সুদিন ফিরবে পাটে

সুদিন ফিরবে পাটে

আব্দুল হাই রঞ্জু : এক সময় দেশে কৃষকের চাষাবাদের অন্যতম পণ্যই ছিল পাট। আর সোনালী আঁশখ্যাত পাটই ছিল রফতানি আয়ের বড় খাত। একমাত্র পাট রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনই ছিল রাষ্ট্রের একমাত্র অবলম্বন। পাটকে ঘিরে দেশের নদী তীরে গড়ে উঠেছিল নৌবন্দর। সেসব বন্দর দিয়ে বড় বড় জাহাজে পাট রফতানি হওয়ায় নৌবন্দরগুলোকে ঘিরে গড়ে ওঠেছিল ছোট বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে ব্রিটিশ আমল এবং তৎপরবর্তী তদানিন্তন পাকিস্তান আমলে মাড়োয়ারি খ্যাত বড় বড় পাট ব্যবসায়ীরা পাটকে ঘিরে গড়ে তুলেছিল বিরাট বিরাট পাটের গুদাম। আজ কিন্তু সে সব শুধুই স্মৃতি। কালের বিবর্তনে ও ক্ষমতাসীনদের ভ্রান্তনীতির কারণে পাট হারিয়েছে তার অতিত ঐতিহ্য। এমনকি কৃষিপণ্য বলতে এক সময় যে পাটই ছিল অন্যতম, সে পাট হারিয়েছিল তার কৃষিপণ্যের স্বত্বা। মহাজোট সরকারের ক্ষমতার দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাটকে কৃষিপণ্যের স্বীকৃতি দিয়ে পাটের অতিত ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেন। মহাজোট সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদের পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর্জা আযমের পাটের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে নানা পদক্ষেপ আমরা দেখেছি। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই ভবনে এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন- পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী মীর্জা আযম। সে সভায় আমার উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। সে দিন সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর্জা আযম ‘মোড়কে পাটজাত পণ্যের শতভাগ ব্যবহারকে নিশ্চিত করতে ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানান। ওই মত বিনিময় সভায় সেদিন আমি বলেছিলাম, মোড়কে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে সরকারকে আগে বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত নিয়ে পিপি ব্যাগ কারখানা বন্ধ করতে হবে। ক্রেতার ধর্মই হচ্ছে, তুলনামূলক যে পণ্যের মূল্য কম, ক্রেতারা সে পণ্যই কিনবেন। যেমন দীর্ঘদিন পাটের বস্তার ব্যবহার না থাকায় পিপি ব্যাগের ব্যবহার শতভাগ নিশ্চিত হয়েছে। ইতিমধ্যেই দেশে ব্যাংকের বিনিয়োগে নানা উদ্যোক্তা ঋণ নিয়ে পিপি ব্যাগের কারখানা স্থাপন করেছেন। যেখানে ৫০ কেজি ওজনের পণ্য ধারণ ক্ষমতার একটি পিপি ব্যাগের মুল্য সর্বোচ্চ ১৫ থেকে ২০ টাকা, সেখানে এই পরিমাণ পণ্য ধারণ ক্ষমতার একটি পাটের বস্তার সর্বনি¤œ মূল্য ৫০ টাকা। স্বভাবতই সবাই পিপি ব্যাগ কিনে পণ্য বাজারজাত করবেন-এটাই স্বাভাবিক। এমতাবস্থায় আগে পিপি ব্যাগের কারখানা বন্ধ করা উচিৎ। তা না করে শুধু আলোচনা করলেই মোড়কে পাটজাত পণ্যের শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। হয়েছেও তাই। পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ক্রমে চাল, গম, আটা, চিনিসহ ১৮টি নিত্যপণ্যের পাটজাত মোড়ক ব্যবহারে বাধ্যতামূলক আদেশ জারি করেন। কিন্তু আজও তা শতভাগ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। কারণ এখন পর্যন্ত পিপি ব্যাগ প্রস্তুতকারী কারখানা সরকার বন্ধ করেনি। ফলে পিপি ব্যাগের উৎপাদনও হচ্ছে, তা সহজলভ্য ও দাম কম হওয়ায় সহজে সবাই ব্যবহারও করছে। উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে ধান, চাল বাজারজাতকরণে সরকার পাটের বস্তা ব্যবহারে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করে। চালকল থেকে শুরু করে পাইকারী বাজারে সরকারের ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালনা করে জরিমানা করায় ব্যবসায়ীরা পাটের বস্তা ব্যবহার শুরু করে। এরই মধ্যে ২০১৭ সালে হাওর অঞ্চল খ্যাত ৪টি জেলার অতিবর্ষণ ও আগাম বন্যার কারণে আঁধাপাকা ধান পানিতে তলিয়ে যায়। মুহূর্তেই চালের বাজার হু হু করে বাড়তে থাকে। চালকল মালিক ও চাল ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের ঢাকায় ডাকা হয়। খাদ্যমন্ত্রী, কৃষিমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সচিবালয়ের ওই বৈঠকে চালের দাম কমিয়ে আনতে ব্যবসায়ীদেরকে সবাই অনুরোধ করেন। সেদিন ব্যবসায়ীরা বলেছিলেন, শুধু পাটের ব্যাগ বাড়তি মূল্যে কেনার কারণে চালের বাজার কেজিতে ২/১ টাকা বৃদ্ধি পায়। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ তাৎক্ষণিকভাবে ঘোষণা দেন, চালের বাজার স্থিতিশীল রাখার স্বার্থে এই মুহূর্ত থেকে পিপি ব্যাগে চাল ভর্তি করে বাজারজাত করা যাবে। যেমনি ঘোষণা তেমনি কাজ। শুরু হলো পিপি ব্যাগের দেদার ব্যবহার। সরকারের পাটকলগুলোয় প্রস্তুতকৃত লাখ লাখ বস্তা অবিক্রিতই থেকে গেল। সেই যে পিপি ব্যাগের ব্যবহার শুরু হলো, যা আজ পর্যন্ত অব্যাহতভাবেই নির্বিঘেœই ব্যবহৃত হচ্ছে। এরই মধ্যে মহাজোট সরকার টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে গঠিত মন্ত্রিসভার পাট ও বস্ত্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পেলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা পাটের রাজধানী নারায়ণগঞ্জের সন্তান সফল ব্যবসায়ী গোলাম দস্তগীর গাজী। ঐতিহ্যগতভাবে পাটের রাজধানী নারায়ণগঞ্জের গুরুত্ব অনেক বেশি। হয়তো পাটের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে নতুন মন্ত্রীর প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা থাকবে। এরই মধ্যে তিনি জাতীয় এক দৈনিকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, পাটের উৎপাদন ও বহুমুখী ব্যবহারকে উৎসাহিত করতে কিছু উদ্যোগ নিয়েছি। কাঁচাপাট ও বহুমুখী পাটজাত পণ্যের উৎপাদন বাড়ানো, পাটজাত পণ্য রফতানি ও অভ্যন্তরীণ ব্যবহার বাড়াতে এবং পরিবেশ রক্ষায় পলিথিন বর্জনের জন্য পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাটপণ্যকে বিশ্বের বুকে তুলে ধরা এবং পরিচিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। তার নির্দেশে জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টারে ২৩৫ ধরনের পাটপণ্যের প্রদর্শনী ও বিক্রয় কেন্দ্র চালু হয়েছে। পাটপণ্যের উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহার বাড়াতে চারকোল, সিস কস, পাট পাতার পানীয়সহ নতুন নতুন বহুমুখী পণ্য উৎপাদনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এমনকি পাট থেকে সোনালী ব্যাগ বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের ব্রান্ডিং হিসেবে কাজ করবে মর্মেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি আরো বলেন, পাটকাঠি থেকে চারকোল উৎপাদন সম্ভাবনার নতুন দুয়ার উন্মোচন করেছে। বাংলাদেশ চারকোল ম্যানুফাকচারাস অ্যান্ড এক্সপোর্টাস অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে আলোচনা করেছি, কিভাবে চারকোলের উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানো যায়। তিনি বলেন, দেশে প্রতিবছর প্রায় ৩০ লাখ টন পাটকাঠি উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে যদি ৫০ ভাগ পাটকাঠি দিয়ে চারকোল উৎপাদন করা যায়, তাহলে প্রতিবছর ২ লাখ ৫০ হাজার টন চারকোল উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এতে কর্মসংস্থানের দ্বারও সম্প্রসারিত হবে। বর্তমানে চীনে চারকোল রফতানি হচ্ছে। আগামীতে জাপান, ব্রাজিল, তুর্কমিনিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, কানাডা ও মেক্সিকোতে চারকোল রফতানি করার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। বাস্তবেই পাট একটি সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্য। ইতিমধ্যেই বিজ্ঞানীরা পাট থেকে উন্নতমানের মিহি সুতা আবিষ্কার করেছেন। যা দিয়ে উন্নত কাপড় প্রস্তুত করা সম্ভব। আর বাংলাদেশের পোশাক খাত এখন অনেক বেশি সমৃদ্ধ। যদি পাটের উন্নত সুতার কাপড় বিদেশে রফতানি করা যায়, তাহলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে পাট তার ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে।
শংকার জায়গাটি হচ্ছে, আমাদের দেশে পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে টেকসই স্থিতিশীলতার বড়ই অভাব। আমাদের দেশে যখন কোন বিষয়ে কর্তাব্যক্তিদের নজর কাড়ে, এখন তা নিয়ে হইচই নয়। নানা ভাবে উদ্যোগও নেয়া হয়, কিন্তু এমন এক সময় আসে, যখন আর ওই উদ্যোগের কোন গুরুত্ব থাকে না। পাটের ক্ষেত্রেও তাই  হয়েছে। পাট উৎপাদন বাড়াতে হলে পাট চাষীদের পাটের ন্যায্যমুল্য নিশ্চিত করতে হবে। আর পাটের ন্যায্যমুল্য নিশ্চিত করতে হলে সরকারিভাবে পাট কিনতে হবে। আবার পাট কিনলেই হবে না, পাটকলগুলোকেও চালু রাখতে হবে। এতে কর্মসংস্থান যেমন নিশ্চিত হবে, তেমনি কর্মরত শ্রমিক কর্মচারিদের জীবনমানও ভাল চলবে। কিন্তু কোন কারণে এর ব্যত্যয় ঘটলে মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। এমনটি ঘটেছে গত পাট মৌসুমে। গত বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের কথা। সে সময় জাতীয় এক দৈনিকে ‘কাঁচাপাটের অভাবে সরকারি পাটকলগুলো বন্ধের আশংকা’ শিরোনামে একটি খবর প্রকাশিত হয়। উক্ত খবরে জানা যায়, কাঁচাপাটের অভাবে সরকারি পাটকলগুলো বন্ধের আশংকা রয়েছে। এমন আশংকার কথা জানিয়ে বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশনের (বিজেএমসি) চেয়ারম্যান ড. মোঃ মাহামুদুল হাসান অর্থ বরাদ্দ চেয়ে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। সে সময় সাবেক প্রবীণ অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, বিজেএমসি দুর্নীতিগ্রস্ত একটি লোকসানি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দেওয়া উচিত। হতেই পারে বিজেএমসিতে দুর্নীতি হয়। সে জন্য দুর্নীতিবাজদের না ধরে উল্টো এ অজুহাতে বিজেএমসির মত একটি প্রতিষ্ঠানকে বিলুপ্ত করবেন, সেটা কি ভাবে সম্ভব? মাথা ব্যথা হলে ব্যথা নিরাময়ে ওষুধ সেবন না করে কি কেউ মাথা কেটে ফেলে? অর্থাৎ দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা বন্ধ করতে হবে। হয়ত সাবেক অর্থমন্ত্রীর এ ধরনের মনোভাবের কারণে বিজেএমসিকে যথাসময়ে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়নি। এবারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন অর্থমন্ত্রীও নতুন, পাট ও বস্ত্রমন্ত্রীও নতুন। আমরা আশা করব, অর্থমন্ত্রণালয়, পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় এবং বিজেএমসির মধ্যে যেন সমন্বয়হীনতা না থাকে। উল্টো পারস্পারিক সহমতের ভিত্তিতে পাট চাষী ও পাটকলগুলোকে রক্ষায় যথাসময়ে প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড় করে এ খাতকে গতিশীল করতে হবে। এমনকি পাটচাষী, ব্যবসায়ী, শ্রমিক সবাইকে হতাশা দুর করে পাট ও পাটজাত পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের যথাযথ বাজারজাত করণের ব্যবস্থা নিশ্চিত কল্পে সরকারকে আরো উদ্যোগী হতে হবে। তা হলে হয়ত পাটের সুদিন ফিরে আসবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৯২২-৬৯৮৮২৮