সড়ক-মহাসড়কের বেহাল দশা

সড়ক-মহাসড়কের বেহাল দশা

হাবিবুর রহমান স্বপন :আমাদের সড়ক-মহাসড়কের বেহাল অবস্থার সংবাদ সংবাদপত্র থেকেই জানা যায়। দেশের একুশ হাজার কিলোমিটার সড়কের ষোল হাজার কিলোমিটারই নষ্ট, যা চলাচলের অনুপযোগী। ৯৬টি জাতীয় সড়কের ৩ হাজার ৮শ ১৩ কিলোমিটার কিছুটা ভাল হলেও জেলা ও আঞ্চলিক মহাসড়কের প্রায় সবটাই বিধ্বস্ত।সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকায় সড়ক-সেতু পরিদর্শন করেন, অথচ সড়কের বেহাল অবস্থা নিরসনের জন্য কাজের অগ্রগতি একেবারেই নেই বললেই চলে। সড়ক সমূহ সংস্কার ও মেরামতের জন্য যে পরিমাণ অর্থের দরকার সে পরিমাণ টাকা না-কি মেলে নাই। তাই এই অবস্থা।চাহিদানুসারে টাকা দিলেই কি সড়কের বেহাল দশার উন্নতি হবে? সড়ক মেরামত করা হলে তা কতদিন চলবে বা ভাল থাকবে? কেন যথাযথভাবে সড়কসমূহ মেরামত করা যাচ্ছে না? ভেতরের রহস্যটাই বা কি?আমরা সাদা চোখে যা দেখছি তা বর্ণনা করলে হতাশ হওয়া ছাড়া আর কোন কিছুই করার আছে বলে মনে হয় না। সড়ক নতুন করে সংস্কার করা বা মেরামত করার পর তার স্থায়িত্ব খুব বেশিদিন হয় না। মাত্র এক থেকে-দেড় বছরের মধ্যেই তা আবার নষ্ট হয়ে যায়।


কুষ্টিয়া থেকে পাকশী সড়কের বেহাল দশা। সড়কটি মাত্র এক বছর আগে মেরামত করা হয়। অথচ গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের প্রায় ২১ কিলোমিটারই এখন বিধ্বস্ত। বড় বড় গর্ত হয়ে সড়কটি চলাচলের সম্পূর্ণ অনুপোযোগী হয়ে গেছে। প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে পণ্যবাহী ট্রাক এবং যাত্রীবাহী বাস দুর্ঘটনায় পতিত হচ্ছে। একই অবস্থা বেনাপোল থেকে যশোরের চাঁচড়ার মোড় পর্যন্ত, যশোরের বারোবাজার থেকে ঝিনাইদহ পর্যন্ত এবং ঝিনাইদহ থেকে কুষ্টিয়ার শেখপাড়া পর্যন্ত। ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-টাঙ্গাইল-বগুড়া, ঢাকা-বরিশাল-খুলনা, খুলনা-যশোর, ঢাকা-ফরিদপুর, ফরিদপুর-যশোর, পাবনা-রাজশাহী ও নাটোর-বগুড়া মহাসড়কের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল থেকে পাবনার কাশিনাথপুর পর্যন্ত এবং রংপুর থেকে কুড়িগ্রাম পর্যন্ত সড়ক দুটির দশাও করুণ।


গত দুই মাসে দেশের যেখানেই গেছি সড়কের বেহাল দশা দেখেছি এবং জনগণের মন্তব্য কানে শুনেছি। সড়ক বিধ্বস্ত, তাই যানবাহনের গতি কম। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে বেশি সময় লাগছে। আবার সড়কে চলতে ঝাঁকুনি অতিষ্ঠ-বিরক্ত যাত্রী মুখ খিস্তি করে সরকারের বিরুদ্ধে যা-তা বলছে। সরকার বিরোধীরা চলতে-ফিরতে সরকারের সমালোচনা করার সময় প্রথমেই কায়দা করে সড়কের বেহাল দশার কথা বলছে। আর তার সঙ্গে যোগ করছে নানা কথা। যেহেতু ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক সড়ক-জনপথ এবং সেতু মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। তাই কথার মারপ্যাঁচে দুর্নীতির কথা নানা উক্তি ও মন্তব্য! সেই কথাবার্তা যে মোটেই সরকারের জন্য সুখকর নয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না।


পরিবহণ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল তাদের ব্যবসার বারোটা বেজে গেছে। কারণ, যানবাহনের টায়ার ও আনুষাঙ্গিক যন্ত্রপাতি কিনতেই তারা ফতুর হয়ে যাচ্ছেন। একজোড়া টায়ার না-কি এক মাসও চলে না। ট্রাকে পণ্য পরিবহণে ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। আবার দূরপাল্লার বাসসমূহ যথাসময়ে (সিডিউল মোতাবেক) চলাচল করতে পারছে না।সড়কসমূহ মেরামত বা সংস্কার করার পর দ্রুতই আবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কেন? এ ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিয়ে যা জানা গেল তা খুবই হতাশাজনক। নি¤œমানের কাজই সড়ক বিধ্বস্ত হওয়ার মূল কারণ। যেমন-খোয়া কনস্যুলেশন যথার্থভাবে না করা। নি¤œমানের বিটুমিন ব্যবহার করা এবং ভারী যানবাহন চলাচল। যথাযথ পরিমাণে বালু ও খোয়ার মিশ্রণে কমপ্রেশান যথাযথভাবে না করার ফলে সড়কের প্রেসার ক্যাপাসিটি দুর্বল হয়। এছাড়াও নি¤œমানের খোয়া ব্যবহার করা হয়। যতটুকু পুরু (থিকনেস) করে সড়ক তৈরি করার নিয়ম প্রাক্কলিত দরপত্রে উল্লেখ করা হয় তা বাস্তবায়নে পুরোপুরি নিয়ম মানা হয় না। বাংলা বিটুমিনের পরিবর্তে কম দামের (গুণগত খারাপ মানের) ইরানী বিটুমিন ব্যবহার করা হয়। এছাড়া যে তাপমাত্রায়  বিটুমিন দিয়ে সড়কে ঢালাই করার কথা বা নিয়ম তা মানা হয় না।  


দুই নম্বর ইটের খোয়া এমনকি তিন নম্বর ইটের খোয়া দিয়েও সড়ক তৈরি করা হয়। ভাল মানের এক ব্যারেল বিটুমিন যে টাকায় কেনা হয়, সেই পরিমাণ টাকায় তিন ব্যারেল নি¤œমানের বিটুমিন পাওয়া যায়। সাধারণত নি¤œমানের উক্ত বিটুমিন  দিয়ে সড়ক মেরামত বা সংস্কার করা হয়ে থাকে (কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া)।পরিমাণ মতো খোয়া ও বালু ভালোভাবে মিশিয়ে পানি দিয়ে সড়কের বেড তৈরি করতে হয় এবং সেই বেড খুবই সুন্দরভাবে রোলারের সাহয্যে প্রেসার দিয়ে মজবুত করার পর তাতে ঢালাই দিতে হয় যথাযথ সঠিক তাপমাত্রার বিটুমিন  দিয়ে। পাথর দিয়ে বিটুমিন ঢালাই দেয়ার সময় রোলার দিয়ে ভালোভাবে চাপ দেয়া না হলে ঢিলা (লুজ) থেকে যায়। সামান্য বৃষ্টি হলেই নি¤œমানের পিচ বা বিটুমিন যানবাহনের চাকার ঘর্ষণে উঠে যায়। প্রতিটি কাজ ধারাবাহিকভাবে ভাল হতে হবে। তা না হলে সড়ক টিকবে না। এটাই সত্য। কিন্তু ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের অতি মুনাফা করার মনোভাবের কারণে এবং সংশ্লিষ্ট  প্রকৌশলীর দুর্নীতির কারণে যথানিয়মে কাজ হয় না। সমস্যা এটাই বড়। যদিও বলা হয়ে থাকে ভারী যানবাহনের কারণে সড়ক টেকসই হচ্ছে না। কথাটি পুরোপুরি ঠিক যে না, তা প্রমাণিত। ২০/২২ বছরেও সড়ক বিধ্বস্ত বা নষ্ট হয়নি তার প্রমাণ  এদেশেই আছে।


সড়ক ও জনপথ দপ্তরের টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়েও বেশ বিতর্ক রয়েছে। সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ থাকে সড়ক ও জনপথে। সড়ক-মহাসড়ক সংস্কার এবং মেরামতের কাজ চলে সারা বছরব্যাপী। আরও একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় তা হলো-সড়ক ও জনপথে প্রায় প্রতিটি জেলায় চিহ্নিত ঠিকাদার সিন্ডিকেট রয়েছে। এই সিন্ডিকেট খুবই শক্তিশালী। জেলা অফিস থেকে উপর পর্যন্ত এদের কর্তৃত্ব বা হাত রয়েছে। সব কিছুই নিয়ন্ত্রিত হয় বিশেষ সিন্ডিকেটের ‘লাইন আপ’ এর মাধ্যমে।সব সময়ই ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদের সন্তুষ্ট করেই সড়ক ও জনপথের কর্মকর্তাদের কাজ বন্টন করতে হয়। যদিও কাগজে-কলমে এখন লটারি করে কাজ বন্টনের কথা বলা হচ্ছে। সবই গড়ল-ভেল। লটারির নামে যা হয় তা তামাশা। একটি কাজের টেন্ডারে পাঁচজন ঠিকাদার অংশ নিলেও দেখা যায় লটারি হচ্ছে গোপনে। ক্ষমতাসীন দলের বড় বা প্রভাবশালী নেতাকে পাশ কাটিয়ে  কাজ  দিলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অপমানিত-নাজেহাল হতে হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রকৌশলীর সাথে কথা বলে জানা গেল কাজ সঠিকভাবে বুঝে নেয়া খুবই কঠিন। প্রকৃত ব্যবসায়ীরা এখন আর ঠিকাদারী করেন না। ঠিকাদারী চলে গেছে রাজনৈতিক হোমরা-চোমরাদের হাতে।  


যখনই সড়ক-মহাসড়কের বেহাল অবস্থার খবরাখবর জানার চেষ্টা করেছি, তখনই প্রকৌশলীরা বলেছেন, মাত্রাতিরিক্ত পণ্য নিয়ে ট্রাক যাতায়াত করে। তাতে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দ্রুত বিধ্বস্ত হয়।সড়ক যদি যথাযথ নিয়মে সঠিকভাবে নির্মাণ করা হয় তা হলে তার স্থায়িত্ব যে বেশি হয় তার প্রমাণ আছে। আশির দশকের মাঝামাঝি পাবনা-রাজশাহী মহাসড়ক নির্মাণ করা হয়, ভারতের ‘ইরকন’ নামের একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কাজ করে। প্রায় ২০ বছর সড়কটি আর মেরামত করতে হয়নি। অথচ প্রতিবছরই বিভিন্ন মহাসড়ক মেরামত করতে হয়। নিম্নমানের কাজের কারণেই সরকারি অর্থ খরচ বা অপচয় বা লুটপাট হচ্ছে।
সড়কের উপর চাপ কমাতে হবে। এর জন্য দরকার রেলকে সক্রিয় বা আধুনিক করতে হবে। পণ্য পরিবহনের জন্য রেল এবং নৌপথকে গুরুত্ব দিতে পারলেই  কেবল পরিবহন ব্যয় হ্রাস পাবে। ঘন জনবসতির এই দেশের জন্য রেল খুবই উপযোগী। গণপরিবহণ ব্যবস্থাকে কার্যকরি করতে রেলের বিকল্প নেই। অল্প খরচে রেল ভ্রমণ নিরাপদও। আমাদের রেল যোগেযোগকে কোন সরকারই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেনি। তাই রেল যেখানে ছিল প্রায় সেখানেই আছে। বর্তমান সরকার রেলকে কিছুটা হলেও গণপরিবহনে রূপ দিতে শুরু করেছে। তবে তার গতি খুবই শ্লথ। রেল লাইন আপ ও-ডাউন অর্থাৎ কমপক্ষে দুটি করতে হবে। মঙ্গলা বন্দর থেকে দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চলের জেলা সমূহে হাজার হাজার ট্রাক চলে প্রতিদিন সড়ক পথে। রেল যোগাযোগ যদি যথার্থ হতো তা হলে পঞ্চাশ ভাগ পণ্য রেলযোগে পরিবহণ হতো। কিন্তু তা না হওয়ায় পণ্যের পরিবহণ ব্যয় বেড়েছে এবং সড়কের উপরও চাপ প্রবল হয়েছে। নৌপথকে সচল করার জন্য নদী খনন করতে হবে। নদী পথের চ্যানেল সমূহকে সারা বছর সচল রাখতে হবে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।


আঞ্চলিক সড়কগুলোর অবস্থা করুণ। যেখানে জাতীয় সড়ক বা মহাসড়কেরই বেহাল দশা সেখানে আঞ্চলিক সড়ক মেরামত বা সংস্কার করার জন্য যে তাড়া আছে তা মনে হয় না। খবরের কাগজেই পড়লাম, সড়ক সমূহ মেরামত ও সংস্কারের জন্য যে পরিমাণ অর্থের দরকার তা বরাদ্দ দেয়া হয়নি। ধীর গতিতে উন্নয়ন কাজ চলছে ঢাকা-টাঙ্গাইল-এলেঙ্গা মহাসড়কের। ময়মনসিংহ মহাসড়কেরও একই দশা। মনে পড়ে প্রায় দেড় যুগ সময় লেগেছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক নির্মাণে। তাতে খরচও বেড়েছে বহুগুণ।সংবাদ মাধ্যমের খবরেই জেনেছি বাংলাদেশে সড়ক ও ব্রীজ নির্মাণের ব্যয় বিশ্বে সবচেয়ে বেশি। আবার সেই বেশি টাকায় নির্মিত সড়কের স্থায়িত্বও সবচেয়ে  কম! কেন এই বেশি খরচ এবং কম স্থায়িত্ব?আমরা যদি প্রকৃত দেশপ্রেমিক না হতে পারি তা হলে দেশের মানুষের ভোগান্তি কমবে না বরং বাড়তেই থাকবে। সরকারকে ভাবতে হবে, কেন কি কারণে সড়কসমূহ টিকছে না। তার সঠিক মূল্যায়ন করে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। উন্নয়ন হতে হবে টেকসই। সড়ক উন্নয়নের পরিবর্তে যদি সংশ্লিষ্টদের উন্নতির পরিমাণ বেশি হয় তা হলে দেশের ভবিষ্যত এবং দেশবাসীর কপাল পুড়বে ছাড়া ভাল হবে বলে মনে হয় না।
লেখক : সাংবাদিক -কলামিস্ট
[email protected]
০১৭১০-৮৬৪৭৩৩