সিলেটে অটোরিকশা ছিনতাইয়ে ‘ভয়ঙ্কর’ কিশোর গ্যাং

সিলেটে অটোরিকশা ছিনতাইয়ে ‘ভয়ঙ্কর’ কিশোর গ্যাং

যাত্রীবেশে গাড়িতে ওঠা, সুযোগ বুঝে চালককে ধরাশায়ী করে হত্যা, এরপর অটোরিকশা নিয়ে চম্পট। ঘটনাগুলো অনেকটা সিনেমাটিক মনে হলেও সিলেটে ঘটছে বাস্তবে। আর ভয়ঙ্কর এ অপরাধে জড়াচ্ছে কিশোররা।
 

উঠতি বয়সী একাধিক ‘কিশোর গ্যাং’ সিএনজিচালিত অটোরিকশা ছিনতাইয়ে জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি)।গত বৃহস্পতিবার (০৯ মে) দিনগত গভীর রাতে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে চালককে হত্যার চেষ্টার সময় অপরাধী চক্রের পাঁচজনকে হাতেনাতে আটক করা হয়।
 
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আটকদের কাছ থেকে বেরিয়ে আসে ভয়ঙ্কর তথ্য। আটকদের একজন দশম শ্রেণির ছাত্র। অন্যরা দিনের বেলায় বিভিন্ন কাজে যুক্ত। সবার বয়স ১৭ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। দিনের আলো ফুরালেই অটোরিকশা ছিনতাইয়ের মতো ভয়ঙ্কর অপরাধে জড়ায় তারা।   
 
পুলিশ বলছে, উঠতি বয়সী কিশোর অপরাধী গ্যাং। একই স্থানে তাদের বসবাস। অধিক টাকার লোভে এরা চালকদের অজ্ঞান বা হত্যা করে ছিনতাই করে থাকে।  
 
সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া) জেদান আল মুছা বলেন, সিলেটে এ ধরনের গ্যাং আরো রয়েছে। পুলিশ এই গ্যাংগুলোর সন্ধানে রয়েছে। ঈদ সামনে রেখে টাকার লোভে সক্রিয় হয়ে উঠেছে কিশোর অপরাধীরা।
 
বৃহস্পতিবার রাত দেড়টার দিকে সিলেট ঢাকা মহাসড়কের অতিরবাড়ি থেকে আটক পাঁচ কিশোরের বিষয়ে তিনি বলেন, ওরা অটোরিকশাটি ছিনতাইয়ের উদ্দেশে চালকের মুখে গামছাগুজে হাত পা বেঁধে হত্যার চেষ্টা করছিল। এমন সময় টহল পুলিশ তাদের হাতেনাতে আটক করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, এ ধরনের আরো কয়েকটি ঘটনা তারা ঘটিয়েছে। তাদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
 
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে এসএমপির দক্ষিণ সুরমা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রিপন দাস বলেন, আটক কিশোররা নগরীর রিকাবিবাজার স্টেডিয়াম এলাকা থেকে লালাবাজার যাওয়ার কথা বলে চালক ইরা মিয়ার অটোরিকশা ১৮০ টাকায় ভাড়া নেয়। পথে অতিরবাড়ি এলাকায় চালককে গাড়ি থামাতে বলে। সরল বিশ্বাসে চালক গাড়ি থামালে পেছন থেকে দু’জন চালকের দু’হাত ধরে রাখে। আরো দুজন দু’পাশে ধরে একজন চালকের মুখে গামছাগুজে দেয়।
 
তিনি বলেন, টহল পুলিশ অটোরিকশাটি রাস্তার পাশে দাঁড়ানো দেখে কাছে গিয়ে দু’জনকে ঝাপটে ধরে। তিনজন পালিয়ে গেলে এলাকার লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে তাদের আটক করা হয়। এসময় চালককে হাত-পা বাঁধা ও মুখে গামছাগুজে দেওয়া অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।  
 
আটকরা হলো- সদর উপজেলার ধুপাগুল উমদার পাড়ার আবুল হোসেনের ছেলে নগরীর ঘাসিটুলা চাঁন মিয়ার বাড়ির ভাড়াটিয়া মো. জাকারিয়া, ঘাসিটুলা নুর মিয়ার কলোনীর ভাড়াটিয়া ও সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের রতনশ্রী গ্রামের সুহেল আহমদের ছেলে তুষার আহমদ, একই উপজেলার কাউয়াকান্দি গ্রামের ফজলুল হকের ছেলে নগরীর শেখঘাট কলাপাড়ার শওকত মিয়ার বাসার ভাড়াটিয়া ছুফায়েল আহমদ, চাঁদপুর সদর উপজেলার ভিঙ্গুলিয়া গ্রামের মঈন উদ্দিনের ছেলে ঘাসিটুলা দুর্বার ৬৯/১ বাসার বাসিন্দা সাগর আহমদ, ঘাসিটুলা দুর্বার ৬২ নং বাসার বাসিন্দা ও হবিগঞ্জ জেলার লাখাই উপজেলার বামুই গ্রামের লায়েছ মিয়ার ছেলে খোকন আহমদ আব্দুল্লাহ।
 
এসআই রিপন দাস আরো বলেন, আটকরা নগরীর একই এলাকায় বসবাস করে। এরমধ্যে জাকারিয়া দশম শ্রেণিতে পড়ে। অন্যরা দিনে বিভিন্ন কাজে যুক্ত থাকে, রাতে ডাকাতি করে। তারা এর আগেও এ ধরনের বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটিয়েছে। তবে কয়টি ঘটনা ঘটিয়েছে বা কাউকে হত্যা করেছে কিনা, এ বিষয়ে জানতে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড চাওয়া হবে।  
 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিলেটে চালককে হত্যা করে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে চালককে হত্যা করে অটোরিকশা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। ঘটনার একদিন পর হাওর থেকে চালকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনায় জড়িত তিনজনকে আটক করে পুলিশ।
 
একই কায়দায় ২০১৮ সালের ২৮ মে সিলেট থ-১৩-০৩২৮ অটোরিকশাটি বন্দরবাজার থেকে ভাড়া নেয় অপরাধীরা। নগরীর টিলাগড় পয়েন্ট পার হওয়ার পর চালকের পেটে ছুরি ঠেকিয়ে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের চেষ্টা করা হয়। স্থানীয় জনতার সহায়তায় চালক রক্ষা পান এবং এ ঘটনায় তিনজনকে আটক করা হয়। একইভাবে ওই বছরের ৮ এপ্রিল নগরী থেকে যাওয়ার পথে যাত্রীবেশি ছিনতাইকারীরা চালক আরমান আলীর কোমরে ছুরি ধরে ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে। ওই ঘটনায় চালক লাফিয়ে পড়ে প্রাণে রক্ষা পান, পালিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা।
 
একইভাবে ওই বছরের ৪ জুন উপশহরে চালককে অজ্ঞান করে অটোরিকশা ছিনতাই করে নেওয়ার চেষ্টার সময় জনতা অপরাধী চক্রের দুই সদস্যকে আটক করে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। ২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল সিলেট বিমানবন্দর বাইপাস এলাকায় চালকের পেটে ছুরিকাঘাত করে অটোরিকশা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা।
 
এসব অপরাধ রুখতে এরইমধ্যে সিলেট মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় সতর্কতা জারি করা হয়েছে। কিন্তু অপরাধীদের মূলোৎপাটনে সক্ষম হতে পারছে না পুলিশও।