সংকট কি সমাধানের মুখ দেখবে?

সংকট কি সমাধানের মুখ দেখবে?

বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাস বেশি দিনের নয়। তাই বলার মতো ইতিহাসও নেই। অন্য দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের তুলনায় বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাস অনেকটাই মলিন। তবে দেশের ক্রিকেটে যতকুটু অর্জন তার বেশিরভাগই গত ৫-৬ বছরের। বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের নাম ছড়িয়েছে আপন মহিমায়। বাংলাদেশকে যোগ্য প্রতিপক্ষ হিসেবে ভাবতে বাধ্য করেছেন সাকিব-তামিম-মুশফিকরা। সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন মাশরাফি।


তবে সম্প্রতি দেশের ক্রিকেটে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। ১১ দফা দাবিতে সিনিয়র খেলোয়াড়সহ সব ক্রিকেটার ক্রিকেট কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদের সরিয়ে রেখেছেন। তবে ক্রিকেটাররা যে এমনভাবে ক্ষোভ জানাবেন, তা কল্পনাও করতে পারেনি ক্রিকেট বোর্ড।

মূলত ঘরোয়া ক্রিকেটের কাঠামো সংস্কারের দাবিকে ঘিরেই সোমবার (২১ অক্টোবর) থেকে ধর্মঘট করেছেন ক্রিকেটাররা। কিন্তু মঙ্গলবার (২২ অক্টোবর) সংবাদ সম্মেলনে ক্রিকেটারদের এ দাবিগুলোকে ‘অযৌক্তিক’ বললেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন।

তবে ‘অযৌক্তিক’ বলার চেয়ে সংবাদ সম্মেলনে সবচেয়ে বেশি ‘নজর’ কেড়েছে পাপনের বাচনভঙ্গি।অনেকে বলছেন, তিনি ক্রিকেটারদের রীতিমতো অপমান করেই কথা বলেছেন। যদিও সংবাদ সম্মেলনে তিনি ক্রিকেটারদের দাবি দেওয়ার বিপক্ষেও কোনো যৌক্তিক কারণ তুলে ধরতে পারেননি।

দেশের প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ক্রিকেটারদের ম্যাচ ফি’র অংক ৩০-৪০ হাজার টাকা। পাশাপাশি তারা যে ধরনের গাড়িতে যাতায়াত করেন তা প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটার হিসেবে পাওয়ার কথা না। যে ধরনের হোটেলে রাখা হয়, সেটা তাদের জন্য যথেষ্ট নয়। কিন্তু এ বিষয় নিয়ে কোনো ধরনের মন্তব্য করেননি বিসিবি সভাপতি। নিম্নমানের বল দিয়ে খেলা হয় ঘরোয়া ক্রিকেট। কিন্তু কেন এ ধরনের বল দিয়ে খেলা হয়? এর কোনো উত্তর দেননি তিনি।

কোয়াবের ভূমিকা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। ক্রিকেটারদের সুযোগ-সুবিধাগুলো বোর্ডের কাছে উপস্থাপন করার মতো নেই কেউ। বিসিবিও এ ব্যাপারে উদাসীন। কোয়াব প্রসঙ্গে পাপনের মন্তব্য, কোয়াব বিসিবির অংশ নয়। এটা কি দায় এড়ানো উত্তর কি-না, সেটা সংবাদ সম্মেলনস্থলেই আলোচনা তোলে।

তবে বিসিবি সভাপতি সংবাদ সম্মেলনে যে কথাটি বারবার বলেছেন, সেটা হলো টাকার কারণেই ক্রিকেটাররা এমন করেছে, এটা তিনি বিশ্বাস করতে চান না। কিন্তু ঘরোয়া ক্রিকেটে কি আসলেই ক্রিকেটাররা তাদের যোগ্য পারিশ্রমিক পাচ্ছেন কি-না সেটা দেখা প্রয়োজন।

বিসিবির বার্ষিক বাজেটে এবার প্রায় ৫৫ কোটি টাকা লাভ হয়েছে। এটা বিসিবি সভাপতি নিজেই জানিয়েছেন। তবে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে বরাদ্দের দাবি কি এ লাভের তুলনায় খুব বেশি? ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক তো এমনিতেই বেড়ে যাওয়ার কথা।

ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত ক্রিকেটার মোশাররফ হোসেন রুবেলকে চিকিৎসা বাবদ ১৫ লাখ টাকা দিয়েছে বিসিবি। অপারেশনের টাকা রুবেল একা বহন করলেও কেমোথেরাপির জন্য প্রয়োজন প্রায় দেড় কোটি টাকা। যে বোর্ডের বাজেটে লাভ ৫৫ কোটি টাকা সেখানে ১৫ লাখ টাকা তো খুবই সামান্য।

ক্রিকেটে বোর্ডের পরিচালক হয়ে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক দলের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বোর্ডের পরিচালকরা। অন্য কোনো লিগে ক্রিকেট বোর্ডের কোনো কর্মকর্তাকেই এ ধরনের ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক দলের সঙ্গে যুক্ত হতে দেখা যায় না। অথচ দেশীয় ক্রিকেটাররা অল্প টাকা পারিশ্রমিক পাচ্ছেন। লাভবান হচ্ছে বিসিবি।

ঢাকার বাইরে ক্রিকেটের অবস্থা আরও করুণ। শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক বলে আর ক্রিকেটে সাফল্য আছে বলেই অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি কোথাও। কারও চোখেও পড়ে না। না হলে কেন পাইপলাইনে এখনো ক্রিকেটার সংকটে ভুগতে হয়। সাকিব-তামিম ছাড়া লড়াই করাটা কঠিন হয় বাংলাদেশের জন্য।

ঘরোয়া ক্রিকেটের উন্নয়ন হলেই দেশের ক্রিকেটের উন্নয়ন হবে। সাকিব-তামিমদের ধর্মঘটটা সেজন্যই ডাকা। আর তাদের দাবি দাওয়াগুলো যে যৌক্তিক সেটা বোর্ড সভাপতির কথা বলার ধরনেই স্পষ্ট হয়। সংবাদ সম্মেলনে এ প্রসঙ্গে কথা বলার চেয়ে ক্রিকেটারদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশেই ব্যস্ত ছিলেন সভাপতি। তার এই ক্ষোভ প্রকাশের ধরনেই প্রশ্ন জাগে, সংকট কি আদৌ সমাধানের মুখ দেখবে?