সকল নুসরাতের বিচার এভাবেই হোক

সকল নুসরাতের বিচার এভাবেই হোক

মীর আব্দুল আলীম  : ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান (রাফি) হত্যা মামলার রায়ে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ ১৬ জনের মৃত্যুদন্ড দিয়েছেন আদালত। এ রায় প্রশংসিত হয়েছে। গত ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে নুসরাতের শ্লীলতাহানি করেন। এ ঘটনায় তাঁর মা শিরিনা আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী থানায় মামলা করলে অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মামলা তুলে না নেওয়ায় ৬ এপ্রিল মাদ্রাসার প্রশাসনিক ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয় বোরকা পরা পাঁচ দুর্বৃত্ত। ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অগ্নিদগ্ধ নুসরাতের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী দ্রুত বিচারের নির্দেশ দিয়েছেন।

 প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ এবং গণমাধ্যম সোচ্চার ছিলো বলেই দ্রুত সময়ে ৭ মাসের মধ্যে নুসরাত হত্যার বিচার হলো। যেখানে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ নেই, গণমাধ্যম সোচ্চার হয়না, যেসব ঘটনা ফেসবুকে ভাইরাল হয়না সেসব বিচারের খবর আমরা কজন রাখি? দেশে নারী নির্যাতন, শ্লীলতাহানী, ধর্ষণ, গণধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর খুনের ঘটনা বেড়েই চলেছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি এ ধরনের অপরাধ বাড়ার মূল কারণ। নুসরাত হত্যার রায় এবং এভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে নারীর প্রতি সহিংসতা কমে আসতো। মূূলত নারীর প্রতি অবিচারের ঘটনা বৃদ্ধির বিষয় স্পষ্ট দিক হলো আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্রমাগত ব্যর্থতা। দেশে প্রতিদিন গড়ে ১৮ বছরের কম বয়সী এক দশমিক সাত শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। সাম্প্রতিকালের এমন জরিপই বলে দেয়, দেশে ১৮ উর্ধ্ব নারী ধর্ষণ আর নির্যাতনের পরিমাণ কত।

সমাজে নিত্যই ব্যভিচার ও ধর্ষণকামিতার ঘটনা ঘটছে। রোধ হচ্ছে না। ধর্ষিত হচ্ছে ছাত্রী, শিশু, যুবতী, আয়া, বুয়া, গৃহবধূ। রাস্তা ঘাটে, রেস্তোরাঁয়, চলন্ত বাসে, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে, গৃহে ঘটছে এই পৈশাচিক ঘটনা। কোথাও আজ নারীরা নিরাপদ নয়। আমাদের নারী, শিশুরা যৌন নির্যাতন এমনকি ধর্ষণের পর খুন হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে থাকছে না বয়স, স্থান, কাল, পাত্রের ভেদ। দেশব্যাপী শুরু হয়েছে ব্যভিচারের চূড়ান্ত প্রকাশ্য ধর্ষণকামিতা। রাত-বিরাতে নয় শুধু, দিনদুপুরে প্রকাশ্য ধর্ষণের ঘটনাও ঘটছে। শুধু ধর্ষণই নয়, রীতিমতো গণধর্ষণ হচ্ছে।

কিছু মানুষরূপী নরপশু সভ্যতার ভাবধারাকে পাল্টে দিতে হায়েনার নখ মেলে বসেছে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় না বললেই চলে। আর শাস্তি না হওয়ার পরিণতিতে বাংলাদেশে ধর্ষণ, নির্যাতন, অতঃপর হত্যার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। নারী ধর্ষণের পাশাপাশি ইদানীং শিশু ধর্ষণ এমনকি গণধর্ষণের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। একেকটি ঘটনা ঘটার পর কিছুদিন মিছিল, মিটিং, আন্দোলন, প্রতিবাদসভা হয়। দেশ স্?রব হয়। কিছু দিন পরই সব থেমে যায়। থেমে যায় প্রতিবাদের ঝড়। কিন্তু থামে না শুধু নির্যাতিত নারীর কান্না। সাম্প্রতিকালের গুলশানের গণধর্ষণের ঘটনাটিও একদিন হয়তো টাকার চাপে থমকে যাবে। ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধির বিষয় স্পষ্ট দিক হলো আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্রমাগত ব্যর্থতা। বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রশ্রয় পেলে এ ধরনের অপরাধতো ফেঁপে উঠবেই।

যৌন হয়রানি শুধু নারী, শিশুর বিরুদ্ধে নয়, মানবতার বিরুদ্ধে চরম অপরাধ। খুন, ধর্ষণ আজকাল এই আধুনিক পৃথিবীর নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হলেও আমাদের দেশে এর মাত্রা যেন সব বিচিত্রতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞকদের মতে, ধর্ষণের এই ব্যাপকতার পিছনের অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে, ইসলামী মূল্যবোধ মেনে না চলা এবং অপরাধীর শাস্তি-না পাওয়া। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নির্লিপ্ততা ও তাদের তৎপরতাও দায়ী। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে যথেষ্ট শক্তিশালী আইন থাকা সত্ত্বেও নির্যাতনকারীরা বিভিন্ন উপায়ে পার পেয়ে যায়। বাংলাদেশের আইন ভারতের চেয়েও শক্তিশালী। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর ৯(১) ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো পুরুষ কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে তবে সে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত হবে। একই আইনের ৯ (২) ধারায় আছে, ‘ধর্ষণ বা ধর্ষণ পরবর্তী কার্যকলাপের ফলে ধর্ষিত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটলে ধর্ষকের মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ড হবে।’ একই সঙ্গে জরিমানার কথাও আছে। সর্বনিম্ন জরিমানা ১ লাখ টাকা। ৯ (৩) ধারায় আছে, ‘যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে এবং উক্ত ধর্ষণের ফলে কোনো নারী বা শিশু মারা যায় তাহলে প্রত্যেকের যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা মৃত্যুদন্ড, কমপক্ষে ১ লাখ টাকা জরিমানা হবে’। ভারতে এক্ষেত্রে শুধু যাবজ্জীবনের কথা বলা আছে। মহিলা আইনজীবী সমিতির এক জরিপে জানা যায়, নানা কারণে ধর্ষণ মামলার ৯০ শতাংশ আসামী খালাস পেয়ে থাকে। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে ‘প্রশাসনে দলীয় লোক থাকার কারণে এসব ঘটনার অপরাধীরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় পার পেয়ে যাওয়ার আরেক কারণ। এছাড়া ফৌজদারি আইনের দুর্বলতার কারণে অপরাধীর উপযুক্ত শাস্তি- হয় না। এ বিষয়ে ‘জনগণের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই এরা শাস্তি- পাবে।’ শুধুমাত্র আইন প্রয়োগের অভাবে এখানে ধর্ষণ মহামারী রূপ নিয়েছে।

এদেশে ধর্ষণের পাকাপোক্ত আইন আছে ঠিকই কিন্তু আইনকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। আইনের যারা প্রয়োগ করবেন তারা ওই আইনের পথে হাঁটেন না। কখনো অর্থের লোভ কখনোবা হুমকি ধমকিতে শুরুতেই গলদ দেখা দেয়। মামলার চার্জশিট গঠনের সময় ফাঁক ফোকর থেকে যায়। তাই শেষে রায়ে ধর্ষিত কিংবা নির্যাতনের শিকার লোকজন সঠিক বিচার থেকে বঞ্চিত হন। ধর্ষণ যেহেতু মস্ত- অপরাধ এসব মামলাগুলোর ক্ষেত্রে চার্জশিট গঠনের সময় কোন ম্যাজিষ্ট্রেট অথবা পুলিশের কোন পদস্থ কর্মকর্তার নজরদারিতে করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে চুড়ান্ত রিপোর্টের  সময় ভিক্টিমের সাক্ষাত গ্রহণ করা যেতে পারে। তাতে করে গোপনে চার্জশীট দাখিলের ফলে যে জটিলতা তৈরি হয় তা কমে আসবে।

প্রশ্ন হলো, ধর্ষণ রোধের উপায় কি? দেশে এত ধর্ষণ হচ্ছে কেন? এ প্রশ্নের উত্তরে অনেকেই বলেন- ভাল মেয়েরা ধর্ষণের শিকার হয় না ; পোশাকের সমস্যার কারণে মেয়েরা ধর্ষিত হয়। অনেকে আবার বলেন বেহায়াপনা করে স্বল্প কাপড়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়ালে ধর্ষণ হবে না তো কি হবে? আর কোন আলেম বলবেন- ‘পর্দা প্রথায় ফিরে আসলে ধর্ষণ আর হবে না।’ আবার অনেকে বলবেন- ‘কঠোর শাস্তি দিলে ধর্ষণ কমবে।’ আমি এসব কোনটার পক্ষেই নই। সেই মক্কা-মদিনায়র আরব দেশে পর্দা মানা হয় সেখানেও তো ভুরি ভুরি ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। তাদের শাস্তি- প্রকাশ্য শিরচ্ছেদ।

 কৈ সেখানেও তো ধর্ষণ বন্ধ হচ্ছে না। আমাদের দেশ থেকে যেসব অসহায় নারী আরব দেশে যান তাদের অনেকেইতো দেশে অক্ষত ফিরে আসতে পারেন না। তারা কোন না কোন ভাবে নারী নির্যাতনের শিকার হনই। আমাদের দেশের নারী শ্রমিকরা আরব দেশে গিয়ে পর্দায় থেকেও কেন যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন? যৌন নির্যাতন বন্ধে আগে মানসিকতা বদলাতে হবে। নারী দেখলেই কেন ধর্ষণ করতে হবে? সব দোষ নারীর? সব দোষ পোশাকের? এমন মানসিকতা কেন আমাদের। ধর্মে নারীকে পর্দা করতে বললেও পুরুষদেরও চোখ অবনত রাখতে বলা বয়েছে। তবে শুধু নারীর দোষ কেন? নারীর রুপ যৌবন পুরুষকে মোহিত করবে সেটাই স্বাভাবিক। তাই বলে তার উপর পশুর মতো ঝাঁপিয়ে হতে হবে কেন? ধর্ষণ কমাতে হলে আগে পুরুষের মাঝে মানবিক গুণাবলী জাগ্রত করতে হবে।

ধর্ষণ রোধে আমাদের সচেতন হতে হবে। অবাধ মেলামেশার সুযোগ, লোভ-লালসা-নেশা, উচ্চাভিলাষ, সংস্কৃতির নামে অশ্লীল নাচ-গান, যৌন সুড়সুড়িমূলক বই-ম্যাগাজিন, অশ্লিল নাটক-সিনেমা ইত্যাদি কামোত্তেজনা মানুষকে প্রবলভাবে ব্যভিচারে প্ররোচিত করে তা বর্জন করতে হবে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সময় মত বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষা ও যৌন শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। বাজে সঙ্গ ও নেশা বর্জন করতে হবে। প্রবল কামোত্তেজনা মানুষকে পশুতুল্য করে ফেলে। ব্যাপকভাবে কামোত্তেজনা সৃষ্টিকারী উপকরণগুলোর কাছাকাছি চলে গেলে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের আর কোনো উপায়ই থাকে না।

ধর্ষণের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে হলে কেবল আইনের কঠোর প্রয়োগও কোনো কাজ হবে না। এর জন্য প্রয়োজন জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে যার যার পারিবারিক বলয়ে ধর্মানুশীলনে একনিষ্ঠতা, অশ্লীল সংস্কৃতিচর্চার পরিবর্তে শিক্ষণীয় বিনোদনমূলক ও শালীন সংস্কৃতি চর্চার প্রচলন নিশ্চিতকরণ। আর এটা করতে হলে কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতা, আইনের শাসন প্রয়োগ করলেই চলবে না, সমাজের সর্বস্তরের মানুষ যার যার অবস্থানে থেকে স্কুল-কলেজ মাদরাসা-মক্তব-মসজিদ-মন্দির-গির্জা-প্যাগোডার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা সমাজের অন্য বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীদের সমন্বয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সর্Ÿোপরি কঠোর শাস্তির বিধান ও প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। নারীকে মর্যাদার আসনে বসাতে হবে। পর নারীকে কখনো মা, কখনো বোন, কখনোবা মেয়ে ভাবতে হবে। তাদের উপর লোলুপ দৃষ্টি নয়; মায়ামমতার দৃষ্টি দিতে হবে। তবেই ধর্ষণ কমে আসবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সম্পাদক  
নিউজ-বাংলাদেশ ডটকম,
[email protected]  
০১৭১৩-৩৩৪৬৪৮