সি পার্ল বিচ রিসোর্টের প্রসপেক্টাসে ‘ভুতুড়ে’ তথ্য

সি পার্ল বিচ রিসোর্টের প্রসপেক্টাসে ‘ভুতুড়ে’ তথ্য

পুঁজিবাজার থেকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের জন্য বিভ্রান্তিকর ও ভুতুড়ে তথ্য দিয়ে প্রসপেক্টাস তৈরি করেছে সি পার্ল বিচ রিসোর্ট আন্ড স্পা লিমিটেড। আর পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠানটির আইপিও অনুমোদন দিয়ে দিয়েছে।

বিএসইসি’র কাছে জমা দেয়া সি পার্ল বিচ রিসোর্ট আন্ড স্পা’র প্রসপেক্টাসের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, শেয়ারপ্রতি আয়ের (ইপিএস) বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি এক এক স্থানে এক এক রকম তথ্য দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির হোটেল রুমের বিষয়ে রয়েছে ভুতুড়ে তথ্য। আবার দুই বছর আগে লোকসানের মধ্যে থাকলেও আইপিও আবেদনের আগেই প্রতিষ্ঠানটির মুনাফায় বড় ধরনের উলম্ফন হয়েছে।


পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইপিও’র প্রসপেক্টাসে ইপিএস এক এক পৃষ্ঠায় এক এক রকম দেখানোর সুযোগ নেই। এমনটি হলে ধরে নিতে হবে প্রতিষ্ঠানটি মনগড় আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করেছে। কোনো প্রতিষ্ঠান এমন তথ্য দিলে, সেই প্রতিষ্ঠানের আইপিও কিছুতেই অনুমোদন দেয়া উচিত নয়।

তারা বলছেন, পুঁজিবাজার থেকে অর্থ উত্তোলনের জন্য যদি প্রসপেক্টাসে মিথ্যা তথ্য দেয়া হয়, তাহলে ওই কোম্পানির সততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। পুঁজিবাজারের বিকাশে নতুন নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত হওয়া উচিত। তবে সেই কোম্পানির অবশ্যই আর্থিক স্বচ্ছতা ও ফান্ডামেন্টাল (মৌলিক) অবস্থা থাকতে হবে।

তাদের মতে, একের পর এক দুর্বল কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হচ্ছে। ফলে আইপিওতে আসার সময় কোম্পানিগুলোর মুনাফায় বড় ধরনের উলম্ফন দেখা গেলেও তালিকাভুক্ত হওয়ার পর আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এভাবে দুর্বল ও গোজামিল তথ্য দিয়ে আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করা কোম্পানিকে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দিলে তা বাজারের জন্য ক্ষতিকর।

এ বিষয়ে ডিএসইর এক সদস্য বলেন, গত পাঁচ বছরে যেসব কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে তাদের বর্তমান আর্থিক চিত্র দেখলেই বোঝা যায় অধিকাংশ কোম্পানি প্রসপেক্টাসে মিথ্যা তথ্য দিয়ে পুঁজিবাজার থেকে টাকা তুলেছে। মোটা অঙ্কের প্রিমিয়াম নিয়ে আসা কোম্পানির দাম মাত্র ৬ টাকায় নেমে যাওয়ার ঘটনাও আমরা দেখতে পারছি। এভাবে দুর্বল কোম্পানি তালিকাভুক্ত হওয়ার কারণে আজ পুঁজিবাজারের এমন দশা।

রিসোর্টের বিভিন্ন কক্ষের ইনটেরিয়র, ফিনিশিং ও আসবাবপত্র ক্রয়, জমি ক্রয় ও প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের খরচ খাতে ব্যয় করতে সম্প্রতি সি পার্ল বিচ রিসোর্ট আন্ড স্পাকে পুঁজিবাজার থেকে ১৫ কোটি টাকা উত্তোলনের অনুমোদন দিয়েছে বিএসইসি। এজন্য ১০ টাকা অভিহিত মূ্ল্যে কোম্পানিটি আইপিওতে এক কোটি ৫০ লাখ সাধারণ শেয়ার ছাড়বে।

এ লক্ষ্যে কোম্পানিটির তৈরি করা প্রসপেক্টাসের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রসপেক্টাসের ২৪১ পৃষ্ঠায় ২০১৮ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত বছরের ডাইলোটেড ইপিএস দেখানো হয়েছে ৫৬ পয়সা। একই ইপিএস ২৪৩ পৃষ্ঠায় দেখানো হয়েছে ৪৬ পয়সা। অর্থাৎ দুই স্থানের ইপিএস’র মধ্যে ১০ পয়সার ব্যবধান রয়েছে।

দু’রকম ইপিএস দেখানোর বিষয়ে কোম্পানির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মিজানুর রহমান বলেন, যেখানে ইপিএস ৪৬ পয়সা দেখানো হয়েছে, তা একটি প্রেজেন্টেশন। এটি বিএসইসির নির্দেশনা অনুযায়ী দেখানো হয়েছে। আর ফিন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্টে ইপিএস দেখানো হয়েছে অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী। যে কারণে দুই জায়গায় দু’রকম ইপিএস হয়েছে।

এদিকে প্রসপেক্টাসের ২৩১ পৃষ্ঠায় প্রতিষ্ঠানটি হোটেল রুমের সংখ্যা উল্লেখ করেছে ৮১ হাজার ২৪৯টি। এর মধ্যে ২০১৭ সালের ১ জুলাই থেকে ২০১৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে ৪৯ হাজার ৬৬০টি রুম বা ৬১ দশমিক ১২ শতাংশ ইউটিলাইজ (ব্যবহার) হয়েছে।

গ্রাহক সেজে মোবাইল ফোনে কথা বললে হোটেলটির রুম বুকিংয়ে দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তা জানান, তাদের ৪৯৩টি গেস্ট রুম আছে, এর মধ্যে ২৪১টি ভাড়া দেয়া হয়। মানভেদে এক একটি রুমের ভাড়া ১২ হাজার থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত।

প্রসপেক্টাসে ৮১ হাজার ২৪৯টি রুম উল্লেখ করার কারণ জানতে চাইলে সিএফও মিজানুর রহমান বলেন, এটা রাউন্ড দ্য ইয়ারে কত রুম ব্যবহার হয়েছে তা দেখানো হয়েছে। ২৪১ এর সঙ্গে ৩৬৫ দিয়ে গুণ দিলেই দেখবেন এ সংখ্যা আসছে। হোটেল অপারেশনের ক্ষেত্রে এভাবেই রুম দেখানোর নিয়ম।

তবে সিএফও এমন তথ্য দিলেও ৩৬৫ এর সঙ্গে ২৪১ গুণ করলে আসে ৮৭ হাজার ৯৬৫টি। সে হিসাবে প্রসপেক্টাসের তথ্য এবং কোম্পানিটির সিএফও’র তথ্যের মধ্যে ৬ হাজার ৭১৬টি রুমের পার্থক্য রয়েছে।

তথ্য পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, শ্রমিকদেরও ঠকিয়েছে কোম্পানিটি। একই সঙ্গে শ্রম আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়েছে। কোম্পানিটি ২০০৬ সালের বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী, ২০১৭ সাল পর্যন্ত নিট আয়ের ৫ শতাংশ হারে ফান্ড গঠন ও বিতরণ- কোনোটাই করেনি। ফলে শ্রমিকরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তবে আইপিও আবেদনের আগে ২০১৮ সালে ফান্ড গঠন করেছে।

আইপিওতে আসার আগে কোম্পানিটির মুনাফায়ও বড় ধরনের উত্থান হয়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৬০ লাখ ৬১ হাজার টাকা লোকসান করলেও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা মুনাফা হয়েছে বলে প্রসপেক্টাসে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মুনাফা আরও বেড়ে হয়েছে ১৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেকোনো কোম্পানির মুনাফায় একটি ধারাবাহিকতা থাকে। হঠাৎ করে লোকসান আবার হঠাৎ করে বড় মুনাফা হওয়ার ঘটনা সাধারণত ঘটে না। তবে লোকসান থেকে মুনাফায় ফেরা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু লোকসান থেকে হঠাৎ করেই বড় ধরনের মুনাফা হলে তা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হতে পারে। বিষয়টি নিয়ন্ত্রক সংস্থার খতিয়ে দেখা উচিত।

এদিকে ২০১৭ সালে কোম্পানিটির ৩২০ কোটি ২৮ লাখ টাকা দীর্ঘমেয়াদের ঋণ থাকলেও ২০১৮ সালে তা মাত্র দুই কোটি ২৩ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। এ ঋণ কমাতে কোম্পানিটি ৩৪৭ কোটি ২১ লাখ টাকার বন্ড ছেড়েছে। বন্ড ছেড়ে সংগ্রহ করা অর্থও একটি দীর্ঘমেয়াদের ঋণ। অর্থাৎ বন্ড ছেড়ে কোম্পানিটি দীর্ঘমেয়াদের ঋণ কমিয়ে দেখিয়েছে।

বন্ড ছেড়ে দীর্ঘমেয়াদের ঋণ কমানো হলেও বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারহোল্ডার ইক্যুইটির প্রায় চার গুণ বিভিন্ন মেয়াদের ঋণ রয়েছে। ১০৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকার ইক্যুইটির বিপরীতে কোম্পানিটির ঋণের পরিমাণ ৩৬২ কোটি ৭ লাখ টাকা।

এমন বিপুল পরিমাণ ঋণকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বিপুল অঙ্কের এ ঋণের বিপরীতে সুদ দিতে গিয়ে কোম্পানিটির মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা আছে।

ঋণের বিষয়ে সিএফও মিজানুর রহমান বলেন, আমরা লোন কমায়নি। তবে আমরা এখন লোনে নয়, বন্ডে চলে গেছি। বন্ডটিও দীর্ঘমেয়াদের লোন, এটা ঠিক আছে। আগে আমাদের লোনগুলো অনেকগুলো ব্যাংকে ছিল। এখন বন্ড ছেড়ে তা একস্থানে নিয়ে আসা হয়েছে।

যোগাযোগ ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, একই ইপিএস পৃষ্ঠাভেদে ভিন্ন হওয়ার সুযোগ নাই। কোনো কোম্পানি ভিন্ন ভিন্ন ইপিএস দেখালে সেখানে সমস্যা থাকতে পারে। আর বন্ড ছেড়ে অর্থসংগ্রহ করা খারাপ নয়। তবে বন্ডও একটি দীর্ঘমেয়াদের ঋণ, তাই কী উদ্দেশ্যে বন্ড ছাড়া হচ্ছে তা খতিয়ে দেখা উচিত।

ইক্যুইটি ও ঋণের চিত্র তুলে ধরা হলে তিনি বলেন, ১০৪ কোটি টাকা ইক্যুইটির বিপরীতে ৩৬২ কোটি টাকা ঋণ হলে, সেটা বেশিই মনে হচ্ছে। ব্যবসার স্বার্থে ঋণ নেয়া যেতে পারে। তবে ঋণ যত কম থাকে ততোই ভালো। ঋণের পরিমাণ বেশি হলে কোম্পানিকে মোটা অঙ্কের সুদ টানতে হবে।