্চুরি তুলে নেন মুশফিকুর রহিম। তামিম ইকবাল ও মাহমুদউল্লাহর ব্যাট থেকে এসেছে দুটি পঞ্চাশোর্ধ্ব রানের ইনিংস। ব্যাটিংয়ের একটা সময় ম্যাচে মোটামুটি ভালোভাবেই টিকে ছিল মাশরাফির দল। রানের গতি বাড়ানোর চেষ্টাটা শুরু হয়েছে একটু দেরিতে। তবে অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে বাংলাদেশের এ লড়াইয়ে মুগ্ধ ‘রাওয়ালপিন্ডি এক্সপ্রেস’ খ্যাত শোয়েব। তাঁর টুইট, ‘বাংলাদেশ আবারও অবিশ্বাস্য লড়াকু মানসিকতা দেখাল। তারা শেষ কয়েক ওভারে অতিরিক্ত রান দিয়ে ফেলেছে, নইলে ম্যাচটা তাদের হাতেই থাকত। বড় রান তারা কীভাবে তাড়া করে, সে ব্যাপারে সত্যিই ভালো শিক্ষা পাওয়া গেল।’ বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বে আরও ৩ ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশ। এর মধ্যে বড় দল বলতে শুধু ভারত ও পাকিস্তান। বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগতির সাবেক এ পেসার কি এই টুইট দিয়ে তাঁর দেশের জাতীয় দলকে সাবধান থাকতে বললেন? বড় রান করেও বাংলাদেশের বিপক্ষে স্বস্তিতে থাকার উপায় নেই—এমন ইঙ্গিতই কি দিলেন শোয়েব?

বাংলাদেশ সেরাদের কাতারে যাবে, রাস্তাটা বললেন হাসি : প্রতিটি ম্যাচ শেষেই খুঁটিনাটি নিয়ে ক্রিকইনফোয় বিশেষ বিশ্লেষণ করতে বসে যান একাধিক সাবেক ক্রিকেটার। বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের পর সে দায়িত্বটা পড়েছিল হাসির কাঁধে। বিশ্লেষণে বাংলাদেশের ব্যাটিং দেখে মুগ্ধতা লুকাননি তিনি। ‘অস্ট্রেলিয়া হয়তো ম্যাচ শেষে খুশি হবে। তবে বলতেই হবে বাংলাদেশ কঠিন এক লড়াই উপহার দিয়েছে। যেভাবে ওরা রান তাড়া করে খেলল, সেজন্য ওদের কুর্ণিশ করতেই হয়। বিশাল এক রান তাড়া করতে হতো। কিন্তু বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত লড়াইটা চালিয়ে গেল। তারা আশা ছাড়েনি, লড়াইটা চালিয়ে গেছে। একটা সময়ে মনে হল অস্ট্রেলিয়ানরা কিছুটা উদ্বিগ্ন।’ ম্যাচে শেষঅবধি ৪৮ রানে হারলেও একটা সময় অস্ট্রেলিয়ার প্রায় সমানে সমান অবস্থানেই ছিল বাংলাদেশ। ৪০ ওভার শেষে যেখান অস্ট্রেলিয়ার রান ছিল ২৫০, বাংলাদেশের সেখানে রান ছিল ২৪৫। শেষ ১০ ওভারে রানের ব্যবধানটাই পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। হারলেও একটা পর্যায় পর্যন্ত অজিদের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারাটা হাসির চোখে বাংলাদেশের জন্য দারুণ প্রাপ্তি। ‘যদি দুই দলকে পাশাপাশি রাখা হয়, তাহলে আমি বলবো বাংলাদেশের ব্যাটিং ভীষণ উন্নতি করেছে। একটা সময় তো তারা অস্ট্রেলিয়ার পাশাপাশিই ছিল।ব্যাটিংয়ে উন্নতি ধরে রেখে বাংলাদেশকে বোলিংয়ের দিকেও নজর দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন হাসি। তার মতে কয়েকটা জায়গায় উন্নতি করতে পারলে ভবিষ্যতে সেরাদের কাতারে উঠে যাবে টাইগাররা। ‘অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশের মধ্যে মূল পার্থক্যটা ছিল মূলত বোলিংয়ে। বাংলাদেশকে অবশ্যই তাদের বোলিংয়ে উন্নতি করতে হবে। দলে কিছু রহস্যময় বোলার আনতে হবে, গতি বাড়াতে হবে। সেগুলো হলেই আমি বিশ্বাস করি তারা খুব দ্রুতই র?্যাঙ্কিংয়ে দারুণ উন্নতি করবে।’
‘লড়াকু বাংলাদেশের জন্য ফুল মার্কস’ : ভারতীয় ক্রিকেট লেখক মিহির বোস টুইট করেছেন, ‘বাংলাদেশের ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ রান। তারা হয়তো হেরেছে, কিন্তু দেখিয়ে দিলো সামনে এগিয়ে যাওয়ার মতো সাহস ও চেষ্টা তাদের আছে।’ সাংবাদিক আয়াজ মেমন ‘ক্রিকেটওয়ালা’ টুইটারে লিখেছেন, ‘লক্ষ্য হয়তো তাদের নুইয়ে দিয়েছে। কিন্তু কখনোই হেরে না যাওয়ার মানসিকতার জন্য বাংলাদেশ ফুল মার্কসই পাচ্ছে। লক্ষ্য কিংবা প্রতিপক্ষের বোলিং শক্তি দেখে তারা ঘাবড়ে যায়নি।’ ইএসপিএনের প্রধান সম্পাদক সমবিত বল প্রশংসায় ভাসিয়ে দিয়েছেন টিম টাইগার্সকে, ‘তারা পিছিয়ে পড়েছিল, কারণ তাদের বোলাররা অনেক রান হজম করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাটিং এই বিশ্বকাপের প্রধান হাইলাইটস হয়ে থাকবে।’  প্রশংসা হচ্ছে মুশফিকের ১০২ রানের ইনিংসটি নিয়েও। আয়াজ মেমন তার আরেকটি টুইটে লিখেছেন, ‘উচ্চতায় খাটো কিন্তু কর্মে পাহাড়সম!’ ক্রিকেটের বাইরে ট্রেন্ট ব্রিজের এক বাংলাদেশি সমর্থকও বিশেষ নজর কেড়েছেন। কমিক সুপারহিরো স্পাইডারম্যানের কস্টিউম পরে টাইগারদের সমর্থন দিতে গিয়ে সবার নজরে এসেছেন তিনি। বাংলাদেশের সুপারহিরো সমর্থককে নিয়েও হয়েছে দেদার টুইট। ক্রিকইনফোর নারী সাংবাদিক মেলিন্ডা ফেরেল লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের স্পাইডারম্যান এখন ট্রেন্ট ব্রিজে। সে অসাধারণ!’