সামাজিক অবক্ষয়ে নৃশংসতা বাড়ছেই

সামাজিক অবক্ষয়ে নৃশংসতা বাড়ছেই

আব্দুল হাই রঞ্জু : মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি অন্যতম। প্রতিটি মানুষের কাছে জীবনের মূল্য অনেক বেশি। অনাকাংখিত সন্ত্রাসী হামলায়, সড়ক, লঞ্চ দূর্ঘটনা কিম্বা কথিত বন্দুক যুদ্ধে কেউই মৃত্যুবরণ করতে চান না। আর না চাওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, আমাদের দেশে এখন সবচেয়ে সস্তা হচ্ছে মানুষের জীবন। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হয়ে সম্ভাবনাময় কতজনকেই মরতে হচ্ছে। আবার সড়ক পথে দুর্ঘটনাতো মহামারিতে রূপ নিয়েছে। সুস্থ অবস্থায় ঘর থেকে বেরিয়ে আবার ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা তো এখন আর নেই। প্রতিদিনই সড়ক দূর্ঘটনায় প্রাণ যাচ্ছে নিরপরাধ নিরীহ যাত্রীদের। প্রতিকারের শত চেষ্টাও যেন সফল হচ্ছে না।

আর সফল হবেই বা কি করে? চালক মাত্রই বেপরোয়া। যাত্রী হয়ে যখন বাসে উঠি, তখন অজানা আতঙ্ক অন্যের মতো আমারও আছে। চালক বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালালে কোন যাত্রী প্রতিবাদ করলে চালক আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। মনে হয়, চালকের কাছে জীবনের তেমন কোন মূল্যই নেই। এর বাইরেতো ছুতো অজুহাতে মানুষ খুন হচ্ছে যেনতেন ভাবেই। ২/৩ বছর আগের ঘটনা টেইলার্স বিশ্বজিৎকে কুপিয়ে হত্যা করা হলো। কেউই এগিয়ে এলেন না। সে ঘটনাই শেষ ঘটনা নয়। দুর্বৃত্তদের হামলার আকষ্মিক মৃত্যুর ঘটনা সচরাচরই ঘটছে। তবে কোন কোন ঘটনা মানুষকে কঠিনভাবে পীড়া দেয়। যা সহজেই মেনে নেয়া যায় না।এমনি এক বিভৎস ঘটনা অতিসম্প্রতি ঘটে গেল উপকূলীয় জেলা বরগুনায়। বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে শাহনেওয়াজ রিফাত শরীফকে কুপিয়ে গুরুত্বর জখম করা হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিকালে হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। নৃশংস এই হত্যাকান্ডে জড়িত ছিলেন এলাকার সন্ত্রাসী হিসাবে পরিচিত সাব্বির হোসেন নয়ন বন্ড, রিফাত ফারাজি, রিশান ফারাজিসহ কয়েকজন। যখন রিফাতকে হত্যার জন্য কোপানো হচ্ছিল, তখন এই দৃশ্য শত শত মানুষ দাঁড়িয়ে দেখলেও ভয়ে কেউ এগিয়ে আসেননি। একমাত্র স্ত্রী স্বামীকে রক্ষায় শত অনুরোধ প্রতিকারে এগিয়ে এলেও পাষন্ডরা ন্যুনতম নিবৃত হয়নি। অনেকটা মৃত্যু নিশ্চিত ভেবেই হামলাকারীরা রিফাতকে ফেলে সদর্পে এলাকা থেকে চলে যান।

এ ঘটনা মুহূর্তের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগ ফেসবুকের মাধ্যমে গোটা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় দেশের সর্বস্তরে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও ঘৃণার সৃষ্টি হয়। নির্মম এ ঘটনা শত শত মানুষ প্রত্যক্ষ করলেও রিফাতকে বাঁচাতে কেউ এগিয়ে আসেননি। মোবাইল এ ঘটনা কেউ কেউ ধারন করলেও ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশকে কেউ অবহিত করেননি। দিনে দিনে সমাজটা যেন কেমন হয়ে উঠেছে। কেউ বিপদে পড়লে সহসাই কেউ এগিয়ে আসতে চান না। ভয় হয়, পরে যদি সন্ত্রাসীরা রক্ষাকারীদের আক্রমণ করে অর্থাৎ এক ধরনের অজানা আতঙ্ক কাজ করায় কেউ কারো বিপদে এগিয়ে আসতে চান না। আবার মামলা মোকদ্দমা হলে পরে যদি স্বাক্ষী দিতে হয়, এ ধরনের শঙ্কা থেকেও সহসাই কেউ আর কারো বিপদে এগিয়ে আসেন না। এই হচ্ছে বাস্তবতা। বাস্তবেই আমাদের দেশটি দিনে দিনে ভয়ংকর হয়ে উঠছে। মায়া মমতার ন্যুনতম লেশমাত্র নেই। ফলে প্রতিদিনই খুন খারাপি, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, মুক্তিপণ নিয়ে শেষে খুন করা হচ্ছে। এ ধরনের নৃশংস নির্মমতার শিকার হচ্ছে দেশের কোমলমতি নিষ্পাপ শিশুরাই। বিশেষ করে শিশু ধর্ষণের ঘটনা মহামারিতে রূপ নিয়েছে। প্রতিদিনই শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। আইন আদালতও হচ্ছে। শাস্তিও হচ্ছে, কিন্তু ধর্ষণের মাত্রা যেন কমছেই না। মূলত বিচারে ধীর গতি, উপযুক্ত সাক্ষির অভাব, পুলিশের পক্ষপাতিত্বসহ নানা কারণে ন্যায় বিচারে বিলম্ব হওয়ায় এ ধরনের ঘটনা বন্ধ হচ্ছে না।

যদিও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে অপরাধীরা আটকের পর কথিত বন্দুক যুদ্ধে চিহ্নিত অনেক সন্ত্রাসীকে মরতে হচ্ছে। তবুও যেন প্রতিকারে উল্লেখযোগ্য কোন অগ্রগতি চোখে পড়ছে না। যদিও বিনা বিচারের মত হত্যাকান্ড সমর্থন যোগ্য নয়, যেহেতু বিনা বিচারে হত্যাকান্ডও এক ধরনের অপরাধ, ফলে এক অপরাধের শাস্তি অপরাধ করে প্রতিকার করার পন্থাও সঠিক কোন পথ নয়; বরং অপরাধ প্রবণতা কমার বদলে শুধুই বাড়ে। রিফাত হত্যাকান্ডের প্রধান আসামি সাব্বির হোসেন ওরফে নয়ন বন্ড ইতিমধ্যেই কথিত বন্দুক যুদ্ধে নিহত হয়েছে। অন্য অপরাধীদের কেউ কেউ ধরাও পড়েছে। শেষ পর্যন্ত এ মামলায় কতজনের শাস্তি নিশ্চিত হয়, তা হয়ত সময়ই বলে দিবে। কিন্তু ততদিনে আর কোন নৃশংস ঘটনায় দেশের মানুষের দৃষ্টি সে দিকেই চলে যাবে। এভাবে এক একটি ঘটনা অন্য কোন ঘটনার গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে।

আবার আমাদের দেশে অপরাধীদের সহসাই বিচারও হয় না, যা আগেই বলেছি। বিচার হলেও উপযুক্ত সাক্ষীর অভাবে অপরাধ প্রমাণ করাও কঠিন হয়। এর ওপর আবার নানামুখী প্রভাব, দায়িত্বে পক্ষপাতিত্ব কিম্বা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে তদন্ত রিপোর্ট প্রদান। এমনি নানা কারণে প্রকৃত অপরাধের উপযুক্ত শাস্তিও নিশ্চিত হয় না। ফলে অপরাধ প্রবণতা বাড়তেই থাকে। শুধু রিফাত হত্যাই নয়, প্রায় সব খানেই দেখা যায়, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও পুলিশ প্রশাসনের সাথে অপরাধী চক্রের অনেক সময়ই সমঝোতা হয়ে যায়। এমনকি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতেও অপরাধি চক্রকে ব্যবহার করা হয়। ফলে ন্যায় বিচার পাওয়া অনেকাংশেই কঠিন হয়। অবশ্য রিফাত হত্যাকান্ড নিয়ে দেশজুড়ে প্রতিবাদ হয়েছে। ন্যায় বিচারের দাবি উঠেছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী আসামীদের গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছেন। আসামিরা যাতে পালিয়ে যেতে না পারেন, সে জন্য সারা দেশে রেড এলার্ট জারি করা হয়েছে। যেখানে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ, সেখানে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর হবেন, এটাই স্বাভাবিক। হয়েছেও তাই, জোরের সাথে চলছে অপরাধিদের গ্রেফতারের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা।

অন্যদিকে বরগুনায় রিফাতকে যেভাবে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে, ঠিক একই কায়দায় গত ১১ জন প্রকাশ্যে ফুলবাড়িয়ার আকরাইন গ্রামে যৌতুকের টাকা না পেয়ে নাজমা আক্তারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। বিরুলিয়ার আকরাইন গ্রামে একটি ভাড়া বাসায় থেকে পোশাক কারখানায় কাজ করতেন নাজমা আক্তার। ঘটনার পর পরই স্বামীকে আটক করে পুলিশ। নাজমা আক্তারের বাবা আব্দুল আজিজ দুর্বৃত্ত বকুলের গ্রেফতারে সন্তোষ প্রকাশ করে স্থানীয়ভাবে মিষ্টি বিতরণ করেছেন। একইভাবে রিফাতের বাবা বন্দুক যুদ্ধে নয়ন বন্ডের মৃত্যুর খবর শুনে আনন্দে এলাকায় মিষ্টি বিতরণ করেছেন। হয়তো এ ধরনের উল্লাস স্বাভাবিক। যা দিয়ে সন্তান হারানোর ব্যথা ভুলে যাওয়ার কথা নয়। তবুও মানুষ প্রতিকার পেলে সাময়িকভাবে হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।

আর আমাদের দেশে যৌতুক এখনও একটি বড় সমস্যা। এ সমস্যার কারণে বিয়ের পর চলে পাওয়া না পাওয়ার হিসাব নিকাশ। ফলে দাম্পত্য জীবনে কলহ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। সুখ শান্তি চলে যায় নির্বাসনে। অনেক সময়ই শারীরিক নির্যাতনের পর খুন খারাপি পর্যন্ত ঘটে। আর বিবাহ বিচ্ছেদ তো এখন হর হামেশাই ঘটছে। অশান্তির আর এক বড় কারণ মাদক। মাদকের ছড়াছড়ি এখন সর্বত্রই। মাদকের কবলে পড়ে কতজনই না ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এর ছোবলে অসংখ্য পরিবার ধুঁকে ধুঁকে মরছে। আর মাদকের কারণে সমাজটা দিনে দিনে অচেনা হয়ে উঠছে। মানুষের মধ্যে ভালবাসার বদলে মনুষ্যত্ববিহীন নরপিশাচের আগ্রাসনই চোখে পড়ে। অথচ মানুষ মানেই মানবিক গুণাবলির অধিকারী। যাদের মধ্যে সহনশীলতা, প্রেম, ভালবাসা, সহমর্মিতা থাকবে। তা না হলে মানুষ হয় কি করে? এখন কিন্তু সে সবের আর বালাই নেই। মানুষ দিনে দিনে নিষ্ঠুর হয়ে উঠছে। মানুষের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ বলতে কিছু নেই। ফলে নিষ্পাপ শিশুদের ধর্ষণের শিকার হয়ে বিকারগ্রস্ত হতে হচ্ছে। কোমল বয়সে কলংকের বোঝা মাথায় নিয়ে কত শিশুকেই বেড়ে উঠতে হচ্ছে। অমানবিক এ সমাজটা কি আর বদলাবে না? এমনি হাজার প্রশ্ন বিবেকবানদেরকে ক্লান্ত করে তুলছে। কিছু দিন আগে নুসরাতকে পুড়িয়ে মারা হলো। এটাও কি সম্ভব? মানুষ মানুষকে কিভাবে কেরোসিন ঢেলে আগুন দিয়ে মারতে পারে? আর এ ধরনের ঘটনার রূপকার পিতৃতুল্য অধ্যক্ষই বা কি করে হতে পারে? যা অসম্ভব, তাই এখন এ দেশে সম্ভব হয়ে ওঠছে। এ ধরনের পৈশাচিকতা থেকে দেশটাকে বাঁচাতে না পারলে শান্তির দেখা মেলা বড়ই ভার হবে বৈকি।
লেখক : প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৯২২-৬৯৮৮২৮