স্বাধীনতার স্বপ্নসুখ

স্বাধীনতার স্বপ্নসুখ

রাশেদুল ইসলাম রাশেদ: স্বাধীনতা শব্দটির সঙ্গে এদেশের লাখো শহীদের রক্তের দাগ লেগে আছে। বাঙালি যে বীরের জাতি, কোনভাবে বাঙালি জাতিকে যে দমিয়ে রাখা যায় না তার প্রমাণ বাঙালি জাতি বহুবার দিয়েছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ব্যালট বিপ্লব,  ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনে এদেশের ছাত্র সমাজের ভূমিকার কথা আমরা ভুলতে পারব না। ১৯৬০ সালে ১১ জানুয়ারি পাকিস্তানে মৌলিকগণতন্ত্রীদের নির্বাচনের মাধ্যমে ১৯৬০ সালে ১৪ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খান  পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পরেই ১৯৬২ সালে পূর্ব বাংলা বিরোধী ও বৈষম্যমূলক একটি শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেন। আইয়ুব খান মনে করেছিল পূর্ব বাংলার  শিক্ষার অগ্রগতি রোধ করতে পারলেই এই অঞ্চলের জাতীয়তাবাদী চেতনাবোধকে নস্যাৎ করে দেয়া যাবে। তাই  আইয়ুব খান তাদের নিজস্ব এসব কলুষিত চিন্তাভাবনাগুলোকে চরিতার্থ করার জন্য একটার পর একটা অন্যায়, অবিচার বাঙালিদের উপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে কিন্তু এদেশের ছাত্রসমাজ তাদের এই  অপকৌশলের ভর্ৎসনা করেছে, তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে।

 তৎকালীন সময়ে এই আন্দোলন আইয়ুব বিরোধী শিক্ষা আন্দোলন নামে পরিচিত লাভ করেছিল।  তারপর ১৯৬৬  সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থন, ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং সবশেষে ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীন যুদ্ধ, কোথাও বাঙালিকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণ গোটা বাঙালি জাতিকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের উপহার দিয়েছিল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আওয়ামী লীগ পূর্ব বাংলায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেন এবং ১৬৯ টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬৭ টি আসন পায়। অপরদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে ভুট্টো সাহেবের পিপিপি ( পাকিস্তান পিপলস পার্টি)  ১৪৪ টি আসনের মধ্যে ৮৮ টি আসন পায়। কিন্তু মোট ৩১৩ টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬৭ টি আসন পেয়ে গোটা পাকিস্তানে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং সরকার গঠনের সক্ষমতা অর্জন করেছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও ভু্েট্টা সাহেব মাত্র ৮৮ টি আসন পেয়ে নিজেকে গোটা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বা প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করেন। ভুট্টো সাহেব বলে বসেন আওয়ামী লীগ যদি ১৯৬৬ সালের ৬ দফা সংশোধন না করেন তাহলে তিনি জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিবেন না।

এই নিয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সাথে দীর্ঘ সময় গোপন বৈঠক চলে। এরমধ্যেই আবার ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসে মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক বসল্। মুজিব- ইয়াহিয়া বৈঠক শেষে ১৯৭১ সালের ১৪ জানুয়ারি ইয়াহিয়া সাহেব ঘোষণা করলেন যে পাকিস্তানের ভাবি প্রধানমন্ত্রী হবেন শেখ মুজিবুর রহমান কিন্তু তিনি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন কবে হবে এব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত দিলেন না।  অতঃপর নানা নাটকের অবসানের পর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১৩ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা করেন যে আগামী ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসবে। কিন্তু ভুট্টো সাহেব আবার আরেক বিপত্তি ঘটিয়ে বসলেন তিনি পাকিস্তান সরকারকে হুমকি দিয়ে বললেন যে ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদ অধিবেশনের স্থগিত করতে হবে। তার এই দাবি অগ্রাহ্য করা হলে তিনি খাইবার থেকে করাচী পর্যন্ত আগুন ধরিয়ে দিবেন। গোটা পাকিস্তানে তিনি আগুন জ্বালিয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে বসেন। ভুট্টো সাহেবের এই হুমকির প্রেক্ষিতে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসার মাত্র ২ দিন আগে ১ লা মার্চ আকস্মিকভাবে অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন।

এভাবে হঠাৎ করে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের ঘোষণা শুনে গোটা পূর্ব বাংলা তখন ক্ষোভে ফেটে পড়ে।  প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের ঝড় ওঠে রাজপথে। ঢাকা নগরী তখন মিছিলের নগরীতে পরিণত হয়। তখন সবার মুখে শুধু একটা কথা ‘আর কোন সমঝোতা নয় এবার চাই স্বাধীনতা’।  শেখ মুজিবুর রহমান এই ঘোষণার পর পরই একটি সাংবাদিক সম্মেলন ডাকেন। তিনি এই হঠকারি সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও বিরোধীতা  করেন। তিনি জনগণের উদ্দেশ্য নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। কর্মসূচি অনুযায়ী ২রা ৩রা মার্চ হরতাল পালন করা হয়। এতে পাকিস্তানি সরকার বাঙালিদের উপর আরও বেশি চড়াও হন। শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে অসহযোগ আন্দোলন। এই অসহযোগ আন্দোলন ছিল মূলত বাঙালিদের মুক্তিসংগ্রামের প্রথম প্রস্তুতি। এই আন্দোলনের তীব্রতা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ভিত নড়বড়ে করে দিয়েছিল। পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারেন যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব বাংলার মানুষের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ! ১ লা মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করার পরেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর হয়ে ওঠেন গোটা পূর্ব বাংলার অলিখিত সরকার প্রধান। ১ লা মার্চ থেকে ২৫ মার্চের কালো রাতের সামরিক হস্তক্ষেপের আগ পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রশাসন সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডির ৩২নং বাড়িটি হয়ে ওঠে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর মত ১০নং ডাউনিং স্ট্রিট।

সাধারণ মানুষ শেখ মুজিবকে কেন্দ্র করেই স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা শুরু  করেছিল। শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে ‘স্বাধীন বাংলা  ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ’ পল্টনে বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে। ‘স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের বিক্ষোভ সমাবেশে  ৫ দফা ভিত্তিক  প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়  যা বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসে ‘ স্বাধীনতার ইশতেহার নামে পরিচিত’। এছাড়াও এই সমাবেশে ৪- ৬ মার্চ আধাবেলা হরতাল  পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ এই আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে এবং পরবর্তীতে ইয়াহিয়া সরকার  ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করলে এদেশের আন্দোলনমুখী সাধারণ মানুষ তা প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের রেসকোর্স ময়দানে  ভাষণের পর এই অসহযোগ আন্দোলন আরও তীব্র আকার ধারণ করে। বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের এই ৭ মার্চের ভাষণকে আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গের  ৩ মিনিটের ভাষণ এবং মার্টিন লুথার কিং এর ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’ এই ভাষণগুলো সাথে তুলনা করা হয়। কারণ একটি ভাষণ একটি জাতিকে স্বাধীনতার স্বপ্ন সুখ এনে দিয়েছিল। ৭ মার্চের এই ভাষণটি ছিল গোটা বাঙালি জাতির  মুক্তির সনদ। বঙ্গবন্ধুর মাত্র ১৮ মিনিটের ভাষণে তিনি ২৩ বছরের রাজনীতি ও বাঙালিদের শাসন, শোষণ ও বঞ্চনার ইতিহাস ব্যাখ্যা করেন। সবাই ভেবেছিল এই বুঝি বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে ফেলবেন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীও ঠিক তাই চেয়েছিল যে বঙ্গবন্ধু যেন স্বাধীনতার ঘোষণাটা দিয়ে ফেলেন যাতে তারা বঙ্গবন্ধুকে দেশদ্রোহী বানিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে মুছে ফেলতে পারেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু  সেই ফাঁদে পা বাড়াননি।

  বরং তিনি ৭ মার্চের ভাষণে  তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে স্বাধীনতার ঘোষণাও দিলেন  ঠিকই সেই সাথে ৪টি দাবিও উত্থাপন  করলেন, ক. সামরিক আইন প্রত্যাহার করতে হবে খ.  সৈন্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে গ. গণহত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার করতে হবে ঘ. নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। ৭ মার্চ ভাষণের ঠিক এক সপ্তাহ পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশে অসামরিক প্রশাসন চালুর জন্য ৩৫ টি বিধি জারি করেন। তারপর দীর্ঘ ১০ দিন ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে আলোচনার নামে বাঙালি জাতির সাথে প্রহসন শুরু করেন এবং সেই সাথে গোপনে গোপনে চলে তাদের সামরিক প্রস্তুতি। বাঙালি জাতিকে শায়েস্তা করার জন্য ইয়াহিয়া খান লে. জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব বাংলার নতুন গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত করেন। এই সময়ে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী পূর্ব বাংলায় হত্যাযজ্ঞ চালানোর জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেছিল। প্রস্তুতি সম্পূর্ণ হলে ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ রাতে চোরের মত গোপনে ঢাকা ত্যাগ করে পাকিস্তানে চলে যান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। শুরু হয় ২৫ শে মার্চ মধ্যরাতে অপারেশন সার্চলাইট।  সেই সাথে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ইয়াহিয়া বেতারে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন যে, আওয়ামী লীগ একটি নিষিদ্ধ  রাজনৈতিক সংগঠন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্বাসঘাতক ও দেশদ্রোহী।  অপারেশন সার্চলাইর্টে নামে ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে এবং লে. জেনারেল টিক্কা খানের নেতৃত্বে পূর্ব বাংলায় চলে নির্মম হত্যাযজ্ঞ। বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি এবং বাঙালি জাতিসত্ত্বাকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্য সব রকমের অপচেষ্টা সেই সময় পাকিস্তানি হায়েনারা করেছিল। কিন্তু তারা কোনভাবে বাঙালি জাতিকে শেষ পর্যন্ত দমিয়ে রাখতে পারেনি। শেষপর্যন্ত বিজয়ের হাসি বাঙালিরাই হেসেছে। শুভ শক্তির কাছে অশুভ শক্তির যে  সবসময়ই পরাজিত হয় বাঙালি জাতিই হচ্ছে তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ।

১৯৪৭ সালে ১৪ আগস্ট  পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পর পাকিস্তানের রাজধানী করাচিতে স্থাপন করা হলে করাচীর উন্নয়নের জন্য ২০০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয় অথচ পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাজধানী ঢাকার উন্নয়নের জন্য ব্যয় ধরা হয় মাত্র ২ কোটি টাকা। কেন্দ্রিয় সরকারের সকল কার্যালয় , দেশরক্ষা সদরদপ্তর, শিক্ষায়তন, স্টেট ব্যাংক,  শিল্পোন্নয়ন কর্পোরেশন, আন্তর্জাতিক বিমান, ন্যাশনাল ব্যাংক, বীমা, কর্পোরেশনসহ, বৈদেশিক দূতাবাস, আন্তর্জাতিক সংস্থাসহ সকল গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা প্রতিষ্ঠানাদিগুলো গড়ে ওঠেছিল পশ্চিম পাকিস্তানকে কেন্দ্র করে। এছাড়াও গবেষণা, কৃষির উন্নয়ন, চিকিৎসা, বিজ্ঞান ও শিল্পের  উন্নয়নের জন্য যে ১৬ টি গবেষণা প্রতিষ্ঠান করা হয়েছিল তার মধ্যে ছিল ১৩ টি- ই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশ থেকে যেসব বৈদেশিক সাহায্য সহযোগিতা আসত তার ৯৮ শতাংশ বরাদ্দ হত পশ্চিম পাকিস্তানে আর মাত্র ২ শতাংশ ব্যবহার হত পূর্ব বাংলায়। তারা আমাদেরকে শাসন করেছে, শোষণ করেছে এবং বৈষম্যের সর্বোচ্চ প্রয়োগ তারা বাঙালিদের উপর করেছে। তারা আমাদেরকে অর্থনৈতিকভাবেও পঙ্গু করে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু তারপরেও স্বাধীনতার ৪৭ বছর পেরিয়ে বাংলাদেশ এখন এলডিসি ( স্বল্প উন্নত দেশের) তালিকা থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক অনেক সূচকেই আমরা  এখন পাকিস্তানের থেকে অনেক এগিয়ে আছি।  
লেখক ঃ সংগঠক-প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৭৫০-৫৩৪০২৮