সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতেই হবে

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতেই হবে

মীর আব্দুল আলীম : সড়ক নিরাপদ করতে আবারও আরেকটা কমিটি হলো। এমন কমিটিতে আমি আর ভরসা পাই না কখনো। এ কমিটি কিছু একটা করে দেখাতে পারলে দেশের মানুষ অন্তত বেঁচে যায়। রাস্তায় বেরিয়েতো সবার বুক দুরু দুরু করে। কখন কি হয়। কমিটি কি হলো তা ভাবার বিষয় নয়, আমাদের সড়ক নিরাপদ হলেই চলে। এই সামান্য চাওয়াইতো দেশবাসীর। দেখা যাক কি হয়। অপেক্ষাতো করছি যুগযুগ ধরে। আমরা না হয় অপেক্ষায় থাকলাম।
সেই কবে ২০১০ সালে শুরু হয় বিদ্যমান সড়ক আইন সংশোধনের প্রক্রিয়া। তা দফায় দফায় কাটাছেঁড়া করা হয়। এরই মধ্যে গত বছর জুলাইয়ে রাজধানীতে দুই কলেজ শিক্ষার্থী বাসচাপায় নিহত হন। এরপর সারাদেশে শিক্ষার্থীদের নজিরবিহীন আন্দোলনে পরিবহন খাতের ভয়াবহ বিশৃঙ্খলার বিষয়গুলো আলোচনায় উঠে আসে। ওই সময়ই শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলিয়ে রাখা সড়ক পরিবহন আইন সংসদে পাস হয়। কিন্তু ওই আইনের কয়েকটি ধারা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে সেগুলো বাতিলের দাবি তোলেন পরিবহন শ্রমিকরা। দাবি বাস্তবায়নে তারা দেশজুড়ে পরিবহন ধর্মঘট ডাকলে দুর্ভোগ পোহাতে হয় মানুষকে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সড়ক নিরাপদ করতে বরাবরই সদিচ্ছা দেখিয়েছেন। সড়ক-মহাসড়ক এবং পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা রক্ষার এবং সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ এবং তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ জরুরি হয়ে পড়েছে। সড়ক পরিবহন আইন সংসদে পাস হয়েছে। আইন প্রণয়নের পর আইনটা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় কোনো বিধিবিধান করে, বাস্তবতার সঙ্গে যতটা সঙ্গতি রাখা যায়, সে বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট তিন মন্ত্রীকে দায়িত্বও দেয়া হয়েছে। তারা আইনটা প্রয়োগ করতে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করে সড়ক নিরাপদ করতে কতটা সফল হবেন সেটাই এখন দেখবার বিষয়।
কেবল আইন তৈরি আর হম্বি তম্বি করলেই হবে না। আইনের প্রয়োগ করতে হবে। সড়কে কুয়া কেটে আমাদের হাঁটতে দিবেন তা কি করে হয়?  সড়কে যারা পরিবহন চালায় (ড্রাইভার) এদের ক’জনের বৈধ লাইসেন্স আছে? লাইসেন্স যাদের আছে তাদের লাইসেন্স দেয়ার সময়ওতো অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুর্নীতি হয়েছে। যাচাই বাছাই ছাড়াই অনেকে অর্থের বিনিময়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়েছেন। আগে সঠিক ড্রাইভার দিয়ে রাস্তায় গাড়ি নামানোর ব্যবস্থা করুন। আমরা দেখেছি পরিবহন নেতা, কখনো কখনো মন্ত্রীর পর্যন্ত বলেছেন দক্ষ ড্রাইভারের বড্ড অভাব নাকি দেশে। এদেশে ক’টা পরিবহনের ফিটনেস আছে? রাস্তায় চলার জন্য যে সব পরিবহন সুস্থ না সেটা এক্সিডেন্ট করবে নাতো কি করবে? এমন অভিযোগ আলোচনায় যে না দেখেই ফিটনেস পেয়ে যায় লক্কর-ঝক্কর গাড়ি। ওসব গাড়িতো ব্রেক ফেইল কিংবা উল্টে খাদে পড়বেই।
রাস্তায় কুয়ো খুঁড়ে কখনই সড়ক নিরাপদ করা যাবে না। সবার আগে সঠিক ড্রাইভার আর সঠিক গাড়ি রাস্তায় নামানো চাই। তার পর আইনের প্রয়োগ করুন। সকলকে আইন মানতে বাধ্য করুন। জনগণকে সচেতন করুন। সড়ক নিরাপদ হবেই হবে। কথা হলো সবার আগে নিয়তটা ভালো করতে হবে। আমরা সবাই নিরাপদ সড়ক চাই কিনা সেটা দেখতে হবে। আর লোক দেখানো কমিটি করবেন না। মানুষের জান বড় না সড়কে চলাচল বড় কথা! মানুষ চাপা দিয়ে রাস্তায় চলতে হবে কেন? এদেশে রাস্তা যেভাবে, যত মৃত্যু হয়- কোনদেশে এমন হয় আপনারাই বলুন।
যেসব দেশকে খুব দরিদ্র ভাবতাম তারা আমাদের চেয়ে সভ্যতায় অনেক বেশি এগিয়ে। ভুটানে যাইনি এই ভেবে যে পাহাড় আর গরিব দেশে কি দেখব, আর শিখবইবা কি? গত ২৫ জানুয়ারি আমার পরিচালনাধীন আল-রাফি হাসপাতাল লি’-এর পরিচালক এবং ডাক্তারদের নিয়ে এক অনুষ্ঠানে ভুটান যাই। আমরা প্রায় ৮ লাখ মানুষের দেশ থেকে অনেক কিছু শিখলাম। মানুষ সভ্য হতে পুলিশ প্রশাসনের দরকার হয় না। ৪৬,৫০০ বর্গকিলোমিটার দেশের মানুষ আইন মেনে চলে। সেখানে সবাইকে আইন মানতে বাধ্য করা হয়েছে।  ভুটানে মাত্র পাঁচ দিন ছিলাম। এ অল্প সময়েই নিজেকে সুস্থ অনুভব করছিলাম। খাবারের ভীতি ছিলো না। ভেজাল দিতে ওরা বোধ হয় শিখেনি। পোশাক আশাক দামি না হলেও আধুনিকতার ছাপ। সব চেয়ে বড় কথা ওরা আইন ভাঙ্গেনা কখনো। রাস্তায় পাঁচ দিনে পুলিশ দেখেছি এক জন মাত্র। রাস্তার আইন ওরা শতভাগ মানে। তাই দুর্গম পথেও দুর্ঘটনা নেই বললেই চলে। আমাদের বহনকারী ট্যুরিষ্ট বাসটি নির্দিষ্ট জায়গাতেই থামছিলো। আমরা কোন দর্শণীয় জায়গা পেলে নামতে চাইলেও বলছিলো এখানে থামার নিয়ম নেই। ত্রিসীমানায় কেউ নেই তবুও নিজ থেকেই ড্রাইভার নিয়ম মেনে চলছে। কখনো মোবাইল ফোন ধরার প্রয়োজন হলে গাড়ি থামিয়ে কথা শেষ করে তবেই গাড়ি চালাচ্ছিলেন তিনি। পথচারীর চেয়েও ড্রাইভারগণ অনেক বেশি সচেতন। পথচারী পথ পার হবে বুঝতে পেরে বহু আগে থেকেই গাড়ি থামিয়ে বসে থাকে ড্রাইভার। এমন নিয়ম কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপানে দেখেছি। বোধ করি তার চেয়েও গরিব দেশটিতে ড্রাইভাররা অনেক বেশি সচেতন মনে হয়েছে আমার। এখানে সি সি ক্যামেরা পুলিশ নজরদারি নেই, আইন না মানলেও দেখার কেউ নেই, তবুও ওরা আইন মানছে। ওরা সভ্য তাই সড়কে নিরাপত্তা বেশি। পাঁচ দিন সড়কে নির্ভয়ে চলেছি। ভীতি ছিলো না। আমাদের ফুটপথ দিয়ে চলতেও ভয় পাই, কখন গাড়ি গায়ে উঠে যায়। মোদ্দা কথা হলো সকলকে সড়কের আইন মানতে বাধ্য করতে হবে। তবেই সড়ক নিরাপদ হবে।
অনেক ধনী রাষ্ট্রে যাবার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। কিন্তু মিয়ানমারের মতো দরিদ্র একটি রাষ্ট্রে গিয়ে ওদের সভ্যতা আর আমাদের সভ্যতার তফাৎ দেখে বেশ লজ্জাবোধ হলো আমার। হতবাকতো হয়েছিই। মিয়ানমার সম্পর্কে আমাদের ধারণা খুব ভালো নয়। ধর্মের বিষয়ে তো নয়ই। বার্মা বা মিয়ানমার মানেই দরিদ্র একটি রাষ্ট্র। মুসলমানদের নির্যাতনের ব্যাপারেও তাদের আছে অনেক বদনাম। সেদেশের সেনারা অনেক নিষ্ঠুরতা চালিয়ে বহু মুসলমানদের ওরা হত্যা করেছে। যা সারা বিশে^ ঘৃণিত। এ রাষ্ট্রের ব্যাপারে আমাদের বাজে অভিজ্ঞতা আছে। আর যাই হোক, ওরা সড়ক আইনের প্রতি অনেক বেশি শ্রদ্ধাশীল। ওখানে গিয়ে বুঝেছি আইন মানতে, আর সভ্য হতে অর্থের প্রয়োজন পড়ে না। ভালো কিছুর গুণকীর্তন করতেই হয়। মিয়ানমারের ভালো কিছু থাকলে সেটা নিয়ে আলোচনা করতেই পারি। মন্দটা না হয় ওদের কাছেই থাক। ওদের ভালো কিছু যা আছে, যা থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি।
মিয়ানমারের রাস্তায় ডিভাইডার নেই বললেই চলে। সাদা দাগ দিয়ে চলার পথ নির্দিষ্ট করা। রাস্তায় ট্রাফিকও নেই খুব একটা। অবাক করা কথা পাঁচ দিনের যাত্রায় একটি বারও কাউকে নিজ দাগ অতিক্রম করতে দেখলাম না। আমরা যেখানে পারলে ইটপাথরের ডিভাইডার উল্টেপাল্টে চলতে অভ্যস্ত সেখানে ওরা দাগও অতিক্রম করে না। একদিকে এক কিলেমিটার ট্রাফিক জ্যাম চলে গেছে। অন্যদিকে ধেয়ে চলছে গাড়ি। ডিভাইডার নেই তবুও কেউ কারও জায়গায় যাচ্ছে না। আমাদের দেশে ডিভাইডার দিয়ে যেখানে রক্ষা নেই সেখানে সাদা দাগই তাদের জন্য যথেষ্ট। ওভারটেকিং কিংবা হর্ণ বাজানো দরকার না পড়লে কেউ করে না সাধারণত। দিনে এমন; দেখি রাতে ওরা কি করে? ইয়াংগুনের ৫ তাঁরকা হোটেলের রুম থেকে গভীর রাতে রাস্তার দৃশ্য দেখতে জানালার পাশে গিয়ে বসলাম। গভীর রাতেও কাউকে দাগ অতিক্রম করতে দেখিনি। লেইন পরিবর্তন করতে গেলেও রাতেও ১/২ কিলোমিটার ঘুরে তবে অন্য লেইনে যায় গাড়িগুলো। সৌদি আরব, চীন, সিংগাপুর, মালয়েশিয়া, কোরিয়া, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশেই এ অবস্থা লক্ষ্য করেছি। ভাবি আমরা কেন ওদের কাছ থেকে শিক্ষা নিচ্ছি না? আমাদের রাষ্ট্র যারা পরিচালন করেন তারাতো এসব দেশে আসেন। রাষ্ট্রের খরচায় ওনারা বিদেশে আসেন। প্রশ্ন হলো তারা কি এসব দেখেন না? শিখেনই না বা কেন?
মন্দ ভাগ্য আমাদের। আমাদের লোকজন শেখানও না; শিখানও না। শিখলে আর শিখালে আমাদের রাষ্ট্রের পরিবহণ ব্যবস্থাও এমন হতো না কখনই। আইন করলেই হয় না। আইন প্রয়োগ করে শিখাতে হয়। মিয়ানমারের রাজধানী ইয়াংগুনের অধিবাসীদের সাথে কথা বলে যতদূর জেনেছি, পরিবহণ ব্যবস্থা এমন করতে রাষ্ট্রযন্ত্র খুব নিষ্ঠুর ছিল। যারা আইন মানতো না তাদের কঠোর শাস্তি দিয়ে সভ্য করা হয়েছে। সভ্য হতে বাধ্য করে তবেই সভ্য করা হয়েছে। আর একবার কেউ সভ্য হয়ে গেলে, অসভ্য হতে বিবেকে বাধ সাধে। বলতে গেলে ওদেরকে সভ্য করানো হয়েছে আমরাও সভ্য হতে চাই। নিরাপদ সড়ক চাই। তা আমাদের প্রধানমন্ত্রীকেই উপহার দিতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কঠোর হোন। যারা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে আছেন তাদের কঠোর হতে বলুন। আমি বিশ্বাস করি আপনি চাইলে তা পারবেন। প্রধানমন্ত্রীতো ছোট পদ নয় যে, ইচ্ছা পূরণ হবে না। ইচ্ছা করতে হবে; নিষ্ঠুর হতে হবে; তবেই আমাদের সভ্য বানাতে পারবেন আপনি।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সম্পাদক  
নিউজ-বাংলাদেশ ডটকম,
[email protected]  
০১৭১৩-৩৩৪৬৪৮