সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা ও মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা

সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা ও মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা

: শিক্ষা অর্জন করা দেশের প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। এটা আমাদের বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বের সংবিধান স্বীকৃত। কারণ একমাত্র শিক্ষাই কোন দেশ, জাতি বা গোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূল সোপানে নিয়ে যেতে পারে। শিক্ষা ব্যতিত কোন দেশ, জাতি বা গোষ্ঠী তাদের কাঙ্খিত স্থানে যেতে পারে না। আমরা যদি বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর দিকে তাকাই তাহলে আমরা একটা জিনিসই দেখতে পাই তাদের দেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় শতভাগ শিক্ষিত। এজন্যই তারা আজ বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে স্বীকৃত। আমাদের দেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা আগেকার যেকোন সময়ের চেয়ে ভাল। তবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সাধারণ শিক্ষা ও মাদ্রাসা শিক্ষায় এখনও কিছুটা বৈষম্য রয়ে গেছে। যদি আমাদের দেশের বর্তমান সরকার মাদ্রাসা শিক্ষা ও স্কুল কলেজের শিক্ষার মান সমান করছে তারপরও  মাদ্রাসার ইবতেদায়ী শিক্ষা ও সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা  প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত অবস্থা ও শিক্ষকদের বেতন ভাতায় রয়েছে ব্যাপক বৈষম্য। কিন্তু শিক্ষার মান করেছে সমান। ২০১৯ সালের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি), জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) এবং ইবতেদায়ী ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট পরীক্ষার ফলাফল একযোগে প্রকাশিত হয়েছে। গত বছরের তুলনায় জেএসসি ও জেডিসিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা, পাসের হার এবং জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হার বাড়লেও পিইসি ও ইবতেদায়ীতে কিছুটা কমেছে। তবে সামগ্রিকভাবে পিইসি ও জেএসসি’র তুলনায় ইবতেদায়ী ও জেডিসিতে পাসের হার বেশী। পাবলিক পরীক্ষায় পাসের হার এবং উচ্চ গ্রেড বৃদ্ধির এই ধারাবাহিক সাফল্য দেশের শিক্ষাব্যবস্থার যুযোপযোগী উন্নয়নের প্রথম ধাপ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। পাসের গড় হার ৮৭.৯০ ভাগ। জেএসসিতে পাসের হার ৮৭.৫৮ এবং জেডিসিতে ৮৯.৭৭ভাগ। একযোগে প্রকাশিত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাদরাসা শিক্ষার্থীরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের তুলনায় পাবলিক পরীক্ষায় ভাল করছে। কিন্তু সাধারণ শিক্ষা ও মাদরাসা শিক্ষার মধ্যে যে সব ব্যবধান, বৈষম্য ও সুযোগ সুবিধা বিদ্যমান আছে তার সবই মাদরাসার শিক্ষার প্রতিকুলে থাকলেও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় মাদরাসা শিক্ষার্থীদের এগিয়ে থাকার মধ্য দিয়ে মাদরাসার শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের অধ্যবসায় ও নিয়মানুবর্তিতার সুফল হিসেবে বিবেচ্য। ইবতেদায়ী ও জেডিসিতে অংশগ্রহণকারী মাদরাসাগুলোকে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও এমপিওভুক্ত জুনিয়র স্কুলের সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হলে তাদের শিক্ষার মান ও ফলাফল হয়তো আরো ভালো হতে পারত।

আমাদের সংবিধান সবার জন্য মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার নিশ্চয়তা দিলেও স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরেও আমরা তা নিশ্চিত করতে পারিনি। এ কারণে দেশে নানামুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষায় বিদ্যমান বৈষম্য দূর করার কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। দেশের অতি দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের জন্য মানসম্মত শিক্ষার ব্যবস্থা করতে না পারলে সামাজিক-অর্থনৈতিক অগ্রগতির সব প্রয়াস ব্যর্থ হতে বাধ্য। এ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ধর্মীয় মূল্যবোধসহ স্বল্প খরচে লেখাপড়ার সুযোগ থাকায় দেশের গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারগুলো মাদরাসা শিক্ষার প্রতি আগ্রহী। কিন্তু আমাদের সরকার এবং বিভিন্ন বিদেশি সংস্থার দৃষ্টি শুধুমাত্র সাধারণ প্রাথমিক শিক্ষার দিকেই নিবদ্ধ। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো, শিক্ষকদের বেতন-ভাতা, শিক্ষার্থীদের বৃত্তি ও স্কুলমিলের মত সুযোগ সুবিধা মূলত প্রাথমিক বিদ্যালয়কেন্দ্রিক। যদিও বেশিরভাগ দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের পড়ালেখার প্রধান আশ্রয়স্থল ইবতেদায়ী মাদরাসাগুলো যে কোনো বিচারেই সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সমান সুযোগ সুবিধার দাবি রাখে। অতি দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের পড়ালেখা ও পুষ্টির চাহিদা নিশ্চিত করা সামাজিক নিরাপত্তা, এসডিজি এবং সুষম উন্নয়নের জন্যই জরুরি।

সরকারের শিক্ষা বাজেটের খুব সামান্য অংশই মাদরাসা শিক্ষা খাতে ব্যয় করা হয়। সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের হারের অনুপাতে মাদরাসার অবকাঠামো উন্নয়ন, বেতন-ভাতা ও সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা হলে তাদের মধ্য থেকে আরো মেধাবী শিক্ষার্থীরা বেরিয়ে আসতে পারত। যারা দারিদ্র্য বিমোচন ও জাতির উন্নয়নে আরো বেশি ভূমিকা রাখতে পারত। প্রয়োজনীয় বাজেট ও সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার পাশাপাশি দেশের মাদরাসা শিক্ষা নিয়ে অমূলক অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রও কম হয়নি। বর্তমান সরকার মাদরাসা শিক্ষার উন্নয়নে বেশকিছু পদক্ষেপ নিলেও শিক্ষার দুই স্তরের মধ্যে অবকাঠামো, জনবল কাঠামোতে ব্যাপক বৈষম্য রয়েছে। বৈষম্য দূর করা জাতীয় শিক্ষানীতির সুষম বাস্তবায়ন ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করণের অন্যতম পূর্বশর্ত। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগ যেহেতু মাদরাসায় যায়, সে কারণেই শিক্ষা, পুষ্টি ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বাজেট বাস্তবায়নে মাদরাসাগুলোর দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। অনেক প্রতিকুলতা ও প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে মাদরাসা শিক্ষার্থীরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষায় মেধাস্থান অধিকার করে নিতে সক্ষম হচ্ছে। অবিশ্বাস্য হলেও মাদরাসার শিক্ষকরা ১৯৯৫ সালের জনবল কাঠামো, নামমাত্র বেতন ও সুযোগ সুবিধা নিয়ে শিক্ষার্থীদের পেছনে শ্রম ও মেধা ব্যয় করে এই কৃতিত্ব অর্জনে সক্ষম হচ্ছেন। দেশের দরিদ্র ও অবহেলিত শ্রেণীকে শিক্ষার মূল ধারায় নিয়ে আসতে আরো অধিক সংখ্যক মাদরাসাকে সাধারণ বিদ্যালয়ের সমান অবকাঠামো ও সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সেই সাথে সাধারণ শিক্ষা ও মাদরাসা শিক্ষার মধ্যকার পার্থক্য ও বৈষম্য দূর করার বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। শিক্ষার্থীদের মেধার বিকাশ, সৃজনশীলতা ও কর্মমুখী দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষার কাঙ্খিত মানোন্নয়নের জন্য ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার উপর অধিক জোর দেয়া প্রয়োজন।
লেখক ঃ সাংবাদিক-কলামিস্ট
[email protected]
০১৮১৮-৯৩৬৯০৯