শেখ হাসিনা কারো সঙ্গে আপসে যাননি

শেখ হাসিনা  কারো সঙ্গে  আপসে যাননি

মাশরাফী হিরো: জেনারেল এরশাদ একজন সেনাশাসক ছিলেন। অনেকে তাকে স্বৈরশাসক হিসেবেও চিহ্নিত করেন। বাংলাদেশে তিনিই একমাত্র সেনাশাসক যিনি ৯ বছর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। গত রোববার আগে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। সমস্ত গণমাধ্যম জুড়ে সে আলোচনা এবং সমালোচনা চলছে। আলোচনার চাইতে সমালোচনাই বেশি। টিভি টকশোগুলোতেও আলোচকবৃন্দ শুরুতে বলেন মৃত মানুষের সম্পর্কে সমালোচনা করতে চাই না। তারপরও কিছু কথা বলতে হয়। এভাবে বলতে শুরু করেই সমালোচনার পাহাড় জুটে যাচ্ছে তার হিসেবের খাতায়। ইতিহাস কাউকে কখনও ক্ষমা করে না। জেনারেল এরশাদের বেলাতেও তাই হয়েছে।

 তার সবচেয়ে সমালোচনার দিক হলো তিনি কখনই এক কথায় স্থির থাকতে পারেননি। ক্ষমতায় থাকাকালিন সময়েও এটা যেমন বিদ্যমান ছিল তেমনি ক্ষমতার বাইরে গিয়ে এ কাজটি তিনি আরও বেশি করেছেন। তার সময়ে গণতন্ত্রের জন্য বহু মানুষ আত্মাহুতি দিয়েছে। চূড়ান্ত আন্দোলনেও সেনাবাহিনী তার পক্ষে ছিল। এটাই তার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব। শুধু তাই নয় সেনাবাহিনী তাকে সবসময় নিজেদের লোক হিসেবেই মনে করেছে। তার প্রমাণ সেনা সমর্থিত ওয়ান ইলেভেন সরকার এবং মৃত্যুর পর সেনাবাহিনীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন। হাজারও সমালোচনার ভিড়ে তার একটি গুণ সবাইকে বলতে বাধ্য করেছে, তা হলো তিনি কখনও দেশের বাইরে আশ্রয় খোঁজেননি। দুর্দান্ত দাপটের সাথে সেনাবাহিনীর দায়িত্ব পালন এবং ক্ষমতা দখলের পর বিলাসবহুল জীবন-যাপনের পরও তিনি ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পর সবমিলিয়ে প্রায় ৫ বছর জেল খেটেছেন।

 কিন্তু দেশ ছেড়ে পালাননি। বরং দেশে থাকার চেষ্টা থেকেই দ্বৈত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। এসব কারণে ধীরে ধীরে তার দল ক্ষয়ে গেছে। জেলে থেকে নির্বাচন করেও ৯১ সালের নির্বাচনে তিনি ৫টি আসনে বিজয়ী হয়েছেন। তার রাজনীতি থাকলেও রাজনৈতিক কোন দর্শন ছিল না। বরং ধর্মভীরু মানুষদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য নানা কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম এবং রবিবারের পরিবর্তে শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি ঘোষণা তার অন্যতম অপকৌশল। যিনি সত্যিকার অর্থে ব্যক্তি জীবনে খুব কমই ধার্মিক ছিলেন। তিনি যেমন রাজনীতিবিদদের কাছে উপহাসের পাত্র ছিলেন তেমনি অসংখ্য রাজনীতিবিদদের ক্ষমতার মোহে নিজের দলে ভেড়াতেও সক্ষম হয়েছিলেন। বাংলাদেশের অধিকাংশ রাজনীতিবিদদের বিকাশ হয়েছে স্বৈরশাসকদের সময়ে। জেনারেল আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান এবং এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে বহু নেতার জন্ম হয়েছে। বাংলাদেশে অদ্যাবধি যত নেতার সৃষ্টি হয়েছে তার জন্য আইয়ুব খান এবং এরশাদের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকার প্রয়াসই ভূমিকা রেখেছে। সারা বাংলাদেশে কিছুদিন আগ পর্যন্তও অধিকাংশ নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর সময়ের। আর এখনও ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের নেতারাই বেশি ভূমিকা রাখছেন। শহীদ মিলন, শহীদ নূর হোসেনের অসংখ্য সহযোগী এখনও রাজনীতিতে সক্রিয়। তাদের প্রিয় মানুষদের হারানোর বেদনা সম্ভবত মৃত এরশাদকে বয়ে বেড়াতে হবে বহুদিন।

 যার শিকার হয়েছিল গণতন্ত্র এবং পুরো বাংলাদেশ। আজকের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাও তা থেকে বাদ যাননি। ওয়ান ইলেভেনের সময় শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়া গ্রেফতার হলেও ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছেন জেনারেল এরশাদ। সেনা সমর্থিত এই সরকার বরঞ্চ এরশাদকে প্রায় সকল মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পথ প্রশস্ত করেছিল। অথচ ১৬ জুলাই গ্রেফতার হয়েছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। সেদিন ওয়ান ইলেভেন সরকারের রোষানলের শিকার হয়েছিলেন তিনি। আজ হয়তো অনেকেই তা কল্পনা করতে পারেন না। যিনি এখন শুধুমাত্র বাংলাদেশের নয় সারা বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাবান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চিহ্নিত। অথচ মাত্র ১৩ বছর পূর্বে তাকে টেনে হেঁচড়ে জেলখানায় নিক্ষেপ করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর কন্যা বলেও তাকে সামান্যতম সম্মান করা হয়নি। তিনি এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছেন এসব অরাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। তিনি কারো সঙ্গে আপসে যাননি। বরং সবাই তার সঙ্গে পথ মিলিয়েই পথ চলার চেষ্টা করেছেন। যাতে জয় হয়েছে রাজনীতির, বাংলাদেশের মানুষের, মহান মুক্তিযুদ্ধের এবং বঙ্গবন্ধুর নীতি-আদর্শের।
লেখক: উপ-দপ্তর সম্পাদক
বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগ।
০১৭১১-৯৪৪৮০৫