সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে যেভাবে...

সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে যেভাবে...

মীর আব্দুল আলীম : দেশে যেভাবে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে তাতে, নিরাপদ সড়ক বলে আর কিছু আছে এমনটা ভাবা যাবে না। প্রতিদিন সড়কে মৃত্যু ঘটলেও সংশ্লিষ্টদের কাছে এটি গা-সওয়া হয়ে গেছে। সরকার, প্রশাসন, পরিবহন শ্রমিক সংগঠন সবাই সড়ক দুর্ঘটনা চায় না বলছে, কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না কেন? উল্টো দুর্ঘটনা বাড়ছে। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন কোনো কাজ নয়। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ কয়েক মাসেই সম্ভব। কীভাবে? সরকার সংশ্লিষ্ট সবাই অধিক মানবিক এবং আন্তরিক হলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে আসবে। সঙ্গে জনগণকে সচেতন হতে হবে। জনগণকে সচেতন করা এবং আইন মানতে বাধ্য করার দায়িত্বটাও কিন্তু সরকারের। প্রশ্ন হলো- কীভাবে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে?
সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করতে সরকারকে অনেক বেশি কঠোর হতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি সরকার সংশ্লিষ্টরা সম্পূর্ণ আন্তরিকতার সঙ্গে চাইলে এবং নিচের পন্থাগুলো অবলম্বন করলে সড়ক দুর্ঘটনা কমে আসবেই।
প্রতিটি সড়কে টার্গেট করে সেখানে কয়েকজন ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে হবে। যেমন ঢাকা থেকে ভুলতা পর্যন্ত (ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক) এবং ঢাকা থেকে মেঘনা ব্রিজ (ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক) পর্যন্ত সড়কে টানা এক সপ্তাহ কিংবা আরও অধিক সময় ধরে কয়েক দফায় অভিযান চালাতে হবে। তার পর আবার অন্য কোনো সড়কে যেমন ঢাকা- মাওয়া, ঢাকা-আরিচাসহ বিভিন্ন সড়কে হঠাৎ অভিযান পরিচালনা করতে হবে। পরিবহন আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। এ সময় যেসব গাড়ি কিংবা ড্রাইভার সাজাপ্রাপ্ত হলো তারা আবার অবৈধভাবে গাড়ি পরিচালনা, অবৈধ ড্রাইভার কিংবা ট্রাফিক আইন মেনে না চললে সেসব গাড়ির রুট পারমিট বাতিল করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার আয়ের পথও তৈরি করে নিতে পারে। যেমন- যেসব গাড়ির রুট পারমিট বাতিল হবে সেসব গাড়িকে রুট পারমিট নিতে কম করে ৬ মাস সময় বেঁধে দিতে হবে। গাড়ির সমমূল্যে সরকারকে ফি প্রদান করে তবেই রুট পারমিট দেয়া যেতে পারে। এমন অর্থদন্ড এবং সময় পরিবহন মালিকদের সচেতন হতে বাধ্য করবে।
জঙ্গি দমনে যেভাবে র‌্যাবকে কাজে লাগানো হয়েছিল সেভাবে সাময়িক সময়ের জন্য তাদের দায়িত্ব দিয়ে মাঠে নামানো যায়।  অবৈধ ড্রাইভার কর্তৃক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলে ড্রাইভার এবং মালিককে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করতে হবে। ওই মামলা দ্রুত বিচার আইনে পরিচালিত হতে পারে। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য বিশেষ আদালত গঠনের কথাও সরকার চিন্তা করতে পারে।
আমাদের ট্রাফিক পুলিশ এবং হাইওয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ অনেক। পত্রপত্রিকায় ট্রাফিক পুলিশ নিয়ে অনেক খবর বের হচ্ছে। এখনই তাদের লাগাম টেনে ধরতে হবে।
প্রতিদিন সড়কে এসব কি হচ্ছে? সাধারণ মানুষ কাজে বের হয়ে রাস্তায় বিনা কারণে মারা গেছে। শিশু ড্রাইভারদেরও দেখি সড়কে। যারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণই বোঝে না তারা এত বড় গাড়ি সামাল দেয় কি করে? সড়কে অবৈধ ড্রাইভার কত তা সরকার সংশ্লিষ্টরাও বোধ করি জানেন না। বিআরটিএ অবৈধ যানবাহনের লাইসেন্স দিচ্ছে নগদী নারায়ণ পেয়ে। তাহলে সড়কে মানুষ কেন খুন হবে না? আমার কথা ভালো না লাগলে আপনারা আমাকে জেলে ঢুকিয়ে দিন, আমাকে ক্রসফায়ার দিয়ে দিন তবুও খুনে সড়ক শান্ত করুন। এভাবে চলে না। এভাবে জনগণ আতঙ্কে থাকতে পারে না। আতঙ্কিত মানুষ অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। জনগণকে আতঙ্কে রাখার অধিকার আপনাদের কে দিয়েছে?
একটাই প্রশ্ন-আমরা কি ঘর থেকে রাস্তায় বেরিয়ে আবার নিরাপদে বাড়ি ফেরার আশা করতে পারব কখনো? খুনে সড়ক নিয়ে কেউ ভাবে না। কর্মকর্তা-কর্মচারিরা বেতন-ভাতা বাড়ানোর জন্য দিনের পর দিন অনশন করেন। প্রায়ই শিক্ষক, ডাক্তার, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, উকিল, নার্স সবাই নিজেদের লাভের খোঁজে দাবি আদায়ে সোচ্চার হন, কিন্তু কাউকেই নিরাপদ সড়কের জন্য এমন উদ্যোগী হন না। প্রতিদিন সড়কে ১০-১২ জন করে মানুষ মরছে। এটা কি সহজ কথা! এটা তো সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুু নয়, এটা হত্যাকান্ড। এ দেশে খুন-খারাবিতে, দাঙ্গা-হাঙ্গায়, গুম-খুনে যত মানুষ মারা যাচ্ছে তার চেয়ে বহুগুণ মানুষ মারা যায় গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে। কি করছি আমরা, কি করছে সংশ্লিষ্টরা? আর সরকারই বা কি করছে? আমাদের নিরাপদ রাখার কোনো দায়িত্ব কি সরকারের নেই? আসলে সড়কের ব্যাপারে কেউ তেমনভাবে না বলেই মনে হয়। কার্যকর কিছু একটা যদি করা হতো তাহলে আমাদের সড়ক এত অনিরাপদ কেন?
এ দেশে সড়ক দুর্ঘটনা স্বাভাবিক এবং প্রাকৃতিক নয়, তা হচ্ছে মানবসৃষ্ট। সে হিসেবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতরা পরোক্ষভাবে হত্যারই শিকার। কিন্তু হত্যাকারীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার কাঙ্খিত উদ্যোগ নেই। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা না কমে জ্যামিতিক হারে বেড়েই চলেছে। সড়ক দুর্ঘটনা, এ যেন অলঙ্ঘনীয় ব্যাপার; মৃত্যুদূত ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার মতো। ঘর থেকে বের হয়ে আবার ঘরে ফেরা যাবে কি?  এমন সংশয় বরাবরই থেকে যায়। এ প্রশ্নের ইতিবাচক জবাব পাওয়াও কঠিন দেশে। তাই প্রতিদিন গণমাধ্যমে আমরা দেখতে পাচ্ছি সড়ক দুর্ঘটনার অসংখ্য বীভৎস ছবি, দেখতে পাই স্বজন হারানোদের আহাজারি। আমাদের সড়ক যেন এখন মরণফাঁদ। এমন কোনো দিন নেই, যেদিন অকালে প্রাণ ঝরছে না, প্রিয়জন হারানোর বেদনায় বাতাস ভারী হয়ে উঠছে না। এমন বেদনা বুকে ধারণ করেই আমরা বেঁচে আছি। দেশে যেভাবে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে তাতে, নিরাপদ সড়ক বলে আর কিছু আছে এমনটা ভাবা যাবে না। প্রতিদিন সড়কে মৃত্যু ঘটলেও সংশ্লিষ্টদের কাছে এটি গা-সওয়া হয়ে গেছে।
এভাবে দুর্ঘটনা সংঘটনকারী চালকদের শাস্তি না হওয়া, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন, লাইসেন্সবিহীন ও অদক্ষ চালক কর্তৃক গাড়ি চালানো, আনফিট গাড়ি রাস্তায় নামানো, সড়ক যোগাযোগে অব্যবস্থাপনা ইত্যাদি কারণে ইদানীং সড়ক দুর্ঘটনা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। দুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িত চালকদের বিচারের কাঠগড়ায় নিয়ে আসার ঘটনা এ দেশে বিরল। দেখা গেছে, প্রায় সব কটি দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেই চালকরা পার পেয়ে গেছে। কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি তাদের বিরুদ্ধে। সরকারি হিসাবে গত ১০ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মারা গেছে ৩৪ হাজার ৯১৮ জন। প্রতি বছর মারা যায় ৩ হাজার ৪৯১ জন। থানায় মামলা হয়েছে এমন দুর্ঘটনার হিসাব নিয়ে পুলিশ এ তথ্য দিয়েছে। বেসরকারি হিসাবে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে ২০ হাজার ৩৪ জন। প্রতিদিন গড়ে মারা যায় প্রায় ৫৫ জন। পুলিশের দেয়া তথ্য ও বেসরকারিভাবে প্রাপ্ত তথ্যের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান থাকার কারণ হলো- দুর্ঘটনার পর পুলিশকে ৬৭ ধরনের প্রশ্নের উত্তর সংগ্রহ করে প্রতিবেদন জমা দিতে হয়। এ ঝামেলার কারণে অনেক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর বিষয়টি পুলিশ রেকর্ডভুক্ত করে না।
সরকারি হিসাব মতে, ১৯৯৯ সালে ৪ হাজার ৯১৬ জন, ২০০০ সালে ৪ হাজার ৩৫৭ জন, ২০০১ সালে ৪ হাজার ৯১ জন, ২০০২ সালে ৪ হাজার ৯১৮ জন, ২০০৩ সালে ৪ হাজার ৭ ৪৯ জন, ২০০৪ সালে ৩ হাজার ৮২৮ জন, ২০০৫ সালে ৩ হাজার ৯৫৪ জন, ২০০৬ সালে ৩ হাজার ৭৯৪ জন, ২০০৭ সালে ৪ হাজার ৮৬৯ জন, ২০০৮ সালে ৪ হাজার ৪২৬ জন, ২০০৯ সালে ৪ হাজার ২৯৭ জন, ২০১০ সালে ৫ হাজার ৮০৩ জন, ২০১১ সালে ৩ হাজার ৬৮৮ জন, ২০১২ সালে ৫ হাজার ৯১১ জন, ২০১৩ সালে ৪ হাজার ৮৬৫ জন এবং ২০১৪ সালে ৩ হাজার ৯৭৫ জন, ২০১৫ সালে ৮ হাজার ৬৪২ জন, ২০১৬ সালে ৭ হাজার ৪২৭ জন, ২০১৭ সালে ৮ হাজার ৬৯৮ জনের প্রাণহানি হয়েছে। ২০১৮ সালে ৪ হাজার ৫২২ জন। ২০১৯-এর শুরুতে সড়ক মৃত্যুর হার আরও বাড়ছে। সড়ক প্রশস্ত হচ্ছে, সেতু হচ্ছে, উড়াল সেতু হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনা কমছে না কেন? প্রতিবছরই এভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মরছে আর তা রোধ করা যাচ্ছে না কেন? অদক্ষ ও দুই নম্বরি লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালকরাই যে এসব দুর্ঘটনার জন্য দায়ী তা বলাই বাহুল্য।
সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিকার কি নেই? দেশে সন্ত্রাস দমনে যদি বিশেষ র‌্যাব বাহিনী গঠন করা যায়, দুর্ঘটনা রোধে এ জাতীয় বাহিনী নয় কেন? এক হিসেবে দেখা গেছে, দেশে সন্ত্রাসীদের হাতে শতকরা ৩০ জন লোক মারা গেলে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় ৭০ জন। ৩০ জনের জীবনসহ অপরাপর জানমাল রক্ষায় সরকারের একটি বাহিনী থাকলে শতকরা ৭০ জনের জীবনসহ অসংখ্য আহত ও ডলারে কেনা পরিবহন রক্ষায় সরকার সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বিশেষ বাহিনী গঠন করতে কি পারে না? দেশের মানুষের জানমাল রক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দুর্ঘটনা রোধে সরকারকে দেশের মানুষের স্বার্থে যথাসম্ভব দ্রুত ভাবতে হবে।
আইন না মানাই হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণ। এ ক্ষেত্রে সবাইকে আইন মানতে বাধ্য করতে হবে। ট্রাফিক পুলিশসহ চলমান প্রশাসন এ আইন প্রয়োগে ব্যর্থ হলে প্রয়োজনে তাদের ঢেলে সাজাতে হবে। দুর্ঘটনার অন্যতম কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ১. ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চলাচল, ২. মোবাইল ফোন ব্যবহার, ৩. অতিরিক্ত যাত্রী এবং পণ্য পরিবহন, ৪. ট্রাফিক আইন না মানা, ৫. নিয়োজিতদের দায়িত্বে অবহেলা, ৬. চালকদের বেপরোয়া মনোভাব, অদক্ষতা ও অসতর্কতা এবং ৭. অরক্ষিত রেললাইন। আর এসব কারণে প্রতিদিনই ঘটছে হতাহতের ঘটনা। দুর্ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে, ঘটবেও। কেন তা রোধ করা যাচ্ছে না? আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকায় দেশে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। এসব রুখতে হবে? যে কোনো মৃত্যুই দুঃখজনক। সে মৃত্যু যদি অকাল ও আকস্মিক হয়, তবে তা মেনে নেয়া আরও কঠিন। প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে একের পর এক অকালমৃত্যু আমাদের শুধু প্রত্যক্ষই করতে হচ্ছে না, এ দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক বিভীষিকাময় ও অরাজক পরিস্থিতিও মোকাবিলা করতে হচ্ছে, যা আমাদের কারও কাছেই কাম্য নয়। আমরা সড়ক দুর্ঘটনা রোধে পরিবহন মালিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে সমন্বিত আন্তরিক, সচেতন, দৃঢ় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা আশা করি।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সম্পাদক  
নিউজ-বাংলাদেশ ডটকম,
[email protected]  
০১৭১৩-৩৩৪৬৪