শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জয়

হাথুরুকে উপযুক্ত জবাব

হাথুরুকে উপযুক্ত জবাব

স্পোর্টস রিপোর্টার : গত অক্টোবরে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে খুবই খারাপ পারফরমেন্স করে বাংলাদেশ। প্রায় প্রতিটি ম্যাচে হারে লড়াই ছাড়াই। এর জের ধরে টেস্ট দলের অধিনায়কত্বও হারান মুশফিকুর রহিম। চারদিকে যখন মাশরাফি-মুশফিকদের সমালোচনা, তখন ক্রিকেটারদের পাশে দাঁড়ানোর বদলে কেটে পড়েন দলের প্রধান কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে। একেবারে কাউকে কিছু না বলে চলে যান শ্রীলঙ্কায়। বাংলাদেশকে না জানিয়ে দায়িত্ব নেন লঙ্কান জাতীয় দলের। অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। তার এমন স্বার্থপরতা দেখে অবাক টাইগার ভক্তরাও। বাংলাদেশ এখনও প্রধান কোচ খুঁজে পায়নি। সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাহমুদের অধীনে অংশ নিচ্ছে চলতি ক্রিদেশীয় ক্রিকেটে। আর এই আসরে অংশ নিচ্ছে হাথুরুসিংহের লঙ্কাও। ফলে সাবেক কোচের বিরুদ্ধে মাশরাফি-মুশফিক-সাকিব-তামিমদের লড়াইটা হয়ে উঠে নিজেদের প্রমাণের। বাংলাদেশ যে ভেঙে পড়েনি, তার উপযুক্ত জবাবই দিল তারা হাথুরুসিংহেকে।

একেবারে যেনতেন ভাবেই শ্রীলঙ্কাকে হারাল বাংলাদেশ। ১৬৩ রানের বড় ব্যবধানে। এটি রানের হিসেবে ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জয়। আগের রেকর্ড ছিল ২০১২ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ১৬০ রানের জয়। প্রথম দুই ম্যাচেই বোনাস পয়েন্টসহ জয়ে বাংলাদেশ নিশ্চিত করে ফেলল টুর্নামেন্টের ফাইনালও।
শত্রু শিবিরে বাংলাদেশের সাবেক কোচ থাকায় লঙ্কানদের বিপক্ষে টাইগাররা কেমন করে, সেদিকে চোখ ছিল সবার। হাথুরুর প্রভাব নিয়েও কথা হচ্ছিল অনেক। কিন্তু মাঠের খেলায় কোনো কিছুকেই পাত্তা দিল না বাংলাদেশ। কোচ হারিয়ে মুষড়ে পড়া তো দূরের কথা, সাবেক কোচকে উল্টো তিক্ত অভিজ্ঞতাই উপহার দিলেন টাইগাররা। মাশরাফি বাহিনীর দাপুটে পারফরম্যান্সের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি শ্রীলঙ্কা। তামিম ইকবাল (৮৪), সাকিব আল হাসান (৬৭) আর মুশফিকের রহিমের (৬২) হাফ সেঞ্চুরিতে ভর করে ৭ উইকেটে ৩২০ রানের পাহাড়সম পুঁজি পায় বাংলাদেশ। জবাবে শ্রীলঙ্কা অলআউট হয়েছে মাত্র ১৫৭ রানে, ১৮ ওভারের মতো খেলা বাকি রেখে!

শুরু থেকেই লঙ্কান ব্যাটসম্যানদের চেপে ধরেন বাংলাদেশের বোলাররা। দলের ২ রান উঠতেই একটি     উইকেট হারায় লঙ্কানরা। পরে কিছুটা স্থিতি হয়েছিল উপুল থারাঙ্গা আর কুশল মেন্ডিসের জুটিটি। থারাঙ্গাকে মাহমুদউল্লাহর ক্যাচ বানিয়ে ৪১ রানের এই জুটিটি ভাঙেন বাংলাদেশ দলপতি মাশরাফি বিন মর্তুজা। এরপর কুশল মেন্ডিসকেও বেশিদূর এগোতে দেননি মাশরাফি। তাকে তুলে মারতে গিয়ে মিড অফে রুবেল হোসেনের দারুণ এক ক্যাচে পরিণত হন লঙ্কান দলের ডানহাতি এই ব্যাটসম্যান। তিনি করেন ১৯ রান। এরপর ১৬ রান করা ডিকভেলাকে বোল্ড করেন মোস্তাফিজ।

বহুদিন পর মোস্তাফিজুর রহমানের বলে স্ট্যাম্প উড়তে দেখলেন ক্রিকেট অনুরাগিরা। দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে নিরোশান ডিকভেলার অফস্ট্যাম্পটা একেবারে মাটি থেকে উপড়ে ফেলেন বাংলাদেশের কাটার মাস্টার। ২৮ রান করে রানআউটের ফাঁদে পড়েন দিনেশ চান্দিমাল। এরপর এক ওভারে জোড়া আঘাত সাকিবের। পর পর দুই বলে আসেলা গুনারতেœ (১৬) আর ধনঞ্জয়া ডি সিলভাকে (০) সাজঘরে ফিরিয়েছেন বাংলাদেশের বিশ্বসেরা এই অলরাউন্ডার। এরপর নিয়েছেন আরও একটি উইকেট। শেষ সময়ে মুড়ি মুড়কির মতো উইকেট পড়েছে শ্রীলঙ্কার।

এর আগে, লঙ্কান দলের বাঁহাতি দুই ওপেনার উপুল থারাঙ্গা আর কুশল পেরেরাকে ভড়কে দিতে নাসির হোসেনকে দিয়ে বোলিং আক্রমণ শুরু করেন মাশরাফি বিন মর্তুজা। বুদ্ধিটা কাজে দিয়েছে বেশ। নাসিরের প্রথম ওভারে মাত্র ২ রান নিতে পেরেছে শ্রীলঙ্কা। মাশরাফি তো পরের ওভারে রানই দেননি। এর মধ্যে তার একটি এলবিডব্লিউয়ের আবেদনে সাড়া দিয়েছিলেন আম্পায়ার। রিভিউ নিয়ে অল্পের জন্য বেঁচে যান উপুল থারাঙ্গা। পরের ওভারের প্রথম বলেই আঘাত হানেন নাসির। ডাউন দ্য উইকেটে খেলতে এসে তার নিচু হয়ে যাওয়া বল মিস করে বোল্ড হন ১ রান করা কুশল পেরেরা। এরপর মিড অফে মাশরাফিকে তুলে মারতে গিয়ে আউট হয়েছেন থারাঙ্গা। লঙ্কান এই ওপেনার করেন ২৫ রান।

বাংলাদেশের পক্ষে ৪৭ রানে ৩টি উইকেট নিয়েছেন সাকিব। মাশরাফি আর রুবেল হোসেন নেন ২টি করে উইকেট। একটি উইকেট মোস্তাফিজের।
এর আগে টসে জিতে ব্যাাটিংয়ে নেমে তামিম-সাকিব-মুশফিকের ব্যাটিং নৈপুণ্যে নির্ধারিত ওভার শেষে স্কোরবোর্ডে সাত উইকেটে ৩২০ রান তোলে স্বাগতিক শিবির। ওয়ানডে ক্রিকেটে টাইগারদের সর্বোচ্চ দলীয় স্কোর ৩২৯। ৩২০ যৌথভাবে পঞ্চম সর্বোচ্চ। জয়ে ফেরার গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ইনজুরি আক্রান্ত অধিনায়ক অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুসকে ছাড়াই নামে সফরকারীরা। নেতৃত্ব ওঠে দিনেশ চান্দিমালের কাঁধে। এদিকে, ব্যাক-টু-ব্যাক ৮৪ রানের ইনিংস উপহার দেন ফর্মের তুঙ্গে থাকা তামিম। উদ্বোধনী ম্যাচে জিম্বাবুয়ের ১৭১ রান তাড়া করতে নেমে জয় নিশ্চিত করে মাঠ ছাড়েন।

 আক্ষেপ শ্রীলঙ্কা ম্যাচেও সেঞ্চুরিটা হলো না। ত্রিশতম ওভারে স্পিনার আকিলা ধনাঞ্জয়ার বল ব্যাট ছুঁয়ে নিরোশান ডিকভেলার গ্লাভসে আটকা পড়ে। দলীয় ১৭০ রানে আউট হওয়ার আগে দলকে বড় সংগ্রহের ভিত গড়ে দিয়ে যান তামিম। এনামুল হক বিজয়ের (৩৫) সঙ্গে ৭১ রানের ওপেনিং পার্টনারশিপের পর সাকিব আল হাসানকে নিয়ে ৯৯ রান যোগ করেন। সাকিব-মুশফিক তৃতীয় উইকেট জুটিতে ৫৭। মাহমুদউল্লাহকে নিয়ে পরের উইকেটেও অর্ধশত রানের জুটি গড়েন মুশফিকুর রহিম। সাকিবের ব্যাট থেকে আসে ৬৭। মুশফিক করেন ৬২। মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ২৪, মাশরাফি ৬ রান করে আউট হন। ৪৯তম ওভারে নেমে গোল্ডেন ডাক নাসির হোসেন (০) এলবিডব্লুর শিকার হন। সুরাঙ্গা লাকমলের করা শেষ ওভারে আসে ২০ রান। সাব্বির রহমান ১২ বলে ২৪ রানের কার্যকরী ব্যাটিং প্রদর্শন করেন। ২২ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটিতে সাব্বিরের সঙ্গে ৬ রানে অপরাজিত থাকেন মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন।তিনটি উইকেট দখল করেন থিসারা পেরেরা। নুয়ান প্রদীপ নেন দু’টি। একটি করে ধনাঞ্জয়া ও আসিলা গুনারতেœ।