সবার অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হোক

সবার অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হোক

রিপন আহসান ঋতু  : স্বাধীন বাংলাদেশে ১০টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে, এখন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুরুর পথে। জনগণের কৌতূহলের শেষ নেই আসন্ন নির্বাচন সম্পর্কে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সর্বমহলে এখন একটাই আলোচনা হচ্ছে অবাধ সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে তো? জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে রাজনীতির মাঠের উত্তাপ, রং, গতি দ্রুত বদলাচ্ছে। উত্তপ্ত হয়ে উঠছে রাজনৈতিক মাঠ। রাজনৈতিক নেতাদের যে বাকযুদ্ধ হয়েছে তাতে কঠিন ভোট যুদ্ধের আভাস দিচ্ছে। টেলিভিশনে টক শোর আলোচনার বিষয় এখন একটিই। কারণ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দেশে-বিদেশে বহু আলোচনা হয়েছে। সর্বজনস্বীকৃত হতে পারেনি ওই নির্বাচনটি। আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচন যাতে অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হতে পারে- এ ধরনের একটি আকাঙক্ষা তৈরি হয়েছে সর্বসাধারণের মাঝে। নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করে তুলতে হলে সরকারি দল ও সরকারবিরোধী দলগুলোকে সমান ভূমিকা রাখতে হয়। শুধু সরকার কিংবা নির্বাচন কমিশন স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন গ্রহণের মানসিকতা ব্যক্ত করলেই হয় না। এ ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোকে আন্তরিকভাবে নির্বাচনে টিকে থাকতে হয়। সাধারণত নির্বাচনের মাধ্যমে বা বৈধ উপায়ে শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সর্বাত্মক শক্তি প্রয়োগের চেষ্টা করে।

 আমাদের দেশেও এর ব্যতিক্রম হয় না। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য শুধু একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশনই যথেষ্ট নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা ও অবস্থানও এ ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা ও মতৈক্য ছাড়া গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান কঠিন। এ ক্ষেত্রে খুব স্বাভাবিকভাবেই সরকারি দলের দায়িত্ব অনেক বেশি থাকে। নির্বাচন কমিশনকে সরকারি দল তথা আওয়ামী লীগ যেভাবে মেনে নিয়েছে, তেমনি বিএনপিসহ অন্যান্য দলকেও স্থায়ীভাবে তা মেনে নেওয়ার মানসিকতা ব্যক্ত করা যুক্তিসংগত বলে মনে হয়। সবগুলো দলের গঠনমূলক মতামত নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমে সহায়তা করতে পারে। আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপিসহ যেকোনো দলই রাজনৈতিক গেম খেলার চেষ্টায় থাকলে রাজনীতির জন্য তা হবে চরম ভুল। নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে বেশি উচ্চবাচ্যের ইস্যু দেখা দিলে সাধারণের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো সম্পর্কে এক ধরনের অনীহা ও অনাস্থা তৈরি হবে। একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চর্চা এবং নির্বাচন-পদ্ধতির ওপর নাগরিকদের স্থায়ী আস্থা সৃষ্টির লক্ষ্যে স্বচ্ছ নির্বাচনই এখন সবার প্রত্যাশা। বিশেষ করে নির্বাচনী সংস্কৃতিকে অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে শুধু নির্বাচন কমিশন, সরকার কিংবা প্রশাসনের প্রভাবমুক্ত নয়; বরং রাজনৈতিক দলগুলোর গণতান্ত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার আস্থানির্ভর ক্ষেত্র তৈরিতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

 কেননা অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো, নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ প্রতিষ্ঠা বা মাঠ সমতল করা। এ দায়িত্ব সরকার ও নির্বাচন কমিশনের। বিশ্বের অধিকাংশ দেশে দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন হয়। আমাদের দেশে সমস্যা হলো, আমরা দল ও সরকারকে আলাদা করে দেখার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। নিয়ম হচ্ছে, দল দলের জায়গায় থাকবে; সরকার সরকারের জায়গায়। দল ও সরকার যদি এক হয়ে যায়, তাহলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে তা সামাল দেয়া কঠিন। এজন্য সবচেয়ে বেশি দরকার আইনের শাসন। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থা অনেকটাই স্বচ্ছ। ভারতে যে নির্বাচনগুলো হচ্ছে, তাতে নির্বাচন কমিশন প্রশাসনকেই কাজে লাগাচ্ছে। জেলা পর্যায়ের নির্বাচনে ডেপুটি কমিশনার হচ্ছেন প্রধান। ডেপুটি কমিশনার যখন নির্বাচন ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেন, তখন ভারতের কোনো রাজনৈতিক দল তাকে চ্যালেঞ্জ করে বলে না যে, সে নিরপেক্ষ নয়। প্রশ্ন হলো, ওখানে একজন ডেপুটি কমিশনার নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন পরিচালনা করতে পারছে, অথচ আমাদের এখানে কেন পারছে না? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।

নির্বাচন হলো জনগণের একদিনের গণতন্ত্রের উৎসব। জনগণের এই উৎসব তখনই সফল হবে যখন তারা নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তার পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারবেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জনগণের একদিনের এই গণতন্ত্র সত্যিকারে বাস্তবে রূপ পায় কি? রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা গুটি কয়েক সুযোগসন্ধানী সুবিধাভোগীদের ব্যক্তিগত হীনস্বার্থের কাছে তিন ‘গ’ (গণতন্ত্র, গণমাধ্যম ও গণমানুষ) আজ ভূলুণ্ঠিত। যারা দেশের সার্বিক অগ্রগতিকে করছে বাধাগ্রস্ত। রাজনৈতিক স্থিতিশীল পরিবেশের জন্য তাদের আগে চিহ্নিত করা জরুরি। বাস্তবতায় মনে হয়, আমরাই আমাদের অগ্রগতির পথে প্রধান অন্তরায়। কেননা আমরা ইতিবাচক দিকে না গিয়ে সর্বদা নেতিবাচক পথে হাঁটতে বেশি পছন্দ করি যা বহির্বিশ্বে এদেশের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। দেশ স্বাধীন হয়েছে ৪৭ বছর হলো, কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা একটি শক্তিশালী স্বাধীন নির্বাচন কমিশন তৈরি করতে পারিনি। লেবাসি গণতন্ত্র পরিহার করে উদার গণতন্ত্র ও সুশাসন নিশ্চিত করতে পারিনি। যখন যে সরকার ক্ষমতায় থেকেছে তারা তাদের মতো করে নির্বাচন ও প্রশাসন পরিচালনা করেছে, এই ইতিহাস পুরোনো নয়। যারা আজ ঢালাওভাবে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের ব্যর্থতার কথা বলছেন তাদের কাউকে যদি সেই পদে অধিষ্ঠিত করা হয় তারা কতোটুকু নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন সেই ব্যাপারে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।

 তাই সমালোচনা না করে আমাদের নিজেদের দুর্বলতা স্বীকার করে একটি শক্তিশালী স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন বাস্তবায়নে যা যা করণীয় সকলের সম্মিলিত উদ্যোগে সেই কাজগুলো আগে বাস্তবায়ন করতে হবে। নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতের ক্ষেত্রে যা অধিক জরুরি। যেহেতু সাংবিধানিকভাবে দলীয় সরকারের অধীনে ছাড়া নির্বাচনে যাবার কোন সুযোগ নেই। বাংলাদেশে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব যদি সরকারের সদিচ্ছা থাকে। যদি আমাদের মানসিকতা গণতন্ত্র, সুশাসনমনা হয় তাহলে নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী করে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা কঠিন কিছু নয়। তবে প্রশ্ন হল আমরা কি সে মানসিকতা লালন করি? সরকারের তরফ থেকে যতই দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠুর নিশ্চয়তা দেয়া হোক না কেন আসলে দেশবাসীকে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেয়া নির্বাচনকালীন সরকার ও নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা। কেননা এবারের নির্বাচনে মানসিকতা, বিদ্যা, যুক্তি, প্রযুক্তি সব দিকে এগিয়ে থাকা এক কোটি তরুণ ভোটার; যারা নিজেদের পছন্দের প্রার্থী বেছে নেবে। চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ করার পক্ষ, কোটা আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে আমরা তরুণদের জেগে ওঠার অনন্য রূপ দেখেছি।

এক কোটি তরুণ ভোটার অবশ্যই চাইবে একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে। তারা চাইবে না একতরফা নির্বাচনে ভোট কেন্দ্র দখল, জালভোট, খুন, সংঘর্ষে দেশ, গণতন্ত্র, সুশাসন পিছিয়ে যাক। তাই নির্বাচনকালীন সরকারের নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি রক্ষা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এক কোটি তরুণ ভোটাররা যারা জীবনের প্রথম ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে তারা যদি ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে না পারে তখন তাদের মনে যে ক্ষোভের জন্ম নেবে তা কখনো শুভ হবে না। সুতরাং এবারের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই তরুণদের কাছে টানা, দলে ভেড়ানো, তাদের চাওয়াকে প্রাধান্য দেয়া, আকৃষ্ট করা হবে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য বুদ্ধিমানের কাজ। দলীয় নির্বাচনী ইশতেহার তারুণ্যকে প্রাধান্য দেয়া এবং তরুণদের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হওয়াটা বড় চ্যালেঞ্জ। ভোটের রাজনীতিতে সবাই জিততে চায়। আমাদের রাজনীতি তথা নির্বাচনী সংস্কৃতিতে পরাজয় মেনে নেওয়ার মনোভাব কারো আছে বলে মনে হয় না। এ জন্যই ভোটের আগে-পরে কখনো কখনো কাউকে কাউকে অসহিষ্ণু হয়ে উঠতে দেখা যায়। এর প্রভাব পড়ে ভোটের রাজনীতিতে, ভোটার ও কর্মি-সমর্থকদের ওপর। এখন পর্যন্ত যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, একে অবশ্যই স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল বলা যেতে পারে। এই পরিস্থিতি বজায় রাখার দায়িত্ব সব রাজনৈতিক দলের।
 
নির্বাচন সামনে রেখে কোনোভাবেই পরিবেশ নষ্ট করা যাবে না। রাজনৈতিক কর্মসূচি হতে হবে জনবান্ধব। মানুষের কল্যাণেই রাজনীতি- এ কথাটি মাথায় রেখে সবাইকে কাজ করতে হবে। কোনো পক্ষই যেন অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে না পারে, সেদিকে সবাইকে তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখতে হবে। কোনো প্রকার বিঘœ ছাড়াই নির্বাচন অনুষ্ঠান হোক। সঠিক সময়ে সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানই দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। বর্তমান সংকট বস্তুত পারস্পরিক অনাস্থা থেকে উদ্ভুত। এ অনাস্থা দূর করতে হলে উভয়পক্ষকে একগুঁয়েমি পরিহার করতে হবে। ভাঙতে হবে অযৌক্তিক অনমনীয়তা। মনে রাখতে হবে, রাজনৈতিক আন্দোলন সহিংসতার রূপ নিলে তাতে একসময় তৃতীয় কোনো অরাজনৈতিক চক্র জড়িয়ে যাবে। তারা নানা ক্ষেত্রে নাশকতা সৃষ্টির সুযোগ খুঁজবে। রাজনৈতিক দলের কর্মসূচির আড়ালে নাশকতা ঘটাবে ওই চক্র। দেশ ও জনগণের স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচন নিয়ে সংঘাতের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নির্বাচনে সব দলের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করে একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে দেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছার বিকল্প নেই। আমরা একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখতে চাই। রাজনৈতিক দলগুলোর ইতিবাচক মনোভাবের প্রতিফলন দেখতে চাই। রাজনৈতিক সহিংসতা নয়, সহিষ্ণুতার পরিচয় প্রতিফলিত হোক একাদশ নির্বাচনে। নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় নিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক মনোভাবের মাধ্যমে যাতে দায়িত্বশীল আচরণ করতে পারে, সে জন্য সরকারি দলকেই অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সংগঠক
০১৭১৭-৪৯৬৮০৩