সরকারি চাকরির দাবিতে অনশনে সিরাজগঞ্জের প্রতিবন্ধী তরুণী

সরকারি চাকরির দাবিতে অনশনে সিরাজগঞ্জের প্রতিবন্ধী তরুণী

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি : সরকারি চাকরির দাবিতে ঢাকায় অনশনে বসেছেন সিরাজগঞ্জের প্রতিবন্ধী তরুণী মাহবুবা হক ওরফে চাঁদের কনা; যিনি প্রথম শ্রেণিতে এমএ পাস করেছেন ছয় বছর আগে। সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার বিয়াড়া গ্রামের আব্দুল কাদেরের মেয়ে চাঁদের কনা গত বুধবার সকালে ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আমরণ অনশনে বসেন। তিনি জানান, নয় মাস বয়সে পোলিও আক্রান্ত হওয়ায় তার দুটি পা-ই অচল হয়ে যায়। বাবা-মায়ের চেষ্টায় দুই হাতে ভর করেই তিনি  প্রয়োজনীয় কাজ চালিয়ে নিতে শেখেন। তার মা হাসনা হেনা বেগম ছিলেন স্কুলশিক্ষক। তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। গতকাল বৃহস্পতিবার কনা বলেন, “যোগ্যতা অনুযায়ী আমার একটা সরকারি খুব দরকার। কারণ প্রতিবন্ধী জীবনে আমি বেশির ভাগ সময় অসুস্থ থাকি, যে কারণে প্রাইভেট চাকরি করা আমার জন্য অনেক কঠিন হয়ে যাবে। সেই জন্য আমি একটা সরকারি চাকরি খুঁজছি।

২০১৩ সালে পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর বহু সরকারি চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, “কোনো চাকরি আমার কপালে জুটল না। চাকরির বয়সও শেষ হয়ে এসেছে। এখন আমি আমার পরিবার নিয়ে চোখেমুখে কিছুই দেখছি না।” চাঁদের কনা বলেন, “আমি যখন অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্রী তখন মা মারা যান। এর কয়েক বছর পর বাবা ব্রেইন স্ট্রোক করে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ছোট দুই ভাই আছে। একজন এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। আরেকজন এসএসসি পাস করেছে। তাদের পড়াশোনা কিভাবে হবে তা নিয়েও অনিশ্চিয়তা দেখা দিয়েছে।” রাজশাহী মাদার বক্স গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ থেকে বিএ (অনার্স) আর ২০১৩ সালে ঢাকার ইডেন কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণিতে এমএ পাস করেন তিনি। কনা বলেন, “একদিকে আমার প্রতিবন্ধিতা, আরেকদিকে বাবার অসুস্থতা, আবার নেই কোনো উপার্জনের নিশ্চয়তা। এই চরম দারিদ্র্য সত্ত্বেও আমি থেমে থাকিনি। টেলিভিশনের জন্য প্রোগ্রাম গ্রন্থনা, কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে বিভিন্ন কাজকর্ম করে জীবিকা চালাই।

“আমি যখন মাদার বক্স কলেজে পড়তাম, পঞ্চম তলায় আমার ক্লাস হত। ৯টার ক্লাসের জন্য আমি কলেজে যেতাম সকাল ৭টার দিকে। কারণ হাতে ভর দিয়ে পঞ্চম তলায় উঠতে দেড় ঘণ্টার মত সময় লাগত। স্কুলজীবন থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত এমন লক্ষ্য-কোটি বাধা পেরিয়ে প্রতিবন্ধিতা জয় করেছি। আমার স্বপ্ন শুধুমাত্র একজন সরকারি কর্মকর্তা হওয়া। যোগ্যতা অনুযায়ী সরকারি চাকরির জন্য বহু চেষ্টা করেছি।” সরকারি চাকরিতে প্রবেশের আর চার মাস বাকি আছে বলে জানান তিনি। “তাই বাধ্য হয়ে আমরণ অনশনে বসেছি। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে চাই। উনি আমার দুঃখ-কষ্ট বুঝবেন। আমি আশা করি, উনি সাথে দেখা হলে, আমার কথাগুলো বলতে পারলে, তিনি একটা সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করে দেবেন।” কনার হুইল চেয়ার ঘিরে রয়েছে বিভিন্ন বার্তা লেখা গোটা বিশেক প্ল্যাকার্ড। গলায় ঝুলছে, “আমি আমার মা প্রধানমন্ত্রীর ভালবাসা চাই। তার সাথে দেখা করতে চাই।” তিনি বলেন, “সব প্রতিবন্ধকতা জয় করে মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণি অর্জন করেছি। টিভি- রেডিওতে সংবাদ পাঠ করেছি। উপস্থাপনা ও পরিচালনার কাজও পারি। নাটক, গল্প ও কবিতা লিখতে পারি। অভিনয়-আবৃত্তি, গল্প বলা, ছবি আঁকার চর্চাও করেছি।হুইল চেয়ারে বসে অনশন পালনরত কনা তার একটি দেখিয়ে বলেন, “আমাকে এখানে হুইল বসে থাকতে আপনাদের মতে হতে পারে আমি স্মার্ট! আসলে আমার জীবন অনেক কষ্ট। ওই যে ছবিটা দেখছেন, আমাকে দুই হাত ও দুই পা দিয়ে খুব কষ্ট করে চলাফেরা করতে হয়।” গত বছর তথ্যমন্ত্রী থাকাকালীন হাসানুল হক ইনু এই হুইল চেয়ারটা দেওয়ার পর থেকে তিনি তখন থেকে এর ওপর নির্ভর করে চলাফেরা করেন বলে জানান।