শুরুটা ফুরফুরে, শেষটা চ্যালেঞ্জের আওয়ামী লীগের

শুরুটা ফুরফুরে, শেষটা চ্যালেঞ্জের আওয়ামী লীগের

মাহফুজ সাদি : রাজনীতির মাঠে ফুরফুরে অবস্থায় ২০১৭ সাল শুরু করেছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। কিন্তু বছরান্তে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে দলটির। আর মাঝখানে দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-কোন্দল নিরসনে ‘বিষাদময় ব্যস্ত সময়’ পার হয়েছে। এর বাইরে দলীয় কার্যক্রমের সঙ্গে মানবিক নানা কর্মকান্ড নিয়েও ব্যস্ত থাকতে হয়েছে আওয়ামী লীগকে। এর মধ্যে পার্বত্য অঞ্চলের তিন জেলায় পাহাড় ধ্বংস, রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের মুখে মিয়ানমার থেকে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয়, উত্তরবঙ্গ ও হাওরঞ্চালে বন্যা এবং বিচ্ছন্ন সাম্প্রদায়িক হামলার শিকার হওয়া ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ছে দলটি। কিন্তু বছর শেষে রাজপথে বিএনপির বড় ধরনের শোডাউন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রতিবেশী প্রভাবশালী দুই মিত্র দেশের বিপরীত অবস্থান, ঢাকা উত্তর সিটি মেয়রের মৃত্যু, রংপুর সিটিতে বিপুল ভোটের ব্যবধানে দলীয় প্রার্থীর পরাজয় এবং শিক্ষামন্ত্রীর ‘ঘুষ বিতর্ক’ আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

নতুন বছর ২০১৮ সালকে বরণ করতে হচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনী বছর হিসেবে। দ্বারে কড়া নাড়া এ বছর অর্ধডজন সিটি নির্বাচনে জয় দিয়ে শুরু করে বছরান্তে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মুখোমুখি হওয়ার টার্গেট নিয়েছে শাসক দল। বিদায় হতে চলা বছরের     শুরুতে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি কোণঠাসা থাকায় রাজনৈতিক মাঠে ফুরফুরে মেজাজে ছিল টানা দুই মেয়াদে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ। কিন্তু তার পরেও বছর পার করতে হয়েছে দীর্ঘদিনের বিবাদমান তৃণমূলে শৃঙ্খলা এনে দলীয় নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করতে। রক্তাক্ত দ্বন্দ্ব-কোন্দল ও গ্রুপিং এতটাই প্রবল হয়েছিল যে বিবাদমান হাই কমান্ডের নির্দেশে স্থানীয় নেতাদের ঢাকায় ডেকে সমঝোতা করাতে হয়েছে। আবার কেন্দ্রীয় নেতারা ওই সব এলাকায় গিয়ে বিভাগ, জেলা, উপজেলা পর্যায়ে বৈঠক ও কর্মিসভা করে ঐক্যবদ্ধ করতে চেষ্টা করেছেন।

টানা দুই মেয়াদের ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের তৃণমূলের অনেক স্থানেই বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-বিবাদ রীতিমতো সংঘাতে রূপ নিয়েছিল। কিছুদিন পর পরই দেশের কোথাও না কোথাও নিজেদের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বহিষ্কার পাল্টা বহিষ্কারের ঘটনা তো ছিলই। কয়েকটি স্থানে নিজেদের মধ্যে সংঘাতে প্রাণও ঝরে গেছে বেশ ক’জন নেতাকর্মীর। এসব ঘটনায় রীতিমতো ক্ষুব্ধ ও চিন্তত হয়ে পড়ে দলটির হাইকমান্ড। তাই একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগেই এসব দ্বন্দ্ব-কোন্দল মিটিয়ে দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করতে হাইকমান্ডের নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় কেন্দ্রীয় নেতারা দলকে চাঙ্গা এবং তৃণমূলে সৃষ্ট কোন্দল-দ্বন্দ্ব নিরসনে ২০১৭, বছরজুড়েই মাঠে ছিলেন। এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে দলে বড় ধরনের শুদ্ধি অভিযান এবং তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল-দ্বন্দ্ব নিরসনে জেলার নেতা ও এমপিদের সঙ্গে ঢাকায় ধারাবাহিক বৈঠক করেছে দলটি। এছাড়া কেন্দ্রীয় নেতারা নিজেরাও বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে এবং বিভাগ, জেলা, উপজেলা পর্যায়ে গিয়ে কর্মী সম্মেলনের মাধ্যমেও বিরোধ নিরসনের চেষ্টা করেছেন। শুধু দলীয় নেতাকর্মীদেরই ঐক্যবদ্ধ করা নয়, একইসঙ্গে সমমনা নানা শ্রেণি-পেশার মানুষকেও একাট্টা করতে নানা পরিকল্পনা করে দলটি। বিভাগ, জেলা ও থানায় বিরাজমান কোন্দল নিরসনের এই মিশনে বিরোধপূর্ণ জেলার নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেন দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। কোন্দলের কারণ কি তা চিহ্নিত করে সমস্যা সমাধানে নির্দেশনাও দেন তিনি। বিভিন্ন দুর্যোগের ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াতে দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ কেন্দ্রীয় নেতারা ছুটে বেড়িয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকায়। আশ্রয়-আর্থিক অনুদান, খাদ্য সহায়তা দিয়ে দাঁড়িয়েছেন মানবতার পাশে। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বিশ্ব গণমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভূষিত হয়েছেন ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’তে। সেই সঙ্গে পেয়েছেন আন্তর্জাতিক সমর্থন ও সহায়তাও। চলতি বছরের জুনের মাঝামাঝি সময়ে অতিবর্ষণে রাঙামাটি, বান্দরবান এবং চট্টগ্রামসহ পার্বত্য অঞ্চলের ৫ জেলায় ভয়াবহ পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। এতে সেনা কর্মকর্তাসহ দেড় শতাধিক মানুষ নিহত হয়।

টানা ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে বিভিন্ন জায়গায় পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী অনেক বাড়ি-ঘর মাটি চাপা পড়েছে। এতে ওই অঞ্চলের মানুষ বড় ধরনের সংকটের মধ্যে পড়ে। এ ঘটনায় স্থানীয় ও কেন্দ্রীয়ভাবে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রতিনিধি দল এ সময় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ায়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকসহ কেন্দ্রীয় নেতারা সেখানে ছুটে যান। স্থানীয় নেতারা অংশ নেন উদ্ধার কাজেও। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার জন্য দলীয়ভাবে হাতে নেওয়া হয় নানা কর্মসূচি। এপ্রিল মাসে দেশের হাওর অঞ্চলে পাহাড়ি ঢলে ভয়াবহ অকাল বন্যা দেখা দেয়। এতে নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট, হবিগঞ্জে নষ্ট হয় হাজার হাজার জমির সব ফসল। এক ফসলী হওয়ায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এ এলাকার মানুষ। সে সময় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই ছুটে যান সেখানে। ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম চালু করার পাশাপাশি আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয় দলের পক্ষ থেকে। এছাড়াও পরবর্তীতে দেশের উত্তরাঞ্চলের বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ায় ক্ষমতাসীন দলটির নেতারা। দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াতে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। চলতি বছরের ২৫ আগস্ট থেকে নিজ দেশে নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় মিয়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গারা। ৭ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামীমের নেতৃত্বে একটি টিম সেখান যান। এরপর ১২ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গাদের দেখতে ছুটে যান আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গোয়েন্দা সংস্থার নিষেধ সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছুটে গেছেন রোহিঙ্গা শরাণার্থীদের কাছে। নিজে গিয়ে তাদের কথা শুনেছেন। সে সময় বিশ্ব মিডিয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

তার প্রত্যক্ষ নির্দেশে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ সবাই রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছে, শুধুই আশ্রয়ই নয়, থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থাও করে। সরকারের পাশাপাশি দলীয়ভাবেও খাবার, তাঁবু নির্মাণ, টিউওবয়েল, ল্যাট্রিন নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ দুই মাস নিয়মিত থাকা ও যাওয়া আসার মধ্যে ছিলেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এখনো রোহিঙ্গাদের খোঁজ-খবর রাখছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। একই সঙ্গে মিয়ানমারে উপর চাপ প্রয়োগ করে শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ফেরাতেও বেশ সরব ছিল আওয়ামী লীগ। দলীয় প্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি সফর ও কর্মকান্ডের বাইরে দলীয়ভাবে আওয়ামী লীগ বেশ কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দলীয় পর্যায়ে আলোচনায় বিষয়টি নিয়ে এসেছিল। এর মধ্যে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে দলটির প্রতিনিধিরা যখন চীন সফরে গিয়ে চীনসহ সেখানে উপস্থিত অন্যান্য দেশের প্রতিনিধিতের সঙ্গে বৈঠকে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। দল ও সরকারে এত ব্যাপক কর্মসূচির কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ উপাধী দেয় বিশ্ব গণমাধ্যম। এছাড়া ২০১৭ সালে দেশে বেশ কিছু স্থানে সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটে। এ সকল ঘটনায় সব জায়গায় আওয়ামী লীগ গুরুত্বের সঙ্গে সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। গত নভেম্বরে রংপুরের ঠাকুর পাড়ায় সংখ্যালঘুদের উপর হামলার ঘটনার পরে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে দলের একটি প্রতিনিধি দল সেখানে যান। এদিকে এ বছর বিএনপি জামায়াত জোট বা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে মাঠের রাজনীতে খুব একটা মোকাবিলা করতে না হলেও তিন সিটি নির্বাচনসহ বেশ কিছু স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তাদের সঙ্গে লড়তে হয়েছে ক্ষমতাসীন দলটিকে।