সফল আম চাষী অধ্যক্ষ জয়নাল আবেদীন

সফল আম চাষী অধ্যক্ষ জয়নাল আবেদীন

আজহারুল আজাদ জুয়েল : ছিলেন শিক্ষক। হয়েছেন চাষী।  জীবনের দীর্ঘ সময় শিক্ষকতায় কাটিয়ে জয়নাল আবেদীন এখন পুরোদস্তুর চাষী। বিশেষ করে আম চাষের সাফল্য গাঁথা নিয়ে এখন নিয়ে গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন বড় আম বাগান। দিনাজপুরবাসীকে উপহার দিতে চাইছেন নতুন কিছু উদ্ভাবন। এলাকায় সাধারণের চেয়ে তিনি এখন ভিন্ন মানুষ। জয়নাল আবেদীন দিনাজপুরের পরিচিত মুখ। সাধারণভাবে ‘জয়নাল স্যার’ হিসেবে বেশি পরিচিত। তিনি সংগীতের মানুষ। মাস্টার্সও করেছেন সঙ্গীতের উপর। হারমনিয়ম, পিয়ানো সবই বাজাতে পারেন। একজন সেতারিষ্টও। সেতার বাজান স্বাচ্ছন্দতার সাথে।  এখন তিনি কৃষি নিয়ে যেমন ব্যস্ত আছেন, তেমনি বিশ^ ভারতীর অধীনে আনকমন একটি বিষয় নিয়ে গবেষণা করছেন। গবেষণার বিষয় : “ডড়ৎষফং ফরভভবৎবহঃ পড়ঁহঃৎরবং হধঃরড়হধষ ধহঃযবস : ঞযব ৎড়ষব ড়ভ ঢ়ধঃৎরড়ঃরপ ংড়হমং ড়হ ঃযব বাব ড়ভ ভৎববফড়স ড়ভ ওহফরধ ধহফ ইধহমষধফবংয. ঈড়সঢ়ধৎবঃরাব ংঃঁফু ড়ভ হধঃরড়হধষ ধহঃযবস ধহফ ঢ়ধঃৎরড়ঃরপ ংড়হম.” এর বাংলা হলো “পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের জাতীয় সংগীত : ভারত এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতায় জাতীয় সঙ্গীতের ভূমিকা, জাতীয় সঙ্গীত ও দেশাত্ববোধক গানের তুলনামূলক আলোচনা।”

গবেষণা করতে গিয়ে তিনি ভারত, শ্রীলংকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের জাতীয় সংগীত কন্ঠস্থ করেছেন। জয়নাল আবেদীন শিক্ষকতা করেছেন দীর্ঘ ২৭ বছর। এর মধ্যে ২২ বছরের বেশি সময় ধরে দিনাজপুর সংগীত মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ছিলেন। যখন শিক্ষকতায় ছিলেন তখন গ্রামের নিজস্ব আবাদী জমিতে কৃষির নানান বিষয় নিয়ে এক ধরনের কৃষি গবেষণায় সম্পৃক্ত করেছিলেন নিজেকে। দিনাজপুর সদর উপজেলার শেখপুরা ইউনিয়নের দীঘনে তার গ্রামের বাড়ি। এই গ্রামে ১৯৮৫ সালে উচ্চ ফলনশীল কার্ডিনাল আলু আবাদ করেছিলেন যা এলাকায় তখনো কেউ করেন নাই। সেই সময় শতক প্রতি আড়াই মণ আলু উৎপাদনের রেকর্ড তৈরী করেন। তার দেখাদেখি গ্রামের অনেকে কার্ডিনাল আলু আবাদ করে আর্থিকভাবে লাভবান হন। সফল আলু চাষের পর ১৯৮৬ সালে সাগর কলা আবাদ করেন অধ্যক্ষ জয়নাল। কলা আবাদেও সফল হন। ১৯৮৮-৮৯ সালে দীঘনের মানুষ গাজর কি জিনিষ জানত না। কিন্তু ঐ সময় ঐ এলাকায় গাজর চাষ করে কৃষকের মধ্যে নতুন ফসল আবাদে উৎসাহী করে তোলেন। এভাবে চাষাবাদে বৈচিত্র্য সৃষ্টি করেন তার নিজ গ্রামসহ আশো-পাশের এলাকায়। জয়নাল আবেদীন ২০০৮ সালে দিনাজপুর সংগীত কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব ছেড়ে দেন এবং সেই সময় থেকে পুরোদস্তুর কৃষি পেশায় যুক্ত হয়ে পড়েন। তিনি দীঘনে মহারাজার খননকৃত ঝাড়–য়া দিঘীতে মাছ চাষ করেন। মাছ চাষেও সফল হন এবং মৎস্য চাষী হিসেবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। মৎস্য চাষের সাথে সাথে ঝারুয়া দিঘী এবং তার মালিকানাধীন একাধিক দিঘীর পাড়ের চতুর্দিকে আম গাছ, লিচু গাছসহ বিভিন্ন গাছ লাগিয়ে বিভিন্ন ফলের বাগান গড়ে তোলেন। প্রায় ২০ বছর ধরে আম চাষের সফলতার কারণে এখন তিনি আম বাগান সম্প্রসারণের দিকে মনোযোগী হয়েছেন।  

দীঘনের ঝারুয়া দিঘীসহ তার নিজস্ব মালিকানাধীন জমিতে এখন সাড়ে ছয় শত ফলবান আম গাছ রয়েছে। এর মধ্যে ১৫১টি গাছ ২০ বছর বয়সী। এইসব গাছের মধ্যে ৮৩টি গাছে এবার বিপুল পরিমাণ আম ধরেছে। প্রায় ৫শত আম গাছ হলো আড়াই বছর বয়সী। এইসব গাছ ছোট হলেও প্রচুর আম ধরেছে এবার। এইসব আম গাছের প্রায় সবগুলোই আ¤্রপালি জাতের। আমের ফলন বেশি এবং সাইজ ও চেহারা সুন্দর হওয়ায় ভোক্তা পর্যায়ে আমগুলোর প্রচুর চাহিদা রয়েছে। জয়নাল আবেদীন জানালেন, এবার তিনি আমগুলো আগাম বিক্রি করে দিয়েছেন সাত লাখ টাকায়। জয়নাল আবেদীনের আম বাগানের নাম ছড়িয়েছে বিভিন্ন স্থানে।

অধ্যক্ষ জয়নালের আম বাগানের বেশির ভাগ গাছ আ¤্রপালি। তিনি ১০ হাজার আ¤্রপালি আমের চারা তৈরী করেছেন। তার চেষ্টা রয়েছে ১২ মাসি আম গাছ লাগানোর। এ জন্য প্রয়োজনীয় উন্নত চারা উৎপাদনের চেষ্টায় আছেন তিনি। তিনি বলেন, মাঝে মাঝে ১২ মাসি আম গাছের কথা শুনি। কিন্তু দিনাজপুরের মানুষ বাস্তবে সেই গাছগুলোর সাথে পরিচিত নয়। আমি আশা করছি যে, আমি নতুন যে উদ্যোগ নিয়েছি, তাতে করে দিনাজপুর জেলার মানুষ আমার মাধ্যমেই ১২ মাস আম খেতে পাবেন। এটা এই জেলার মানুষের জন্য একটা চমক হবে। একজন শিক্ষক থেকে সফল আম চাষীতে পরিণত হওয়া জয়নাল আবেদীন বলেন, সব কিছু নিয়েই গবেষণা করা যায়। গবেষণার কারণেই বাংলাদেশ এখন খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। গবেষণার কারণে আম, লিচুসহ বিভিন্ন ফলের উন্নত জাত বেরিয়েছে। তাই আমি মনে করি, কৃষি সেক্টরকে আরো উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে নতুন নতুন ভাবনা নিয়ে। আমি আমার এলাকায় সে-রকমটাই করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
লেখক ঃ সাংবাদিক-কলামিস্ট
[email protected]
০১৭১৬-৩৩৪৬৯০, ০১৯০২-০২৯০৯৭