সামাজিক নিরাপত্তায় খাদ্য মজুদের গুরুত্ব

সামাজিক নিরাপত্তায় খাদ্য মজুদের গুরুত্ব

আব্দুল হাই রঞ্জু :মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে খাদ্য অন্যতম। খাদ্য ব্যতিত মানুষ বেঁচে থাকতে পারে না। বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তায় এ দেশের কৃষকের নিরন্তর প্রচেষ্টা চলছেই। যাদের প্রচেষ্টায় এ দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা অনেকাংশেই নিশ্চিত হলেও এখনও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে বছরের কয়েক মাস যখন কৃষি শ্রমিকের কাজ থাকে না, তখন তাদেরকে মারাত্মক খাদ্য সংকটে পড়তে হয়। মূলত সরকার কর্মহীন জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা পূরণে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় ভিজিএফ, ভিজিডি কার্ডের বিনিময়ে খাদ্যের মতো কর্মসূচি পরিচালনা করে থাকে। পাশাপাশি স্বল্প আয়ের মানুষদের জন্য খোলাবাজারে চাল, আটা বিক্রি করে বাজার নিয়ন্ত্রণও করে। এমনকি বর্তমান সরকার নির্বাচনী ওয়াদা ১০ টাকা  কেজিতে চাল খাওয়ানোর জন্য ১০ টাকা কেজিতে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি চালু করলেও বর্তমানে সরকারি খাদ্য মজুদ সংকটের কারণে তাও বন্ধ রাখা হয়েছে। বিশেষ করে মজুদ সংকটের কারণে দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকলেও ভিজিএফ কর্মসূচি এখনও বন্ধ আছে। খাদ্য পরিকল্পনা পরিধারন কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত গৃহিত হয় যে, সন্তোষজনক সরকারি মজুদ গড়ে তোলার আগে ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং বা ভিজিএফ কর্মসূচি চালু করা হবে না।

 সূত্র মতে, গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে অর্থমন্ত্রীর স্বাক্ষরিত এক পত্রে খাদ্য মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয় এই মর্মে, যেখানে দেশের মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে এবং খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জিত হয়েছে, সেখানে ভিজিএফ কর্মসূচির মতো প্রকল্প আর গ্রহণ করার প্রয়োজন নেই। তবে স্বল্প আয়ের মানুষদের মধ্যে কম মূল্যের খাদ্যশস্য বিতরণের ওপর তিনি জোর দেন। বাস্তবতা হচ্ছে, সরকারি খাদ্য মজুদ এখন তলানিতে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে সরকারের ইচ্ছা থাকার পরও খোলাবাজারে চাল, আটা বিক্রি বন্ধ রাখতে হয়েছে। এটাই স্বাভাবিক! যখন সরকারি খাদ্য মজুদ আশংকাজনক ভাবে কমে আসে, তখন সাধারণ ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় সরকার ওএমএস কর্মসূচিও চালু রাখতে পারছে না। যেখানে ওএমএস কর্মসূচি চালু রাখা হলে স্বল্প আয়ের সাধারণ মানুষ উপকৃত হয়, সেখানে স্বতসিদ্ধ বাস্তব সত্যটি জেনেও একমাত্র খাদ্য মজুদ সংকটের কারণে সরকারের পক্ষে এ কর্মসূচি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না অর্থাৎ যে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকারের আপদকালীন কাংখিত পরিমাণ খাদ্য মজুদ গড়ে তোলা জরুরি।

জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য বিভাগের মতে, যে কোন রাষ্ট্রের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অন্তত ৬০ দিনের খাদ্য মজুদ রাখা বাঞ্ছনীয়। আমাদের ১৬ কোটি মানুষের জন্য একদিনের খাদ্য চাহিদা প্রায় সাড়ে ৪৫ হাজার টন। এই হিসেবে, আমাদের ৬০ দিনের খাদ্য মজুদ রাখা প্রয়োজন হয়, প্রায় সাড়ে ২৭ লক্ষ মেঃ টন। কিন্তু কোন সময়েই আমাদের দেশে ৬০ দিনের খাদ্য মজুদ সরকারি ভাবে মজুদ ছিল না। এমনকি ৬০ দিনতো নয়ই, ৩০ দিনের খাদ্য মজুদও ছিল না। ফলে প্রাকৃতিক কোন দুর্যোগ হলে আমাদের দেশের মানুষের খাদ্যের কষ্টের শেষ থাকে না। গত বছর অসময়ে বেশি বৃষ্টিপাত ও উজানের পানির ঢলে হাওরের ক’টি জেলার আধাপাকা ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়া এবং গোটা দেশে অতিবৃষ্টির কারণে ‘নেকপ্লাট’ রোগে পাকা ধান চিটা হওয়ায় ফলন বিপর্যয় ঘটে। সে সময় সরকারের খাদ্য মজুদের পরিমাণ ছিল মাত্র ৮ লাখ টনের মতো। যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট ছিল না। এরই মধ্যে সরকার খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির আওতায় আকস্মিকভাবে ১০ টাকা কেজিতে প্রায় ৫/৬ লক্ষ মেঃ টন চাল বিতরণ করায় সরকারিভাবে খাদ্য মজুদের পরিমাণ আশংকাজনকভাবে কমে আসে।

 সরকারের ধারণা ছিল, বোরো এবং আমন ২ মৌসুমে অন্তত ১০/১২ লাখ টন চাল অভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহ করে আপদকালিন মজুদ গড়ে তুলবে। কিন্তু ধানের বাজার উর্দ্ধমুখী হওয়ায় সরকার শেষ পর্যন্ত বোরো মৌসুমে লক্ষমাত্রার ১০ লাখ টন চাল অভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহ করতে পারেনি। এরই মধ্যে সরকার কয়েক দফায় চাল আমদানির ওপর বাড়তি শুল্ক কমিয়ে এনে সরকারি বেসরকারিভাবে চাল আমদানির উদ্যোগ নিলেও তা সফলতার মুখ দেখেনি। উল্টো সাধারণ ভোক্তাদের ৪৫/৫০ টাকা কেজিতে চাল কিনে খেতে হয়েছে। সে অবস্থা এখন চলমান আছে। সরকার চলতি আমন মৌসুমে ৩ লাখ টন চাল অভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে ৩৯ টাকা কেজিতে এখন চাল সংগ্রহ অব্যাহত রেখেছে। হয়তো আমন মৌসুমে সরকারের লক্ষ্যমাত্রার চাল  সংগৃহিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যেহেতু এখনও বিদেশ থেকে চাল আমদানি অব্যাহত রয়েছে, আশা করা যায়, এ ধারা অব্যাহত থাকলে এবং চলতি বোরো মৌসুমে ধানের ফলন ভাল হলে, সরকারিভাবে ন্যুনতম ১০/১২ লাখ টন চাল অভ্যন্তরীণভাবে সংগৃহিত করা হলে, সরকারিভাবে কাংখিত পরিমাণ ধান ও চালের মজুদ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

মূলত ভোক্তার স্বার্থেই যে কোন পণ্য আমদানি কিম্বা রফতানি করা হয়ে থাকে। বাড়তি উৎপাদন হলে পণ্য রফতানি হয়, আর উৎপাদন কমে আসলে ভোক্তার স্বার্থে আমদানি করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রেই সরকার বাস্তব এ অবস্থাকে বিবেচনায় না নিয়ে রফতানি কিম্বা আমদানির পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ফলে কখনও উৎপাদকের স্বার্থ ক্ষুন্ন হয়, আবার কখনও কখনও ভোক্তার কষ্ট বাড়ে। বিশেষ করে ভোক্তার কষ্ট লাঘবে এবারের বোরো মৌসুমকে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। যেন সার, বীজ, তেল, বিদ্যুতের কোন সংকট না হয়। তাহলে বোরো চাষাবাদ সফল হবে এবং কাংখিত পরিমাণ উৎপাদন হলে এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে চাল সংগ্রহকে সফল করতে হবে।

ইতিমধ্যেই গমের চাষাবাদ শুরু হয়েছে। আশা করা যায়, আগামী ২ মাসের মধ্যে গমের কাটা মাড়াই শুরু হবে। সরকার আসন্ন মৌসুমে যদি ন্যুনতম পক্ষে ৫ লক্ষ মেঃ টন গম অভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহ করে, তাহলে একদিকে গমচাষীদের উৎপাদিত গমের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে সরকারিভাবে গমের মজুদও গড়ে ওঠবে। দেখা যায়, বাড়তি উৎপাদন হলে সরকার নামমাত্র পরিমাণ গম অভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহ করে, ফলে গম সংগ্রহ তালিকা নির্ভর হয়ে পড়ে। সংগত কারণেই প্রকৃত চাষীদের বদলে মধ্যসত্বভোগীদের আধিপত্যই প্রতিষ্ঠিত হয়। আর বাজার চড়া থাকলে সরকার ইচ্ছা করলেও অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ আলোর মুখ দেখে না। অনেক সময়ই সময়োপযোগী উপযুক্ত সিদ্ধান্তের অভাবে ভোক্তার স্বার্থ কিংবা উৎপাদকের স্বার্থ ক্ষুন্ন হয়ে থাকে অর্থাৎ অভ্যন্তরীণভাবে খাদ্যশস্য সংগ্রহ এবং খাদ্য মজুদের ওপর শুধু উৎপাদক ও ভোক্তার স্বার্থই নয়, দেশের স্বল্প আয়, হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

খোদ খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, দেশে কার্ডধারী প্রায় ১ কোটি পরিবার ভিজিএফের সুবিধাভোগী। এই ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব ও নানা সময় দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে বিনামূল্যে বা ২০ টাকা কেজি দরে চাল দেয়া হতো। কিন্তু সরকারের দরিদ্র বান্ধব কর্মসূচি ভিজিএফ বন্ধের ফলে হতদরিদ্র, চা বাগানের শ্রমিক, আশ্রায়ন প্রকল্পের পুনর্বাসিত পরিবার, ধর্মীয় উৎসবসহ গোটা দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে খাদ্য সহায়তা বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি ভিটেহীন মানুষ, নারী শ্রমিক, ভিক্ষাবৃত্তির ওপর নির্ভরশীল, স্বামী পরিত্যক্তা, অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা, অক্ষম ও প্রতিবন্ধী পরিবারও সুবিধা বঞ্চিত হয়ে পড়েন। বাস্তব এ অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়ে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এই কর্মসূচি চালু করতে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ইতিমধ্যেই চিঠি দিয়েছে। সম্প্রতি খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারন কমিটির বৈঠকে খাদ্য মজুদ সংকটের বিষয়টি আলোচনায় ওঠে আসে। আলোচনায় দরিদ্র বান্ধব এই কর্মসূচি চালুর বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। যা বাস্তবায়নের জন্য সন্তোষজনক খাদ্য মজুদ গড়ে তোলার ওপর জোর দেয়া হয়। আমরাও মনে করি, দরিদ্র বান্ধব এই কর্মসূচির আওতায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্য সহায়তা চালু করা প্রয়োজন।

মোদ্দা কথা, বোরো মৌসুমের চাষাবাদ পুরোদমে শুরু হয়েছে। যদি প্রাকৃতিক বড় ধরনের কোন দুর্যোগ না হয়, তাহলে ধানের কাংখিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে, এতে কোন সন্দেহ নেই। খাদ্য মন্ত্রণালয় যদি আগামী বোরো মৌসুমে অভ্যন্তরীণভাবে ন্যুনতম ১০/১২ লাখ টন চাল সংগ্রহ করতে পারে, তাহলে নিরাপদ খাদ্য মজুদ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। আর সন্তোষজনক খাদ্য মজুদ গড়ে উঠলে সামাজিক নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করা সহজ হবে। যেখানে নিরাপদ খাদ্য মজুদ গড়ে তোলা ব্যতিত সামাজিক নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না, সেখানে খাদ্য মন্ত্রণালয়কে অভ্যন্তরীণভাবে ধান, চাল ও গম সংগ্রহ বৃদ্ধি করে বর্তমানে সরকারি খালি খাদ্য গুদামগুলোয় কাংখিত পরিমাণ খাদ্য মজুদ গড়ে  তোলা জরুরি। তা না হলে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অনেকাংশেই কঠিন হবে।
  লেখক : প্রাবন্ধিক   
০১৯২২-৬৯৮৮২৮