শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্য কাম্য নয়

শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্য কাম্য নয়

রায়হান আহমেদ তপাদার : রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে এবং লোকজনের নেতিবাচক কথা শুনে সন্তানের ক্ষুধা মেটাতে বছরের পর বছর বিভিন্ন খাতে শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশের নারী। কিন্তু পুরুষ শ্রমিকের সমান এমনকি কিছু ক্ষেত্রে তার চেয়ে বেশি শ্রম দিয়েও একজন নারী শ্রমিক পুরুষ শ্রমিকের চেয়ে কম বা পুরুষ শ্রমিকের মোট পারিশ্রমিকের অর্ধেক টাকা পাচ্ছেন। দুঃখজনক হলেও কর্মক্ষেত্রে পুরুষ শ্রমিকরা যেখানে মোট কর্মঘণ্টার এক থেকে দেড় ঘণ্টা কম কাজ করেন সেখানে নারী শ্রমিকরা খাওয়ার সময় বাদে বিশ্রামের সুযোগও পান না। বাচ্চাদের কোলে নিয়ে বহু নারী শ্রমিককে কাজ করতে দেখা যায়। এমনকি নারীরা নির্ধারিত কর্মঘণ্টার বাইরে অতিরিক্ত কাজ করলেও তার মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আর নারী শ্রমিকরা তাদের প্রতি হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই মালিক পক্ষের লোকজন তাদের কাজ থেকে তাড়িয়ে দেন বা হুমকি দেন। খোঁজ  নিয়ে জানা যায়, ইটভাটা, পোশাক শিল্প, কৃষিকাজ, গৃহশ্রম, নির্মাণ খাত ও চাতালের কাজসহ অপ্রাতিষ্ঠানিক কোনো কাজেই নারীরা পুরুষের সমান মজুরি পান না। একজন পুরুষ দিনমজুর যেখানে গড়ে ৩০০ টাকা করে পান সেখানে নারী শ্রমিক পান ২০০ থেকে ২২০ টাকা। বিশেষ করে নিম্নআয়ের নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এ বৈষম্য আরও বেশি। ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ ও স্টেপস টুয়ার্ডস ডেভেলপমেন্টের যৌথ এক গবেষণাপত্র নারীর জন্য অর্থনৈতিক ন্যায্যতা’ থেকে জানা যায়, নারীরা একই রকমের কাজের জন্য পুরুষের তুলনায় কম মজুরি পেয়ে থাকেন। শুধু ঢাকাতেই নয় সারা দেশজুড়ে এমন বৈষম্য লক্ষণীয়।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় নারীরা ব্যাপকভাবে বিভিন্ন কাজে নিযুক্ত হচ্ছেন। তারা ইট ভাঙা থেকে শুরু করে চাতাল শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন এবং প্রতিটি কাজেই তারা ব্যক্তিগত দক্ষতার প্রমাণ রাখতে সমর্থ হচ্ছেন। ফলে নারী শ্রমিকদের চাহিদা দিন দিনই বাড়ছে। এলাকায় পুরুষ শ্রমিকের অভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পুরুষ শ্রমিকদের অনেকেই জেলার বাইরে গিয়ে বেশি মজুরিতে কাজ করছেন। ফলে এলাকায় সবসময়ই শ্রমিকের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এছাড়া সামগ্রিকভাবে এলাকায় শ্রমিকের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। অনেকেই দিনমজুরি বাদ দিয়ে নিজেরাই ছোটখাটো ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করেছেন। ফলে কাজের মৌসুমে চাইলেই শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি উচ্চ মজুরি দিলেও অনেক সময় শ্রমিক পাওয়া যায় না। এলাকার অনেকেই আছেন, যারা রাজধানী বা অন্যান্য বিভাগীয় শহরে গিয়ে রিকশা বা ভ্যান গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। এটা তাদের জন্য স্ফীত আয়বর্ধক বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। পারিবারিক প্রয়োজনে মহিলারা এখন বেশি হারে ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসছেন। তারা নানা পেশায় নিজেদের যুক্ত করছেন। এমনকি একসময় যেসব পেশা শুধু পুরুষের জন্য নির্ধারিত ছিল এখন মহিলারাও সেই পেশায় আসতে শুরু করেছেন। কিন্তু মহিলা শ্রমিকরা নানাভাবে শ্রম শোষণের শিকার হচ্ছেন। তাদের অধিক সময় কাজ করিয়ে নিলেও মজুরির ক্ষেত্রে বৈষম্য সৃষ্টি করা হচ্ছে। একজন পুরুষ শ্রমিক কোনো কাজ করে যে মজুরি পান মহিলা শ্রমিকরা তার চেয়ে অনেক কম মজুরি পান।

উল্লেখ্য, এ ব্যাপারে তারা কোনো ধরনের প্রতিবাদ করলে কর্মচ্যুতিসহ নানা ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা তাদের বিরুদ্ধে গ্রহণ করা হয়। ফলে মহিলা শ্রমিকরা এসব অনাচার নীরবে সহ্য করে যাচ্ছেন। তারা কোনো আইনি প্রতিকার পাচ্ছেন না। কোনো কোনো এনজিও মহিলাদের আইনি অধিকার নিয়ে কাজ করলেও এক্ষেত্রে তারা অনেকটাই নীরব। এছাড়া মহিলা শ্রমিকরা প্রায়ই কর্মক্ষেত্রে পুরুষ শ্রমিক অথবা কর্মদাতার দ্বারা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এতে মহিলা শ্রমিকরা ক্রমে হতাশ হয়ে পড়ছেন। কিন্তু জেলা প্রশাসন বা অন্য কোনো রাষ্ট্রীয় সংস্থা তাদের ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছে না। একজন সরকারি কর্মকর্তা বলেন, মহিলা শ্রমিকরা নানাভাবে কর্মক্ষেত্রে হয়রানি এবং বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন, এটা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু তারা কখনও এ ব্যাপারে কোনো অভিযোগ দায়ের করেন না। ফলে প্রশাসনের পক্ষে চাইলেও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। তিনি আরও বলেন, নারী এবং পুরুষ শ্রমিক যদি একই নেচারের কাজ করেন, তাহলে তাদের মজুরি প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বৈষম্য করা ঠিক নয়। নারী শ্রমিকদের প্রতি যে বৈষম্য, তা গোটা দেশের সমস্যা। বাংলাদেশের প্রতিটি সেক্টরেই নারী শ্রমিকরা নানাভাবে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এটা কোনোভাবেই দূর করা যাচ্ছে না। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও এ ব্যাপারে নারীদের প্রতিকূলে। সমাজ মনে করে, নারীরা ঘরে বসে থাকবে, তারা কেন পুরুষের মতো বাইরে কাজ করতে যাবে? বাইরে কাজ করা তাদের সাজে না।

কিন্তু সময়ের প্রেক্ষিতে বাস্তবতার নিরিখে মহিলাদের ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে হচ্ছে। তারা নানা ধরনের পেশায় নিজেদের যুক্ত করছেন। একসময় যেসব পেশা শুধু পুরুষ শ্রমিকদের জন্য নির্ধারিত ছিল; মনে করা হতো, এসব কঠিন কাজ মেয়েরা করতে পারবে না তা-ও এখন মহিলারা করছেন। শুধু কাজ করছেন তা-ই নয়, তারা ক্ষেত্রবিশেষে পুরুষের চেয়েও ভালো করছেন। তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের প্রায় ৯০ শতাংশই মহিলা শ্রমিক। তাদের তুলনামূলক কম মজুরি দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান ব্যতীত অধিকাংশ ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানেই মহিলা শ্রমিকরা মজুরি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। কিন্তু তারা কোনো প্রতিবাদ করতে পারছেন না। মহিলারা প্রাতিষ্ঠানিক সেক্টর ছাড়াও নানা ধরনের অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন। তারা সেখানে শ্রম শোষণের শিকার হচ্ছেন। উপরন্তু তাদের কাজের কোনো স্বীকৃতিও তারা পাচ্ছেন না।জাতীয় অর্থনীতিতে মহিলাদের কাজের আর্থিক মূল্যায়ন যোগ হচ্ছে না। তারা বাড়িতে সন্তান পালন, রান্নাবান্না এবং অন্যান্য যেসব গৃহকর্ম করে থাকেন, তা জিডিপির হিসাবে যোগ করা হয় না। যদিও অনেক দিন ধরেই মহল বিশেষ মহিলাদের কাজের আর্থিক মূল্যায়ন জিডিপিতে অন্তর্ভুক্তির দাবি জানিয়ে আসছে। এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের মহিলারা প্রতিদিন বাড়িতে যে কঠোর পরিশ্রম করেন, তা যদি জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হতো তাহলে জিডিপির আকার আরও অনেক বড় হতে পারত। বাংলাদেশের মহিলারা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে যে কাজ করেন তার আর্থিক মূল্য জিডিপির প্রায় ৭৬ শতাংশের মতো।

অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের মতে, মহিলাদের কাজের আর্থিক মূল্য আরও বেশি। কিন্তু তাদের সেই কাজের কোনো আর্থিক মূল্যায়ন করা হয় না। মহিলা সংস্থাগুলো অনেক দিন ধরেই নারীদের কাজের আর্থিক মূল্যায়ন দাবি জানিয়ে আসছিল। কিন্তু এখনও পর্যন্ত রাষ্ট্রীয়ভাবে এ ব্যাপারে কোনো ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি। ফলে নারী শ্রমিকের কাজের আর্থিক মূল্যায়নের বিষয়টি অবহেলিতই থেকে যাচ্ছে। বর্তমান সরকার মহিলাদের উন্নয়নে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। কিন্তু নারীর কাজের আর্থিক মূল্যায়ন তথা জিডিপিরে তাদের কাজের অবদানের স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যাপারে তেমন কিছু করেননি। এ ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনেক কিছুই করণীয় আছে। নারীর অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজের স্বীকৃতি দেওয়া হলে আমাদের বর্তমান জিডিপির আকার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গৃহকর্মিদের নির্যাতনের ঘটনাও উদ্বেগজনকহারে বেড়েছে। বাড়ছে গৃহকর্মীদের সঙ্গে অনৈতিক কার্যকলাপ, দুর্ব্যবহার, হত্যার পর লাশ গুম ও পুড়িয়ে ফেলার ঘটনা। মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গৃহকর্মীরা মারাত্মক কোনো নির্যাতনের শিকার না হওয়া পর্যন্ত আইনি সহায়তা পায় না। এমনকি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গৃহকর্মীদের নির্যাতনের প্রকৃত চিত্র বের করা যায় না। এছাড়া দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন ৪০ লাখের ওপর পোশাক শ্রমিক। আর এই শ্রমিকদের মধ্যে ৮০ শতাংশই নারী শ্রমিক। এদের অধিকাংশই অশিক্ষিত হওয়ায় অল্পবয়সে জীবিকা অর্জনের তাগিদে গার্মেন্টসে দ্রুত কাজ শিখে নিচ্ছে।

অথচ এই নারী শ্রমিকরা বঞ্চিত হচ্ছেন তাদের মাতৃত্বকালীন ছুটি থেকে, শিকার হচ্ছে মারাত্মক বেতন বৈষম্যের। কাজ করছেন অনিরাপদ পরিবেশে। পোশাক শিল্পে পুরুষ শ্রমিকদের তুলনায় নারীদের কাজ করার পরিমাণ বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে গার্মেন্টসে স্বল্প বেতনে নারী শ্রমিকদের নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়। অন্যদিকে নারী শ্রমিকরা তাদের অধিকার সম্পর্কে কম সচেতন হওয়ায় তাদের দিয়ে কর্তৃপক্ষ সহজেই বেশি কাজ আদায় করে নিতে পারেন। কিন্তু নারীর শ্রম পুরুষের চেয়ে কম না হলেও তাদের বেতন বৈষম্য চোখে পড়ার মতো। সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, পোশাক কারখানাগুলোতে উৎপাদন বাড়ানোর জন্য শ্রমিকদের দিয়ে নির্ধারিত কর্মঘণ্টার পরও অতিরিক্ত খাটানো হচ্ছে। অথচ দেশের বেশিরভাগ শ্রমিকই অপুষ্টির শিকার। কারণ, তারা যে মজুরি পাচ্ছেন তা দিয়ে পুষ্টিকর খাবার দূরের কথা বেঁচে থাকাও দায়।সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, মহিলাদের কাজের আনুষ্ঠানিক আর্থিক স্বীকৃতির পাশাপাশি তারা যাতে মজুরি বৈষম্যের শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান যুগ নারী-পুরুষের মিলিত উন্নয়নের যুগ। কাজেই কাউকে বাদ দিয়ে উন্নয়নের চেষ্টা করা হলে তা কোনোভাবেই সফল হতে পারে না।
লেখক ঃ কলামিস্ট
[email protected]