সর্বোত্তম ইবাদত কোরআন মজিদ তেলাওয়াত

সর্বোত্তম ইবাদত কোরআন মজিদ তেলাওয়াত

মোহাম্মদ মোস্তাকিম হোসাইন : দোজাহনের অধিপতি মহাবিশ্বের মহাবিস্ময় মহান আল্লাহর সর্বশেষ ঐশীগ্রন্থ আল কুরআন। এটি বিশ্বমানবতার কান্ডারি হযরত মুহাম্মদ (সা.)এর প্রতি হযরত জিব্রাইল (আ.) এর মাধ্যমে সুদীর্ঘ তেইশ বছরব্যাপী অবতীর্ণ হয়েছে। এতে বিশ্বমানবের পার্থিব ও পারলৌকিক জীবনের প্রয়োজনীয় বিষয়বস্তুর মৌল ধারা আলোচিত হয়েছে। আল্লামা সূযুতি (র) বলেন, কুরআন মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ এবং বিশ্বে এটা আল্লাহর সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানি গ্রন্থ। এ কুরআন হচ্ছে ইসলামের যাবতীয় মূলনীতির উৎস। আল কুরআন ইসলামের সার্বিক বিধিবিধানের স্বয়ংসম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত দলিল। সমগ্র কুরআন ত্রিশ খন্ডে বিভক্ত। প্রতি খন্ডকে পারা বলা হয়। সাতদিনে খতম করার সুবিধার্থে উক্ত সূরাগুলোকে সাত মনযিলে বিভক্ত করা হয়েছে। পৃথিবীর তাবৎ ধর্মগ্রন্থের মধ্যে কুরআন মাজিদ বিশেষ বৈচিত্র্যে বৈশিষ্ট্যমি ত ও অতুলনীয়। এর শিক্ষা বিশ্বজনীন, সর্বজনীন ও চিরন্তন। এর কল্যাণধারা কালজয়ী ও ভৌগোলিক সীমার উর্ধ্বে।

পৃথিবীর কোনো গ্রন্থই ত্র“টিমুক্ত নয়। পূর্ববর্তী আসমানি গ্রন্থগুলোকে ইহুদি-খ্রিষ্টানরা তাদের ইচ্ছানুসারে নিজেদের স্বার্থে সংযোজন-বিয়োজন করে বিকৃতির অতলান্তে নিমজ্জিত করেছে। শুধুমাত্র কুরআনই যাবতীয় বিকৃতির অভিশাপ হতে চিরমুক্ত ও অবিকল অবস্থায় অটুট আছে। এর মধ্যে কোনো রকম ভুলত্র“টি নেই। একথার সত্যায়ন করে মহান আল্লাহ বলেÑ “এ মহাগ্রন্থে সন্দেহ সংশয়ের লেশমাত্র নেই।” (সূরা বাকারা : ২) এর প্রতিটি বিধিনিষেধ মানবজাতির জন্য অবশ্যই পালনীয়। ড. মুরসি বুকাইলি তাঁর কুরআন ও বিজ্ঞান গ্রন্থে বলেন “কুরআন আইন বিধানের এক বিশ্বকোষ।” ইহকালীন মুক্তি ও শান্তির পাশাপাশি পরকালীন মুক্তির জন্য যেসব ফরয ইবাদত রয়েছে তাদের পরে রয়েছে নফল ইবাদত। নফল ইবাদতের মধ্যে কুরআন তিলাওয়াত করা সর্বোত্তম ইবাদত। রাসুলে পাক (সা.) এরশাদ করছেন, “নফল ইবাদতের মধ্যে কুরআন তিলাওয়াতই শ্রেষ্ঠ ইবাদত।

হযরত উসমান (রা.) হতে বর্ণিত রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, “আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা হলো, যে ব্যক্তি পবিত্র কুরআন নিয়ে ব্যস্ত থাকার দরুন আমার যিকির করা এবং আমার সমীপে প্রার্থনা করার অবসর সময় পায় না, তাকে ঐ সকল লোকের চেয়ে অধিক কিছু দান করে থাকি যারা প্রার্থনা করে থাকে।” (তিরমিযি) কুরআন মাজিদ তিলাওয়াতের মাধ্যমে করুণাময় আল্লাহর নিকট শ্রেষ্ঠ মর্যাদা লাভ করা সম্ভব হয়। কেননা এটি শিক্ষা করা এবং শিক্ষা দেওয়া উভয় সম্মানের কাজ। এ মর্মে মহানবি (সা.) ইরশাদ করেছেনÑ “তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তি মর্যাদার অধিকারী যে নিজে কুরআন শিক্ষা করে এবং অপরকে শিক্ষা দেয়। হযরত আয়েশা (রা) এর সূত্রে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেনÑ “কুরআনে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি পূণ্যবান সুমহান সান্নিধ্যপ্রাপ্ত ফেরেশতাদের সঙ্গী হবেন। আর যে ব্যক্তি কুরআন তিলাওয়াতে দক্ষ নয়; অথচ পাঠ করতে গিয়ে বার বার আটকিয়ে যায় এবং তোতলায় আর তার জন্য তা কষ্টসাধ্য হয়, এমন ব্যক্তির জন্য দ্বিগুণ পুরস্কার রয়েছে।” (বুখারি মুসলিম) রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি কুরআন মাজিদের একটি অক্ষর পাঠ করে, সে একটি নেকি পায় এবং এর প্রত্যেকটি নেকি দশটি নেকির সমান। (তিরমিযি) আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব যেমন সবার ওপরে, তদ্রুপ তাঁর বাণীর শ্রেষ্ঠত্ব অন্যান্য সকল বাণীর ওপরে। কুরআন তিলাওয়াত মানব হৃদয়ে প্রশান্তি আনয়ন করে। ফলে আল্লাহর স্মরণ সদা হৃদয়ে জাগ্রত থাকে এবং আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়। আর যে হৃদয়ে কুরআন তিলাওয়াত নেই, তা একটি শূন্য খাঁচার ন্যায়। এ মর্মে রাসুল (সা.) বলেছেনÑ “যে অন্তরে কুরআন মাজিদের কোনো অংশ নেই তা একটি শূন্য খাঁচার ন্যায়।” (তিরমিযি)।  

 তিলাওয়াতকারীর পিতামাতা ও অপরাপর আত্মীয়স্বজনের মর্যাদা ও মুক্তির উপায় হিসেবে কাজ করে। মহানবি (সা.) এ সম্পর্কে ঘোষণা করেন। “যে ব্যক্তি কুরআন পাঠ করে এবং তদানুযায়ী জীবন পরিচালনা করে, কিয়ামত দিবসে তাঁর পিতামাতাকে সূর্যের চেয়েও উজ্জ্বল মুকুট পরানো হবে।” (মুসনাদে আহমদ ও আবু দাউদ) কুরআন শেখা ও তিলায়াতের মাধ্যমে আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহ লাভ করা যায়। মনে রাখতে হবে প্রতিটি মুসলমানের জন্য কমপক্ষে সহিশুদ্ধ ভাবে দেখে দেখে কোরআন পড়া শিক্ষা গ্রহণ করা অবশ্য কর্তব্য। এজন্য আমাদের শিশু সন্তানদেরকে প্রাথমিক শিক্ষা হিসাবে মক্তব তথা কোরআন শিক্ষা দেয়া উচিৎ অন্যথায় বাবা, মা অভিভাবকদেরকে অবশ্যই আল্লাহর নিকট জবাবদিহির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। কোরআন শিক্ষা গ্রহণের পর ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যারিস্টার, গবেষক, উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ হয়ে দেশ ও মানব সেবায় আত্মনিয়োগ করা মুসলমানের কর্তব্য হওয়া প্রয়োজন। সর্বোপরি পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে মানব হৃদয়ে সকল কলুষ-বিদূরিত হয়ে মানবাত্মা পূত-পবিত্র, জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভাবধারায় সতেজ-সবল এবং বিকশিত হয়ে ওঠে। এজন্য প্রিয়নবি (সা.) এর দরবারে যখন কেউ ইসলাম গ্রহণ করত তখন তাকে সাহাবায়ে কিরামের নিকট অর্পণ করে রাসুল (সা.) বলতেন, “তাঁকে কুরআন শরিফ শেখাও।” অতএব যথোপযুক্ত আদব ও আন্তরিকতার সাথে নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য একান্ত কর্তব্য। মহান আল্লাহ আমাদেরকে সহি বুঝ দান করুন এবং পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত, গবেষণা ও চর্চার মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতের কামিয়াবী দান করুন। আমিন।
লেখক : ইসলামী গবেষক -কলামিষ্ট  
[email protected]
০১৭১২-৭৭৭০৫৮