শেষ হাসি কে হাসছেন ভারতের নির্বাচনে

শেষ হাসি কে হাসছেন ভারতের নির্বাচনে

রায়হান আহমেদ তপাদার : বক্তৃতায়, বিবৃতিতে, খবরের কাগজের পাতায় কিংবা টেলিভিশনের আলোচনায় প্রতিদিন গণতন্ত্র লেখা ও বলা হয় হাজার বার। এ নিয়ে আমাদের মধ্যে আছে নানা মত ও বিরোধ। আছে তর্ক ও ঝগড়া। এর মীমাংসা কীভাবে হবে, কিংবা আদৌ হবে কি না, জানি না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কাউকে জিজ্ঞেস করলে তিনি হয়তো এর চটজলদি উত্তর খুঁজবেন পশ্চিমের কোনো পি ত অথবা রাজনীতিকের কাছে। হয়তো জাঁ জাক রুশো, আব্রাহাম লিংকন কিংবা উইড্রো উইলসনের উদ্ধৃতি দিয়ে জবাব দেবেন। তাতে কতটুকুই-বা বোঝা যাবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদ শব্দ দুটো বেশ চাউর হয়েছিল। বিশ শতকের মধ্যভাগে সমাজতন্ত্রের জনপ্রিয়তার গ্রাফ ছিল ঊর্ধ্বমুখী। তখন বলা হতো, সমাজতন্ত্র হচ্ছে গণতন্ত্রের উচ্চতর রূপ। কোনো কোনো দেশ তার নামের সঙ্গে বাহারি সব শব্দ জুড়ে দিত, যাতে নামেই বোঝা যায় দেশে কোন ধরনের তন্ত্র আছে। উদাহরণ হিসেবে উত্তর কোরিয়ার কথা বলা যায়। দেশটির কাগুজে নাম হলো ডেমোক্রেটিক পিপলস রিপাবলিক অব কোরিয়া। ওই দেশে কয় ছটাক ডেমোক্রেসি আছে বা কয় ডজন পিপল নীতিনির্ধারণে অংশ নেয়, তা এত দিনে আমাদের জানা হয়ে গেছে। গালভরা বুলি কপচে যতই তন্ত্রমন্ত্রের গুণগান করা হোক না কেন, তা যে আসলেই কত ঠুনকো, অন্তঃসারশূন্য, তা এ ধরনের দেশের হালচাল দেখলেই বোঝা যায়।
শুরু হলো এগারো এপ্রিল থেকে ১৯ মে পর্যন্ত ৭ ধাপে ভারতের লোকসভা নির্বাচনে ৫৫০ জন নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। এদিকে ভোট গণনা হবে ২৩ মে। সেদিনই জানা যাবে ভারতের নতুন সরকার কে হতে যাচ্ছে। দিল্লির মসনদে কাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ নির্বাচিত করে পাঠাচ্ছেন। এটিই ভারতের ১৭তম লোকসভা নির্বাচন। এই নির্বাচন নিয়ে দেশে-বিদেশে প্রচুর আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং কংগ্রেস প্রধান রাহুল গান্ধীর মধ্যে দৃশ্যমান হলেও শেষ পর্যন্ত ‘কিং মেকার’ বোধহয় হবে রাজ্যগুলোই। কেননা এখনো পর্যন্ত কোনো জরিপই বলতে পারছে না যে, মোদি বা রাহুলের দল এককভাবে সরকার গঠনের মতো আসন পাবে। যদিও প্রতিনিয়ত বিভিন্ন সংস্থা জরিপে নানা তত্ত্ব দিচ্ছে, তাতে খুব দ্রুতই জনমতে ওঠানামার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। ভারতের মতো দেশে এমনটি খুব বিস্ময়কর হওয়ার কথা নয়। প্রায় ৯০ কোটি ভোটার এ ভোটে অংশ নিতে যাচ্ছেন। বিভিন্ন রাজ্যে রাজনৈতিক চাওয়া-পাওয়ায় যথেষ্ট ভিন্নতা রয়েছে। সে কারণে কোথাও হয়তো বিজেপি বেশি আসন পাবে আবার কোথাও স্থানীয় রাজনৈতিক দল প্রাধান্য বিস্তার করবে, কোথাও বা কংগ্রেসের প্রাধান্য দেখা যেতে পারে। তা ছাড়া ভারতের বর্তমান রাজনীতি বেশকিছু আদর্শ, অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক বঞ্চনা ইত্যাদিতে বেশ জটিল হয়ে উঠেছে। বিশেষত বিজেপির মতো রাজনৈতিক দলের উত্থান ও রাষ্ট্রক্ষমতায় ৫ বছর নির্বিঘেœ থাকার পর আগামী নির্বাচনে ফিরে আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়।
ভারতে এক সময় যে গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চার অঙ্গীকার রাজনীতিতে ছিল সেখান থেকে ক্রমেই সমাজ ও রাজনীতিতে উগ্র ধর্মান্ধতা, জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদির প্রচার ও প্রসার ভারতকে তার মূল আদর্শ থেকে অনেকটাই ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করেছে, এমনটি ভারতের মুক্তবুদ্ধি চর্চার সঙ্গে যুক্ত বেশিরভাগ মানুষই গভীরভাবে অনুভব করেন। উল্লেখ্য ভারতের ৫৪৩ আসনের লোকসভায় পশ্চিমবঙ্গের আসন ৪২টি। পশ্চিমবঙ্গের বাইরে নামকাওয়াস্তে যেসব জায়গায় তৃণমূলের পক্ষ থেকে প্রার্থী দেয়া হয়েছে, সেখানে দলটির প্রার্থীদের জেতার কোনো আশা নেই। এরপরও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জোর দিয়ে বলেছেন, তৃণমূল এ রাজ্যে পাবে ৪২ আসনের মধ্যে ৪২ আসনই। আর এই আসন নিয়েই এবার দিল্লির সরকার গড়বে তৃণমূল। মমতা আরো বলেন, দিল্লির গদিতে আর ফিরছেন না মোদি। তার অন্তিম সময় এসে গেছে। বেজে গেছে বিদায় ঘণ্টা। এবার দিল্লির সরকার গড়বে তৃণমূল। এমন কোনো শক্তি নেই, যে তৃণমূলকে রুখতে পারে। তৃণমূলকে বাদ দিয়ে সরকার গড়তে পারে।মমতা বলেছেন, এখন পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের অস্তিত্ব নেই। সিপিএম শেষ হয়ে গেছে। তাই দিল্লির সরকার গড়তে এবার কংগ্রেস ও সিপিএমকে ভোট না দিয়ে তৃণমূলকে ভোট দিন। ওদের ভোট দিলে লাভবান হবে বিজেপি। আমরা ভোট পেলে দিল্লির সরকার গড়তে পারব। তাড়াতে পারব মোদিকে। মমতা কংগ্রেস-সিপিএম-বিজেপিকে তিন ভাই হিসেবে চিহ্নিত করে বলেছেন, ওদের এবার বিদায় নিতে হবে এই রাজ্যপাট থেকে। বলেন, মায়েদের উলুধ্বনি আর ভাইদের হাততালি এবার দিল্লির বিজেপি সরকারকে করবে খালি।
এবার খোদ দিল্লিতেই সরকার গড়ার আশা করছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেছেন, কোনো শক্তিই তাদের রুখতে পারবে না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুরের চোপড়ায় এক নির্বাচনী জনসভায় এ দাবি করেন। এদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তীব্র সমালোচনা করে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী বলেছেন, চৌকিদার যেখানে যান, সেখানে মিথ্যার বুলি ছাড়েন। তাই এই চৌকিদারকে আর আজ দেশবাসী বিশ্বাস করে না। এবার এই চৌকিদারের বদল চায় দেশবাসী। আর এই চৌকিদারকে হটাবে কংগ্রেসই। পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর জেলার করণদীঘিতে কংগ্রেস আয়োজিত এক জনসভায় এ কথা বলেছেন রাহুল গান্ধী। লোকসভার রায়গঞ্জ আসনের মধ্যে পড়েছে করণদীঘি। অন্যদিকে গুজরাটের এক জনসভায় কংগ্রেসকে প্রত্যাখ্যান করতে দেশবাসীকে আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এদিকে রাহুল গান্ধী বলেন, গত পাঁচ বছর ক্ষমতায় থেকেও কোনো কাজ করেননি চৌকিদার। কোনো প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারেননি। তবে কথা দিচ্ছি, আমরা গরিব-কৃষকদের জন্য এ দেশে চৌকিদারি করব। রাজীব-সোনিয়া পুত্র রাহুল বলেন, বিজেপির এই চৌকিদার তো প্রত্যেকের ব্যাংক হিসাবে ১৫ লাখ রুপি দেয়ার কথা বলে সেই প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেননি। তবে আমরা কথা দিচ্ছি, গরিবদের জন্য আমরা প্রতি মাসে ৬ হাজার রুপি করে বছরে ৭২ হাজার রুপি দেয়ার ব্যবস্থা করব। রাহুল বলেন, চৌকিদার তো বড় লোকের বাড়িতে থাকে। গরিবের ঘরে থাকে না।  
কিন্তু মোদিও তো অনিল আম্বানির চৌকিদার! রাহুল বলেন, মমতাজি আমাকে বলেছেন, কংগ্রেস বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করে না। তাহলে কে রাফায়েল যুদ্ধবিমান কেনায় দুর্নীতির কথা এনেছিল আমজনতার সামনে? বরং আমরাই লড়ছি এখনো বিজেপির বিরুদ্ধে। ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে। রাফায়েল ক্রয়ে ৩০ হাজার কোটি রুপির দুর্নীতির বিরুদ্ধে। শিল্পপতি অনিল আম্বানির হাতে মোদি এই রাফায়েল যুদ্ধবিমান ক্রয়ের ৩০ হাজার কোটি রুপি তুলে দিয়েছিলেন। সেই ইস্যু নিয়ে এখনো লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে কংগ্রেস অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, নির্বাচনে বিজেপি জোটের জয় কেউ ঠেকাতে পারবে না। কারণ আমাদের সময়েই দেশের নিরাপত্তা সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত। দেশের অর্থনীতিও অনেক মজবুত। গুজরাটের জুনাগড় এলাকায় এক নির্বাচনী জনভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় তিনি কংগ্রেস আমলের বিভিন্ন দুর্নীতির কথা উল্লেখ করে এ দলটিকে প্রত্যাখ্যানেরও আহ্বান জানান। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপি এবার নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে না। তাদের ভরসা করতে হচ্ছে এনডিএর অন্য শরিকদের ওপর। জনমত জরিপেও দেখা যাচ্ছে, কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএর পাশাপাশি এসপি, বিএসপি বা তৃণমূলের মতো দলগুলোও সম্মিলিতভাবে অনেক আসন পেতে পারে। তারা তখন সরকার গঠনের নির্ণায়ক শক্তি হয়ে উঠতে পারে। ভোট প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর সরকার গড়ার মতো যথেষ্ট সংখ্যা না থাকলে তখন এসব দলেরই দ্বারস্থ হতে হবে বিজেপিকে। কিন্তু তখন যদি দেখা যায়, সমর্থন দেয়ার বিনিময়ে দলগুলো অন্য কাউকে দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চাইছে, বিপাকে পড়ে যাবেন মোদি।
ভারত-পাকিস্তানের এই যুদ্ধের প্রভাব আসন্ন নির্বাচনে বিজেপি সরকারের পক্ষে কতটা বিশেষ সুবিধা দেবে সেটি সুনিশ্চিত করে বলা কঠিন। কেননা দিন যত গড়িয়ে যাচ্ছে যুদ্ধের স্মৃতির চেয়ে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় রাজনৈতিক দলগুলোর নানা উত্তেজনাকর বক্তৃতা-বিবৃতি ভোটারদের কাছে নতুন বিবেচনার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। সে ক্ষেত্রে নরেন্দ্র মোদির পাঁচ বছরের শাসনামলে বেশকিছু ব্যর্থতা বিরোধীরা রাজ্যগুলোতে জোরালোভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। নরেন্দ্র মোদিও সর্বত্র প্রচার-প্রচারণায় কংগ্রেস, তৃণমূলসহ আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের প্রতিদ্বন্দ্বীদের নানাভাবে সমালোচনা করছেন। ভারতের গণমাধ্যমে এখন এসব সরস আলোচনা-সমালোচনা বেশ প্রাণবন্ত হয়ে উঠছে। ভোটাররা এর মধ্য থেকেই যার যার মতো করে ভোট প্রদানের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তবে ভারতের গত কয়েকটি লোকসভার নির্বাচনে ফলাফল থেকে যেটি স্পষ্ট তা হচ্ছে, আঞ্চলিক দলগুলো সর্বভারতীয় কংগ্রেস ও বিজেপির অবস্থানকে রাজ্যগুলোতে টেক্কা দিতে পেরেছে। ফলে শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রের সরকার গঠনে রাজ্যগুলোতে বিজয়ী দলগুলোর সমন্বয়ে কোনো জোট সরকার গঠনের বাস্তবতা তৈরি হওয়াটি মোটেও অসম্ভব নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে কংগ্রেস বিভিন্ন রাজ্যে তার মিত্র সংগঠন খুঁজে নেবে, অন্যদিকে বিজেপিও তার মিত্র সংগঠন খুঁজতে দ্বিধা করবে না। সে ক্ষেত্রে বৃহত্তর পরিসরে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সমন্বয়ে যদি সরকার গঠনের মতো আসন রাজ্যগুলো থেকে উঠে আসে তা হলে কংগ্রেস, বাম বা সমাজবাদী দলগুলো হয়তো চমক দেখাতেও পারে। সেটি ২৩ মেই বোঝা যাবে।
  লেখক ঃ কলামিস্ট
  [email protected]