সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা হোক

সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা হোক

রাশেদুল ইসলাম রাশেদ:খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। সেই সাথে খাদ্যটি যাতে নিরাপদ এবং পর্যাপ্ত পুষ্টিমান সমৃদ্ধ হয় সেটিও আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। কিভাবে আমরা নিরাপদ খাদ্য সবার জন্য নিশ্চিত করতে পারব সেজন্য সরকারি ও বেসরকারি  সব মহল থেকে কিছু সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গড়ে তুলতে হবে। কারণ আমরা প্রতিদিন যখন বাজার থেকে খাবার কিনি, সেই  খাবারে কী পরিমাণে পুষ্টিমাণ রয়েছে সেটি নিশ্চিত করে না বলতে পারলেও খাবারটিতে যে বিষ মিশানো রয়েছে তা আমরা সবাই নিশ্চিত করেই বলে দিতে পারি। বাংলাদেশে খাদ্যের সাথে সংশ্লিষ্ট এরকম প্রায় ১৭টি আইন রয়েছে কিংবা এর বেশিও থাকতে পারে। এছাড়াও ২০১৩ সালে নিরাপদ খাদ্য আইন এবং ২০০৯ সালে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন করা হয়েছে। ২০০৫ নিরাপদ খাদ্য অধ্যাদেশ জারি করা হয়। ২০০৫ সালের এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী খাদ্যে সব ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদান ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ফরমালিন, ইটেফন  ও বিভিন্ন রকমের ক্ষতিকারক কীটনাশক ব্যবহার করা নিষিদ্ধ করা হয়। তারপরেও খাদ্যদ্রব্যে এসবের ব্যবহার অতিমাত্রায় বেড়েই চলেছে। এখন স্বাভাবিকভাবে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে যে আমরা বাজার থেকে খাবার কিনে খাচ্ছি নাকি বিষ কিনে খাচ্ছি?


১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর আমাদের দেশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আমরা জানি দেশে জনসংখ্যা যে হারে বাড়ছে ঠিক সেই হারে চাষযোগ্য আবাদী জমির পরিমাণও কমছে। ফলে একসময় দেশের উৎপাদন ঘাটতি মিটানোর জন্য সরকারকে  প্রতিবছরই বৈদেশিক খাদ্য সহায়তা ও আমদানির উপর নির্ভর করে থাকতে হত। তবে সরকারের নানামুখী কৃষিবান্ধব নীতি, কৃষি উন্নয়নে নিয়োজিত গবেষক, সংস্থা ও সর্বোপরি বাংলাদেশের কৃষকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তার পথে এখন অনেক দূরেই এগিয়ে গেছে। এখন আমরা অনেকাংশেই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। আমাদের উৎপাদন বাড়ছে। মাছ ও ফল উৎপাদনে আমরা রেকর্ড করেছি। তারপরেও মাঝেমধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগে কিছুটা হলেও আমাদেরকে খাদ্য সংকটে ভুগতে হয়। সেটিও এখন আমরা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সামাল দিতে সক্ষম। এখন শুধু সুশাসন এবং একটি নিরাপদ খাদ্য বিপ্লবের মাধ্যমে আমাদের দেশটিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এজন্য সরকারের পাশাপাশি আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে  হবে।

আমাদের বাৎসরিক কৃষিজ উৎপাদন বেড়েছে  ঠিকই এই উৎপাদিত পণ্যগুলো আমাদের জন্য কতটুকু নিরপাদ সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ সাধারণ মানুষ দৈনিক যে পরিমাণ খাদ্য গহণ করছে সেগুলো কতটুকু নিরাপদ এটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নবোধক একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা যেমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ঠিক তেমনি সেই খাদ্যটি যেন নিরাপদ ও পর্যাপ্ত ক্যালরি সমৃদ্ধ হয় সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যদিও নিরাপদ খাদ্য ও খাদ্য নিরাপত্তার মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে তারপরেও বর্তমানে খাদ্য নিরাপত্তার চেয়ে নিরাপদ খাদ্য ইস্যুটি এখন আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সেই খাদ্যটি যেন নিরাপদ ও পর্যাপ্ত পুষ্টিমান সমৃদ্ধ হয় সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। সরকার এজন্য অবশ্য ২০১৩ সালে নিরাপদ খাদ্য আইন প্রণয়ন করেছে। তবে এটিও সত্য যে শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না। সেই সাথে এটির বাস্তবায়নও করতে হবে। এজন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। নিরাপদ খাদ্যের এই আন্দোলনে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে এবং সচেতন হতে হবে। সেই সাথে প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদেরকেও এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। আইসিডিডিআরবি এর গবেষণা তথ্যমতে বাংলাদেশে এখন খাদ্যবাহীত রোগের প্রকোপ অনেকাংশেই বেড়ে গেছে। তার মানে হচ্ছে মানুষ দৈনন্দিন ভেজাল জাতীয় খাবার খেয়েই সবচেয়ে বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছে। তাই নিরপাদ খাদ্যের প্রতি এখন মানুষের আগ্রহ এবং সচেতনতা দু’টাই অনেক বেড়ে গেছে। আমাদের এখন দেশটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পালা। কারণ আমরা স্বাধীনতার সূবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন করতে চাই ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ হিসেবে। তাই এসব ছোট ছোট সমস্যা থেকে বেরিয়ে আমাদেরকে বৃহত্তর স্বপ্নের বীজ বপন করতে হবে।

তবে এটিও সত্য যে আমরা অনেক সময় মনে করি অনিরাপদ খাদ্য মানেই  ভেজাল খাদ্য। কিন্তু একথাটি ঠিক নয়। নিরাপদ খাদ্য কথাটি আরও ব্যপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজারজাতকরণ, রান্না থেকে শুরু করে খাদ্য গ্রহণের যতগুলো প্রক্রিয়া রয়েছে সবগুলোর সাথেই নিরাপদ খাদ্যর প্রশ্নটি জড়িয়ে আছে। তাই অনেক সময় ভেজালমুক্ত খাদ্যও অনিরাপদ হয়ে উঠতে পালে। সেদিকেও আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। প্রতিদিন আমরা আমাদের শিশুদের হাতে তুলে দিচ্ছি বিভিন্ন ধরনের জুস, কোল্ড ড্রিংকস এবং বাজার থেকে মসলা কিনে নিয়ে এসে সপরিবারে খাচ্ছি কিন্তু আমরা আদৌ জানিনা এসব ড্রিংকসে ও জুসে কি কি উপাদান রয়েছে এবং সেগুলো কিভাবে শিশুদের ক্ষতি করছে। আমরা এসব বিষাক্ত খাবার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশ্বাস করছি আর বিনিময়ে তারা আমাদের সাথে প্রতারণা করে দিন দিন আমাদেরকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। গত ২১ ডিসেম্বর ২০১৭ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য সম্মেলনে একটি বাক্য প্রায় সবার মুখে শোনা গিয়েছিল সেটি হচ্ছে ‘ক্ষেত থেকে পাত’।  অর্থাৎ আমরা ক্ষেতে যে ফসলটি উৎপাদন করব সেটি যেমন নিরাপদ হতে হবে ঠিক তেমনি আমরা যখন খাবারটি গ্রহণ করব তখনো যেন এটি নিরাপদই থাকে।


 সকলের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে কার্যকর ভ্যালু চেইন গড়ে তুলতে সরকারি সহায়তা বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য নেটওয়ার্ক (বিএফএসএন) দিনব্যাপী নিরাপদ খাদ্য সম্মেলনটির করেছিল। সারাদেশ থেকে প্রায় ২০০ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধি কৃষিবিদ মিলনায়তনে এসে মিলিত হয়েছিল। সম্মেলনে নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তির নানাদিক, বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে নিরাপদ খাদ্যের অর্থায়নে। এজন্য আগামী বাজেটে নিরাপদ খাদ্য অধিকার নিশ্চিত করার জন্য সরকারকে বাজেট বাড়াতে হবে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কাছে জনগণের যে প্রত্যাশা সেটি পূরণ করতে হলে তাদের জনবল কাঠামো বৃদ্ধির পাশাপাশি অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এ ছাড়াও ব্যক্তিগত সচেতনতা ও হাইজিন/পরিচ্ছন্নতা মেনে না চলার কারণেও খাদ্য অনিরাপদ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। খাদ্য ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত প্রায় ২৫ লাখ ব্যক্তি ও ১৮ টি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়হীনতা নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনায় বড় একটি চ্যালেঞ্জ। আমরা জানি যে, সকলের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা আমাদের সাংবিধানিক অধিকারের সাথে সম্পর্কিত। তাই আমাদের নিরাপদ খাদ্য গবেষণা কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে। সেই সাথে খাদ্যমান মনিটরিং ব্যবস্থাপনারও জোরদার করতে হবে। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে কমিউনিটি এন্টারপ্রাইজ গড়ে তুলতে হবে।

আমরা জানি যে খাদ্যে ভেজাল আমাদের দেশে নতুন কোন বিষয় নয়, কারণ আমরা ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেদেরকে সৎ মনে করিনা এবং কোন কালেও সৎ ছিলামও না। আমরা ভেজালে অভ্যস্ত একটি জাতি। এখন এই দুর্ণাম আমাদের ঘুচাতে হবে। ভেজালমুক্ত নিরাপদ খাদ্য সবার জন্য নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য আমাদেরকে খাদ্যাভাসটাকে একটু পরিবর্তন করতে হবে। কারণ আমাদের খাদ্যাভাসের কারণেও আমরা সুষম পুষ্টিমান সমৃদ্ধ খাবার থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। অনেক সময় আমরা কোনরূপ বাছ-বিচার না করেই সুস্বাদু ও জনপ্রিয় খাবারগুলো অনায়াসেই গ্রহণ করছি। সেক্ষেত্রে  আমরা মনে করি খাবারটি খোলা অবস্থায় থাকলে অনিরাপদ এবং ঢাকা অবস্থায় থাকলে নিরাপদ। খাবারটি নিরাপদ কিনা তা নির্ভর করে মূলত খাদ্য উপাদানের উৎস, প্রস্তুতকালীন মান ও বিপণনকালীন ব্যবস্থাপনাসহ অন্যান্য আনুষাঙ্গিক বিষয়াদির উপর এবং তারপর আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে খাবারটি খোলা অবস্থায় বিক্রি হচ্ছে নাকি ঢাকা অবস্থায় বিক্রি হচ্ছে। স্বাদ ও গন্ধের উপর নির্ভর করে কখনো বিচার করা যাবে না যে খাবারটি নিরাপদ নাকি অনিরাপদ। আমরা প্রতিদিনই ভেজাল খাবার খাচ্ছি। শাক-সবজি, ফল-মূল, মাছ, মাংস, দুধ, গুড়, মসলা মরিচ কোন কিছুই ভেজালমুক্ত না। ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে শিশু ও গর্ভবর্তী মহিলারা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। এমনকি ভেজাল খাদ্যের প্রভাবে অনেক শিশুই বিকলাঙ্গও হয়ে পড়ছে। নিঃসন্দেহে এটি আমাদের জন্য একটি অশনি সংকেত। নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রীতে বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশানো সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের নিষেধজ্ঞা থাকলেও এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী দেশ ও জনগণের কথা চিন্তা না করেই অধিক মুনাফার লোভে খাদ্য দ্রব্যে বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশিয়ে সেগুলো বাজারজাত করছে। এসব অসাধু ব্যবসায়ীদের এখন লাগাম টেনে ধরতে হবে। সেজন্য সরকারকে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে আরও বাজেট বাড়াতে হবে। সেই সাথে খাদ্য নিরাপত্তা ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে আরও ব্যাপক হারে অর্থায়ন করতে হবে। যাতে করে এদেশের প্রতিটি মানুষ তিন বেলা পর্যাপ্ত পুষ্টিমান সমৃদ্ধ নিরাপদ খাবার খেতে পারে।
লেখক ঃ সংগঠক ও প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৭৫০-৫৩৪০২৮