সমবায় ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে হবে

সমবায় ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে হবে

মোঃ শফিকুল আলম : শিকড় ছাড়া যেমন গাছ বাঁচে না, তেমনি শিকড় না চিনলে বাঁচে না মানুষের সংস্কৃতি কৃষ্টিকালচাল ও আত্মপরিচয়। আমাদের এই বাংলাদেশটি যেমন শস্য শ্যামল নদ-নদী হাওড় বাওড়ে সমৃদ্ধ। দেশটি সুনিবিড় তেমনি দেশের মানুষ মায়া মমতায় পরিপূর্ণ। শোষিত ও শাসিতের বঞ্চনায় কোন এক সময়ে দেশের শ্রমজীবি মানুষ ছিল নিষ্পেষিত। শ্রমিক তার ন্যায্য মজুরী ও শ্রমের মর্যাদা থেকে ছিল বঞ্চিত। বৈষম্যতা থেকে শুরু হয় মানুষের আন্দোলন। আজকের বিশ্বায়ন প্রযুক্তি নির্ভর। আর যাদের অবদানের প্রযুক্তির বিকাশ তারা ক্ষেত্র বিশেষে বিশেষজ্ঞ, কৌশলী, প্রকৌশলী, উদ্ভাবক তেমনি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ে যাদের অবদান তারা কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দীক্ষায় পারদর্শী নয়। বাস্তবতায় তারা মূলত আমাদের প্রান্তিক শ্রমজীবি মানুষ অর্থাৎ মূল চালিকাশক্তি কৃষক, কামার, কুমার, জেলে, তাঁতি, রিক্সাচালক ইতাদি নানা পেশার মানুষের প্রাণশক্তি ফিরে আনার সে সময়ে কোন প্রশিক্ষণমূলক প্রতিষ্ঠান আগেও ছিল না আজও নেই। তারা সবাই স্ব স্ব কাজের অভিজ্ঞতা দিয়েই অর্জন করেছে কর্মধারার কর্মকৌশল, পদ্ধতিগত বিষয়ে কর্ম পরিকল্পনা সবই তাদের মৌখিক/বাস্তব শিক্ষার অর্জন।

 পরবর্তিতে সমবায় কি? কেন সে বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা উন্নত পদ্ধতি নীতি নির্ধারণ বিষয়ে যে উদ্যোগ দেশ স্বাধীনতার পরবর্তীতে শুরু করেন সমবায়ের মধ্যমনি ডঃ আখতার হামিদ খান। সমবায় প্রতিষ্ঠিত করণের আরেক বলিষ্ঠ কর্ণধার তিনি হচ্ছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সকলের বুদ্ধিমতা, কৌশলগত প্রচেষ্টা নিয়েই শুরু করেন সমবায়ের যাত্রা। আজ সমবায়ের সে প্রতিষ্ঠানটি সমবায় একাডেমি হিসেবে কুমিল্লায় অবস্থিত। যা ইতিপূর্বে বাংলাদেশ পল্লি উন্নয়ন একাডেমি ছিল। আজ সারা দেশে প্রতিটি জেলা উপজেলাসহ গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে ছিটে তৃণমূল পর্যায়ের অসহায় শ্রমজীবি মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছে। সরকারের সমবায় অফিসের অনুমোদন সাপেক্ষে সমবায় সমিতি গঠন করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় করার সুবাতাস বয়ে দিয়ে সেই সব সমবায়ীদের মধ্যে ক্ষুদ্র ঋণের সহায়তা দিয়ে স্বাবলম্বী করে তুলতে সক্ষম হচ্ছে। সেক্ষেত্রে দরিদ্রতা বিমোচনের পরিমাণ তুলনামূলক কমতে শুরু করেছে। এক কথায় বুঝা যায় মানুষ এখন কর্মমুখী। প্রতিযোগিতার বিশ্বায়নে সকল পেশার মানুষ প্রতিযোগিতায় মূখর। সমবায়ের ছোট একটি মন্ত্র ‘দশের লাঠি একের বোঝা’ কথাটির ব্যাপকতা অনেক। সমবায়ের সঙ্গীত রচনা করেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। সমবায়ের আরেক প্রবর্তক বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তৃণমূলের লোকদের কথা প্রসঙ্গে বিশ্ব কবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঐকতান কবিতায় কয়েকটি পঙক্তি এখানে তুলে ধরছি- ‘চাষি ক্ষেতে চালাইছে হাল/তাঁতি বসে তাঁত বোনে, জেলে ফেলে জাল/বহুদূর প্রসারিত এদের কর্মভার/তারি পরে ভর দিয়ে চালিয়েছে সংসার’। সমবায় সম্পর্কে সমবায় প্রবাদ দুই চার লাইন পর পর উল্লেখ করেও শেষ করা যাবে না । কেন না শেষ বলে কোন শেষ নেই। সামনে অগ্রসর হবার সময়, বাধা বিপত্তি পেরিয়েই এগুতে হবে।

সমবায় সংগঠন/সমিতিগুলো প্রযুক্তি নির্ভরতা নিয়েই এগিয়ে চলছে। দেশ যেহেতু প্রযুক্তি নির্ভর সেইহেতু সমবায় সমিতিগুলোও প্রযুক্তি নির্ভর হতে বাধ্য হচ্ছে। সমবায় সংগঠন প্রান্তিক পর্যায়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় সৃষ্টি করার সুবাদে চষে বেড়াচ্ছে সেইসব তৃণমূল পর্যায়ের লোকদের কাছে। সঞ্চয় করার সুফল এবং পরবর্তীতে সেই সব সঞ্চয় থেকে ক্ষুদ্র ঋণ সহায়তা প্রদানের আশ্বাস তৃণমূলের জনগণকে সমবায়মুখী হওয়ার সুযোগ সুষ্টি করছে। তাতে করে সমবায় সমিতিগুলো সাফল্যের দিকে ক্রমান্বয়ে ধাবিত হচ্ছে। যতদূর মনে পড়ে একটি চলচ্চিত্রের নাম- ধীরে বহে মেঘনা’। সমবায়ের গতি ধীরে বহে মেঘনার গতির ন্যায়। হাঁটি হাঁটি পা করে। কথা প্রসঙ্গে বলতে হয় এভাবে ক্ষুুদ্র সঞ্চয় ও পরবর্তীতে ঋণ সহায়তা প্রদান অনেকটা প্রবিন্ধকতা সৃষ্টি হতে দেখা যাচ্ছে। ফলে ক্ষুদ্র ঋণ সহায়তা ৫ থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে বর্তমান টেকসই উন্নয়নের অগ্রযাত্রার অন্তরালেই থেকে যাচ্ছে। তেমন কোন সাফল্য বয়ে আনতে সমবায় প্রতিষ্ঠান ও সমবায়ীরা সুবিধা করতে পারছে না। উন্নয়নের ধারার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে উৎপাদনমূখী ও টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন উদ্যোক্তা। তৃণমূল থেকে উদ্যোক্তা সৃষ্টি অসহায় সমবায়ীদের মধ্যে থেকে গড়ে তোলা একটা চ্যালেঞ্জ। উৎপাদনমূখী উদ্যোক্তা সৃষ্টি করতে হলে অর্থবান ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। কিন্তু সমবায় ক্ষেত্রে তাদের আগ্রহ ভিক্ষুকের সাহায্যের সমতুল্য। সেই হিসেবে সরকারী প্রতিষ্ঠান থেকে আর্থিক অনুদানের বিষয়টি অনায়সে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রয়োজন অনুভূত হয়। অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ ৪৭তম জাতীয় সমবায় দিবসের প্রতিপাদ্য ‘সমবায় ভিত্তিক সমবায় গড়ি, টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করি’। এ উদ্দেশ্যে দেশে বেসরকারী সমবায় সমিতিগুলো সরকারের উদ্যোগকে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে স্বাগত জানাচ্ছে। একই সাথে সমবায়ীদের প্রত্যাশার বিষয়টিও সংশ্লিষ্টদের অবগতি ও বিবেচনার জন্য তুলে ধরতে হচ্ছে। দেশ আজ শিক্ষা দীক্ষায় যথেষ্ট অগ্রগতির পথে অগ্রগামী।

বর্তমান সরকার একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প ও পল্লি সঞ্চয় ব্যাংক মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটি বিশেষ উদ্যোগ। দারিদ্রমুক্ত সমাজ গড়তে এ ধরনের প্রকল্প বাংলাদেশের জন্য সত্যিই উন্নয়নের ধারার প্রতীক। দারিদ্রপীড়িত এলাকার উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষে বাংলাদেশের কৃষি গবেষণা কাউন্সিল অডিটোরিয়ামে মিসিং মিডল ইনিসিয়েটিভ কৃষক সংগঠনের জন্য আর্থিক সেবা বৃদ্ধিকরণ প্রকল্পে গ্লোবাল এগ্রিকালচার অ্যান্ড ফুড সিকিউরিটি প্রোগ্রাম এর অর্থায়নে ২০ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। অর্থনীতিতে পাটের গুরুত্ব অপরিসীম। গো খাদ্য সংকট নিরসনে নতুন প্রযুক্তি (সূত্রঃ সচিত্র বাংলাদেশ, জুন ২০১৮)। এ ধরনের প্রকল্প সমবায় সমিতিগুলো পরিচালনা করতে উদ্যোগী। স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্প যা তৃণমূল সমবায়ীদের জন্য আরেকটি সম্ভাবনাময় প্রকল্প এবং এটি প্রয়োজনীয়। সরকারি বেসরকারি অনুদান ছাড়া চালানো সম্ভব নয়।

আমি একজন সমবায় এবং সমাজকর্ম মূুলক সংগঠক হিসেবে দেশের বিদ্যমান অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে আমাদের প্রত্যাশা সমবায়/সমাজকর্ম কর্মকান্ডের অংশ বিশেষ হিসেবে উপরে বর্ণিত প্রকল্পসমূহ সংশ্লিষ্ট সমবায়/সমাজকর্ম প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় প্রকল্প সমূহের জন্য অনুদান সরকারি নীতিমালায় অন্তর্ভূক্ত করা জরুরি। সমবায় ভিত্তিক সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে সমবায়ী সদস্যরা টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করণে নিজের উন্নয়নের সাথে দেশের উন্নয়নে অংশিদারিত্বের সুযোগ সৃষ্টি করা যায় সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠিত সমবায়/সমাজকর্ম মূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পারফরমেন্স যাচাই করে দেশের প্রচলিত এনজিওদের ন্যায় সহজ শর্তে প্রথমে মাঝারি ও পর্যায়ক্রমে উচ্চ মাঝারি প্রকল্প গ্রহণ করে দেশের ব্যাংক কিম্বা ঋণ সহায়তা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নের অংশিদারিত্ব করার বিষয়টির সাথে সম্পৃক্ততা বজায় রাখার প্রত্যয়ে পুনরায় উচ্চারিত করছি ‘সমবায় ভিত্তিক সমাজ গড়ি, টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করি’। আমরাও পারি, আমাদেরকে সহায়তার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সরকারী প্রতিষ্ঠানের নিকট সবিনয়ে অনুরোধ রইল।
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক-সংগঠক
alamms [email protected]