সিরাজগঞ্জে ২০ সহস্রাধিক মৃৎশিল্পীর থমকে যাচ্ছে জীবনের চাকা

সিরাজগঞ্জে ২০ সহস্রাধিক মৃৎশিল্পীর  থমকে যাচ্ছে জীবনের চাকা

সিরাজগঞ্জ অফিস : ‘নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য চাল, ডাল, তেল, লবণ, আটা ইত্যাদির দাম বেড়েছে, আরও দাম বেড়েছে বৈদ্যুতিক সামগ্রী গৃহস্থালিসহ অন্যান্য জিনিসপত্রের। একই সাথে দাম বেড়েছে মৃৎশিল্পের অপরিহার্য কাঁচামাল এঁটেল মাটির। কিন্তু শুধু কমেছে মাটির তৈরি জিনিসপত্রের। বাপদাদার আমল থেকে যুগের পর যুগ ধরে এ পেশাতেই আছি। কাজ করছি প্রতিদিন কিন্তু নিরন্তর পরিশ্রম করেও পেটের ক্ষুধা মেটাতে পারছি না। আমাদের জীবন যাপনে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পরিবার পরিজন নিয়ে খেয়ে না খেয়ে চরম উদ্বেগ আর উৎকন্ঠায় সময় পার করছি।দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে এমন বক্তব্য শুধু শাহজাদপুর পৌর সদরের প্রাণনাথপুর পালপাড়ার হতভাগা মৃৎশিল্পীদেরই নয়, সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলাসহ বিভিন্ন উপজেলার শত শত মৃৎশিল্পীর বর্তমানে একই হাল পরিলক্ষিত হচ্ছে। বংশপরম্পরায় জেনে ও শিখে আসা ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন এ পেশা সংশ্লিষ্ট মৃৎশিল্পীদের অবস্থা বর্তমানে বড়ই করুণ।
বহুমুখী সমস্যায় জর্জরিত হয়ে বর্তমানে মৃৎশিল্পীরা পেশা বদলাতে বাধ্য হচ্ছে। আর যারা এখনো এ পেশায় সম্পৃক্ত রয়েছে তাদের খেয়ে না খেয়ে মানবেতর দিনাতিপাত করতে হচ্ছে। জানা গেছে, বিজ্ঞানভিত্তিক আধুনিক যান্ত্রিক যুগে তৈরিকৃত প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়ামসহ বিভিন্ন ধাতব পদার্থ দিয়ে তৈরি জিনিসপত্রের আগ্রাসনে দেশের ঐহিত্যবাহী প্রাচীনতম মৃৎশিল্প বর্তমানে হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। এ পেশার সাথে সম্পৃক্ত শত শত শিল্পীরা তাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে মাটির হাঁড়ি, পাতিল, স্যানেটারি   ল্যাট্রিনের চাক, পাটা, খাদা, কোলা, সড়া, ব্যাংক, ঝাঝুর ছাকনা, চারি, কাটাখোলা, ভাপাপিঠার খোলা, সাতখোলা, পাঁচখোলা, তিনখোলাসহ বিভিন্ন ধরণের তৈজসপত্র তৈরি করে বাজারে নিয়ে গিয়ে পড়ছে মহাবিপাকে। অতিকষ্টে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করেও তৈরিকৃত মাটির জিনিসপত্রের ন্যায্য দাম না পেয়ে অনেক মৃৎশিল্পীরা ইতিমধ্যে লোকসানের ভার সইতে না পেরে পেশা বদলিয়ে অন্য পেশায় যোগদান করেছে।


অপরদিকে মৃৎশিল্পীদের তৈরিকৃত মাটির তৈরি বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্রের চাহিদা দিন দিন হ্রাস পাওয়ায় তৈরিকৃত ওইসব মাটির সামগ্রী হাটবাজারে আশানুরূপ বেচাবিক্রি হচ্ছে না। ফলে দুই দিক থেকেই শাহজাদপুরসহ সিরাজগঞ্জের শত শত মৃৎশিল্পীরা যন্ত্রণার যাতাকলে পিষ্ট হয়ে এখনো পেশাটিকে টিকিয়ে রেখেছে। এভাবে চলতে থাকলে আর কিছুদিন পরে হয়তো মাটির তৈরি জিনিসপত্র পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে জাদুঘরে স্থান করে নেবে-এমন আশঙ্কা স্থানীয় মৃৎশিল্পীদের।এছাড়া মাটি ও মাটি পোড়ানোর জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের মাটির জিনিসপত্র তৈরির ব্যয় বহুলাংশে বৃদ্ধি পেলেও তাদের আয় না বাড়ায় অতিকষ্টে পরিবার পরিজন নিয়ে দিন কাটছে।
জেলার শাহজাদপুর পৌরসদরের প্রাণনাথপুর পালপাড়ার বেশ কয়েকজন মৃৎশিল্পী এ প্রতিনিধিকে বলেন, বংশপরম্পরায় জেনে ও শিখে আসা মৃৎশিল্পের কাজে নিয়োজিত পাল সম্প্রদায়ের অনেকেই লোকসানের ভার সইতে না পেরে এ পেশা ত্যাগ করে অন্য পেশায় আত্মনিয়োগ করেছে।


পেশাটি পরিশ্রমের তুলনায় লাভজনক না হওয়ায় সিরাজগগঞ্জ সদর, কামারখন্দ, শাহজাদপুরসহ জেলার উল্লাপাড়া, চৌহালী, বেলকুচি, তাড়াশ, রায়গঞ্জ, কাজিপুরের বিশ সহস্রাধিক মৃৎশিল্পীর বর্তমানে অতিকষ্টে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে।স্থানীয় মৃৎশিল্পীরা জানান, প্রতি বছর পূঁজার সময় একেকটি প্রতিমা তৈরি করে তাদের আয় হয় ৬/৭ হাজার টাকা। এক ট্রাক এঁটেল মাটি ক্রয় করতে হচ্ছে ১ হাজার টাকায়। আবহাওয়া খারাপ থাকলে ও বৃষ্টিপাত হলে তাদের কাজ বন্ধ রাখতে হয়। এছাড়া জ্বালানি ব্যয়ও অতীতের তুলনায় বহুলাংশে বৃদ্ধি পাওয়ায় তৈরিকৃত সকল মাটির পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বহুলাংশে বেড়েছে। ফলে বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসা ওই ঐহিত্যবাহী এ পেশাটি ধরে রাখতে এবং মাটির তৈজসপত্র জনপ্রিয় করতে সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা কামনা করেছেন মৃৎশিল্পীরা।