সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামছেই না

সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামছেই না

মীর আব্দুল আলীম : সড়কে দুর্ঘটনা ও মৃত্যু দুটোই বেড়েছে। প্রাণ ঝরছেই। আজকের (৫ জানুয়ারি) প্রায় সবক’টি জাতিয় দৈনিক এ খবরটি ছেপেছে। প্রাণতো ঝরবেই। সড়ক দুর্ঘটনার লাগাম টানা না গেলে প্রাণহানি বাড়বেই। সড়ক সংশ্লিষ্ট এক হিসাব বলছে, ২০১৮ সালের তুলনায় বিগত ২০১৯ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ১৭.৭৫ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪ হাজার ৭০২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ২২৭ জন নিহত হয়েছেন। প্রতিদিন গড়ে ১৪ জনের প্রাণহানি হয়েছে। ২০১৮ সালের ৩ হাজার ৩৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন ৪ হাজার ৪৩৯ জন। ২০১৮ সালের তুলনায় ১ হাজার ৫৯৯টি সড়ক দুর্ঘটনা বেশি হয়েছে ২০১৯ সালে। ২০১৮ সালের চেয়ে ২০১৯ সালে ৭৮৮ জন মানুষ বেশি মারা গেছেন। সবচেয়ে বেশি ৩০৯টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে রাজধানী ঢাকায়। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বাড়ছে। নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) সংগঠনের করা ‘২০১৯ সালের সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানে’ এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করে বলছে, সড়ক দুর্ঘটনার ৯০ শতাংশেরই কারণ হলো চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও গতি। সড়ক দুর্ঘটনা বিশ্লেষণ করে এআরআই বলছে, দেশে ৫৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে। আর চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ৩৭ শতাংশ। অর্থাৎ চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও গতির কারণে ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে। আর পরিবেশ-পরিস্থিতিসহ অন্যান্য কারণে দুর্ঘটনা ১০ শতাংশ। অশিক্ষিত ও অদক্ষ চালক, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, অসচেতনতা, অনিয়ন্ত্রিত গতি, রাস্তা নির্মাণে ত্রুটি, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, আইনের যথাযথ প্রয়োগ না করা এসব দুর্ঘটনার মূল কারণ। এর মধ্যে অন্যতমগুলো হলো: ট্রাফিক সিগন্যাল মানা, যত্রতত্র পার্কিং না করা, ওভারটেক বিষয়ে আইন প্রয়োগ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা, সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়গুলো স্কুলের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা, মিডিয়ায় সচেতনতা কার্যক্রম বাড়ানো, দক্ষ চালক তৈরিতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, মহাসড়ক ও প্রধান সড়ক চার লেনে উন্নীত করা, সড়কের ত্রুটি দূর করা। গেল বছর (২০১৯) বেশির ভাগ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে বড় শহর ও মহাসড়কগুলোতে। অবৈধ যানবাহন ভ্যান, রিকশা, নছিমন, অটোরিকশা এ জন্য দায়ী বলে প্রতীয়মান হয়। আইনকে অমান্য করে ধীরগতির বাহন মহাসড়কে এখনো চলাচল করে, যা দূরপাল্লার বড় গাড়িগুলোর চলাচলে বিঘœ সৃষ্টি করে। স্থানীয় প্রশাসন ও হাইওয়ে পুলিশকে এই ব্যাপারে তেমন কোনো কার্যকর ভূমিকা নিতে দেখা যায় না।
প্রশ্ন হলো, সড়ক দুর্ঘটনায় আর কত প্রাণ ঝরে যাবে? নিত্যনৈমিত্তিক এই সড়ক দুর্ঘটনার দায় কার? কে দেবে এ প্রশ্নের উত্তর? প্রতিদিনই কোনো না কোনো এলাকায় দুর্ঘটনার শিকার হয়ে অকাল মৃত্যুবরণ করতে হচ্ছে মানুষকে। কোনো দুর্ঘটনায় গোটা পরিবারও শেষ হয়ে যাচ্ছে। এমন নজিরও রয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা যেন এক অলঙ্ঘনীয় ব্যাপার, মৃত্যুদূত সামনে দাঁড়িয়ে থাকার মতো। ফলে এই প্রশ্ন করা অসঙ্গত নয় যে, আর কত মানুষকে মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে এ অস্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়?  কথায় বলে ‘ঘুমন্ত লোকের ঘুম ভাঙানো সম্ভব, কিন্তু জেগে জেগে ঘুমালে কঠিন’। শত চেষ্টায়ও তাকে জাগানো যায় না। আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের যেন সেই দশা। একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে, নতুন নতুন সুপারিশ তুলে ধরা হচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই যেন কিছু হচ্ছে না। পাগলা ঘোড়ার লাগামও মনে হয় টেনে রাখা সম্ভব, কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনার হাত থেকে মানুষের নিস্তার নেই, তার লাগাম টানে কার সাধ্য!
সড়ক দুর্ঘটনার এমন মৃত্যুমিছিল যেন নিত্যদিনের দুঃসংবাদ! ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সমস্যা, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে জটিলতা, জরুরি ব্যবস্থাপনায় পরিকল্পনাহীনতাও দুর্ঘটনা বাড়ার পেছনে দায়ী। শুধু চালকের লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে শতভাগ নৈতিক ও কঠোর থাকতে পারলেই দুর্ঘটনা বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। এটা ঠিক যে, দেশের বর্ধিষ্ণু জনসংখ্যার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে। এসব যান চালানোর জন্য চাই দক্ষ ও বিবেচক চালক। এই বিপুলসংখ্যক যোগ্য চালক তৈরির জন্য দেশে কি কোন সুষ্ঠু কার্যক্রম রয়েছে? এমনকি লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালকদের চলার পথে আরও সতর্ক থাকা এবং ট্রাফিক আইন যথাযথভাবে মেনে চলার ব্যাপারে কোন কর্মশালা কিংবা প্রশিক্ষণের পরিকল্পনাও কি নিয়ে থাকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ? সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আসলে সব পক্ষকে আন্তরিক হতে হবে। একটি সুষ্ঠু সমাধানে পৌঁছানোর লক্ষ্যে উদ্যোগী হতে হবে। তা না হলে যে কেউ যে কোনদিন সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে ইহধাম ত্যাগ কিংবা পঙ্গুগুত্ববরণ করবেন, এটা নিঃসংশয়ে বলা যায়।
ঘর থেকে বের হয়ে আবার ঘরে ফেরা যাবে কি? এমন সংশয় বরাবরই থেকে যায়। এ প্রশ্নের ইতিবাচক জবাব পাওয়া কঠিন বাংলাদেশে। কিছুদিন আগে গণমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দেশে বৈধ যানবাহনের সংখ্যা ১৩ লাখেরও বেশি। অথচ বৈধ চালকের সংখ্যা মাত্র ৮ লাখ। বাকি যানবাহন যাদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে, তাদের লাইসেন্স বৈধ নয়। অনেকের একাধিক লাইসেন্সও আছে। স্বাভাবিকভাবেই এ অবৈধ লাইসেন্সধারী গাড়িচালকরা গাড়ি চালাতে গিয়ে আইনের ধার ধারেন না। সঠিকভাবে প্রশিক্ষিত নন, এমন চালকের সংখ্যাও নেহাতই কম নয়। এই চালকদের পেছনে আছে শক্তিশালী পৃষ্ঠপোষকতা, যে কারণে এদের শনাক্ত করাও হয়ে পড়েছে দুস্কর। সঙ্গত কারণে চালকরাও তাই বেপরোয়া। বিষয়টি নিঃসন্দেহে ভয়াবহ। কেননা এই পরিস্থিতি একটি দেশের পক্ষে কিছুতেই স্বস্তির হতে পারে না। স্মর্তব্য যে, সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে এ যাবত অনেক কথা বলা হয়েছে। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, সড়কপথ আজো নিরাপদ হলো না। সড়কপথের ‘যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত’ কথার কথা হয়েই থেকে গেল। মাঝে মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনার যেসব তথ্য গণমাধ্যমে উঠে আসে তা একটি দেশের জন্য দুর্বিষহ এবং আতঙ্কের। অথচ সরকারের কর্তব্য হওয়া দরকার জনগণের স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা দিতে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া।
এক গবেষণায় দেখা যায়, নানা কারণে দেশে প্রতি ১০ হাজার মোটরযানে ১০০টি ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটছে। উন্নত দেশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এক হাজার মোটরযানে দুই দশমিক পাঁচ ভাগ থেকে তিন দশমিক পাঁচ ভাগ। অন্যদিকে আমাদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রতি এক হাজার যানবাহনে ১৬৩ জন দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্স ইনস্টিটিউট (আইআরআই) পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর ১২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হচ্ছে। নিহতের ৮০ শতাংশের বয়স পাঁচ থেকে ৪৫ বছর। নিহতদের মধ্যে ৫৩ শতাংশ পথচারী। যাদের ২১ শতাংশের বয়স ১৬ বছরের নিচে। দুর্ঘটনায় আহত ১৫ শতাংশ লোক মারা যায় ঘটনার ১৫ মিনিটের মধ্যে। দেশে ১৬ লাখ রেজিস্টার্ড গাড়ি রয়েছে আর লাইসেন্স পাওয়া ড্রাইভার রয়েছে মাত্র ১০ লাখ। ৪ লাখ ড্রাইভারের ঘাটতি রয়েছে। সুতরাং ড্রাইভিং ট্রেনিং দেয়া ও তাদের জন্য লাইসেন্সের দরকার আছে। তা নাহলে প্রতিনিয়তই এভাবে অকাতরে ঝরবে আমাদের প্রাণ।
সরকারি হিসাব মতে, ১৯৯৯ সালে ৪ হাজার ৯১৬ জন, ২০০০ সালে ৪ হাজার ৩৫৭ জন, ২০০১ সালে ৪ হাজার ৯১ জন, ২০০২ সালে ৪ হাজার ৯১৮ জন, ২০০৩ সালে ৪ হাজার ৭ ৪৯ জন, ২০০৪ সালে ৩ হাজার ৮২৮ জন, ২০০৫ সালে ৩ হাজার ৯৫৪ জন, ২০০৬ সালে ৩ হাজার ৭৯৪ জন, ২০০৭ সালে ৪ হাজার ৮৬৯ জন, ২০০৮ সালে ৪ হাজার ৪২৬ জন, ২০০৯ সালে ৪ হাজার ২৯৭ জন, ২০১০ সালে ৫ হাজার ৮০৩ জন, ২০১১ সালে ৩ হাজার ৬৮৮ জন, ২০১২ সালে ৫ হাজার ৯১১ জন, ২০১৩ সালে ৪ হাজার ৮৬৫ জন এবং ২০১৪ সালে  ৩ হাজার ৯৭৫ জন, ২০১৫ সালে সারা দেশে দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৮ হাজার ৬৪২ জন, ২০১৬ সালে ৪ হাজার ৩১২ জন, ২০১৭ সালে ৭ হাজার ৩৯৭, ২০১৮ সালে ৪ হাজার ৪৩৯ জন এবং ২০১৯ সালে ৫ হাজার ২২৭ জন নিহত হয়েছেন। বিগত বছর প্রতিদিন গড়ে ১৪ জনের প্রাণহানি হয়েছে। ২০১৮ সালের তুলনায় ১ হাজার ৫৯৯টি সড়ক দুর্ঘটনা বেশি হয়েছে ২০১৯ সালে। প্রতিবছরই এভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মরছে আর তা রোধ করা যাচ্ছে না।
আইন না মানাই হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণ। এ ক্ষেত্রে সবাইকে আইন মানতে বাধ্য করতে হবে। প্রশাসন এ আইন প্রয়োগে ব্যর্থ হলে প্রয়োজনে তাদের ঢেলে সাজাতে হবে, অন্যথায় দুর্ঘটনা রোধে নতুন করে র‌্যাবের মতো দুর্ঘটনা রোধে বিশেষ বাহিনী গঠন করতে হবে। দুর্ঘটনার অন্যতম কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে  ১. ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চলাচল, ২. মোবাইল ফোন ব্যবহার, ৩. অতিরিক্ত যাত্রী এবং পণ্য পরিবহন, ৪. ট্রাফিক আইন না মানা, ৫. নিয়োজিতদের দায়িত্বে অবহেলা, ৬. চালকদের বেপরোয়া মনোভাব, অদক্ষতা ও অসতর্কতা এবং ৭. অরক্ষিত রেললাইন। আর এসব কারণে প্রতিদিনই ঘটছে হতাহতের ঘটনা।
দুর্ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে, ঘটবেও। কেন তা রোধ করা যাচ্ছে না? আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকায় দেশে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। এসব রুখতে হবে? যে কোনো মৃত্যুই দুঃখজনক। সে মৃত্যু যদি অকাল ও আকস্মিক হয়, তবে তা মেনে নেয়া আরও কঠিন। প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে একের পর এক অকালমৃত্যু আমাদের শুধু প্রত্যক্ষই করতে হচ্ছে না, এ দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক বিভীষিকাময় ও অরাজক পরিস্থিতিও মোকাবিলা করতে হচ্ছে, যা আমাদের কারও কাছেই কাম্য নয়। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানোর ঘটনা যেমন আমাদের ব্যথিত করে, তেমনিভাবে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম অরাজক পরিস্থিতির উদ্ভবও আমাদের মর্মাহত ও স্তম্ভিত করে। যে কোনো হত্যার বিচার আমরা চাই, তবে কোনো হত্যা বা দুর্ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশের জন্য বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়াক, তা আমরা চাই না। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে পরিবহন মালিক ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে সমন্বিত আন্তরিক, সচেতন, দৃঢ় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা আমরা আশা করি।
লেখক ঃ সাংবাদিক, গবেষক ও কলামিস্ট
[email protected]  
০১৭১৩৩৩৪৬৪৮