শুধু কথামালা নয়, চাই বাস্তবায়নযোগ্য নির্বাচনী ইশতেহার

শুধু কথামালা নয়, চাই বাস্তবায়নযোগ্য নির্বাচনী ইশতেহার

রিপন আহসান ঋতু : নির্বাচনের আগে যে কথা বলে ভোট চাওয়া হয়, তারই একটি লিখিত রূপ ইশতেহার? বাংলাদেশে নির্বাচনের আগে ইশতেহার ঘোষণা করা একটি রেওয়াজে পরিণত হয়েছে? এসব ইশতেহারে উন্নয়ন, গণতন্ত্র, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, দারিদ্র্য বিমোচনসহ নানা প্রতিশ্রুতি থাকে? কিন্তু যে দল ক্ষমতায় যায়, তারা এর বাস্তবায়ন কতটুকু করে? এই প্রশ্নটা এখন সবার মুখে মুখে থাকলোও প্রকৃতপক্ষে আমরা ভাসতে ভাসতে ডুবতে ডুবতে সময়ের গ্রন্থিগুলো পার হচ্ছি। অনেকটা যেন রজ্জুপথে চলা। সামান্য এদিক-সেদিক হলেই মহাপতনের দিকে। একটা জাতি এত দীর্ঘ সময় ধরে এ রকম চাপের মধ্যে থেকে সুস্থ থাকতে পারে না। তাই সামগ্রিকভাবে এবারের নির্বাচনটা আর দশটা নির্বাচনের মতো গতানুগতিক নির্বাচন নয়, তার দুটি কারণ। একটি কারণ হচ্ছে, স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর অচিরেই পূর্ণ হতে যাচ্ছে। এবার যে সরকার নির্বাচিত হবে, সে সরকারই স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরপূর্তি উদযাপন করবে। কেবল উৎসব উদযাপনই নয়, এর সঙ্গে আরও কিছু দায়িত্ব বা চ্যালেঞ্জও তাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। যেমন- পঞ্চাশ বছর আগে আমরা স্বাধীনতা সংগ্রামে জয়ী হয়েছিলাম, পঞ্চাশ বছর পরে এসে আমাদের অর্জনটাই বা কী হলো, আর আমরা সামনের পথটাই বা কীভাবে পাড়ি দেব? এই সিদ্ধান্তটা নেওয়ার সময় এসে গেছে। যেভাবে গত দশটি বছর পার করেছি, সামনের দশটি বছর ততটা নির্বিঘেœ কাটবে না।

 সেই অর্থে এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন এবং এতে যে দলগুলো অংশগ্রহণ করছে, তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সেই তাগিদটা প্রতিফলিত হওয়া উচিত। দ্বিতীয় কারণটি হচ্ছে, আন্তর্জাতিকভাবে এমডিজির পরে এখন এসডিজি এসেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজিগুলো বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। তার একটি হচ্ছে দেশকে দারিদ্র্যমুক্ত করা; আরেকটি হচ্ছে  ২০৩০ সালে অর্থনীতিকে এমন জায়গায় নিয়ে যেতে হবে, যেখানে শতকরা ৪০ ভাগ জনগোষ্ঠীর আয় বৃদ্ধিটা গড় জাতীয় প্রবৃদ্ধির তুলনায় বেশি হয়। আমাদের হাতে কিন্তু বেশি সময় নেই। অঙ্কের হিসাবে বললেও সেটি ১১ বছর। এই ১১ বছরের মধ্যেই আমাদের দারিদ্র্যমুক্ত এবং বৈষম্য হ্রাসকারী দেশের পর্যায়ে পৌঁছে যেতে হবে। পাশাপাশি আমরা নিজেরাও কিন্তু আলাদাভাবে কিছু লক্ষ্য গ্রহণ করেছি। যেমন এর একটি হচ্ছে, আমরা নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবো। এখন কথা হচ্ছে, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনে ইশতেহারে শুধু কথার ফুলঝুরিই বেশি দেখা যায়? ব্যতিক্রম ছাড়া আগের ইশতেহারের ধারাবাহিকতা থাকে না? আর নতুন ইশতেহারে আগের ইশতেহারে দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দাবি করা হয়? কিন্তু থাকে না আগের ইশতেহারের সঙ্গে নতুন ইশতেহারের তুলনা? সব দলের ইশতেহারেই গণতন্ত্র, সুশাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দুর্নীতি দমন, দারিদ্র্য বিমোচন, সম্পদের সুষম বন্টন এরকম আরো অনেক কথা থাকে? আর এগুলো বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশে তো গণতন্ত্রের সংকট থাকত না? সুশাসনের অভাব হতো না? দেশ হতো দুর্নীতিমুক্ত? বিচার বিভাগ থাকতো স্বাধীন? কিন্তু বাস্তবে কি তা হয়েছে? ক্ষমতায় এসে প্রতিশ্রুতি বা ইশতেহারের কতটা বাস্তবায়ন করেছে বা করার চেষ্টা করেছে? সব কিছু বাস্তবায়ন করেছে বা কিছুই করেনি, এমন সরলভাবে বলে দেওয়ার সুযোগ নেই? কারণ, নির্বাচনী ইশতেহার প্রস্তুত করার সময়ই প্রত্যেক দলেই এমন কৌশল অবলম্বন করে যার প্রেক্ষিতে তারা ক্ষমতায় এসেই বলে দিতে পারেন ‘সব বাস্তবায়ন করেছি?
]
ইতমধ্যে আগামী ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলই ইশতেহার তৈরির কাজ শেষ করেছেন? রাজনৈতিক দলগুলো এখন যে ইশতেহার ঘোষণা করবে, সেখানে আমরা বলবো; বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর দিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত কেননা টেকসই উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরের জন্য প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখা জরুরি। এ জন্য দরকার বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান। তাহলে কমবে দারিদ্র্য ও বৈষম্য। ফলে আগামীতে বেসরকারি বিনিয়োগ যাতে উৎসাহিত হয়, তার জন্য ইশতেহারে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার থাকতে হবে। অর্থনৈতিক দৃষ্টিতে বর্তমানে যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেগুলো মোকাবেলার কৌশলই রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে প্রাধান্য পাওয়া উচিত। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে রফতানি খাতে বৈচিত্র্য আনা। তৈরি পোশাকের বাজার বাড়ানোর উদ্যোগের পাশাপাশি অন্যান্য পণ্যের রফতানি বাজার সম্প্রসারণ করা। এ জন্য নতুন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বৈধ পথে রেমিট্যান্স আয়প্রবাহ বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংক খাতের দুরবস্থা দূর করতেই হবে। বেসরকারি খাতে অর্থায়ন বাড়াতে হলে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ কমাতে হবে। উন্নত বাংলাদেশের জন্য দরকার মানবসম্পদের উন্নয়ন। প্রাথমিক শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি যথেষ্ট হলেও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষায় ঝরে পড়ার হার এখনও অনেক। উচ্চ শিক্ষার মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সবচেয়ে জরুরি হলো, বেকারত্ব দূর করা; কর্মসংস্থান বাড়ানো। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর জোর দিতে হবে। বেসরকারি খাতকে প্রয়োজনীয় নীতি-সহায়তা দেওয়ার অঙ্গীকার থাকতে হবে। চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে অঙ্গীকার থাকতে হবে। নতুন উন্নয়ন পরিকল্পনা হতে হবে সর্বজনীন স্বার্থ বিবেচনায়। এখনকার যে অর্জন আছে, তার ওপর ভিত্তি করে আগামীর পরিকল্পনা সাজাতে হবে। পাশাপাশি আয়বৈষম্য কমানোও গুরুত্বপূর্ণ।

দারিদ্র্য দূর ও বৈষম্য কমানোর জন্য সর্বজনীন বেতন কাঠামো ও সর্বজনীন অবসর সুবিধা সৃষ্টি করা দরকার। পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নে অর্থায়ন কোথা থেকে আসবে, কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তা ইশতেহারে উল্লেখ করতে হবে। এ ছাড়া প্রশাসন ও উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায় সুশাসন নিশ্চিত করা এবং সাশ্রয়ীভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ থাকা উচিত। যদিও এবারের ইশতেহারে আলাদা ভাবে চোখ থাকবে ২.৫ আড়াই কোটি তরুণ ভোটারের। বেকারত্ব বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অভাব, চাকরিতে নিয়োগে দুর্নীতি ও বৈষম্য এখনও দূর হয়নি। বিদ্যমান বাস্তবতায় উদ্যোক্তা হয়ে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখাও তরুণদের জন্য কষ্টসাধ্য। তাই জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগেুলোর কাছ থেকে এসব সমস্যা সমাধানের সুস্পষ্ট ঘোষণা থাকতে হবে। একাদশতম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটারের সংখ্যা ১০ কোটি ৪১ লাখ। তার মধ্যে তরুণ ভোটারের সংখ্যা ২ কোটি ৩০ লাখ। এদের মধ্যে আবার ২১ লাখ ৭৭ হাজার ২১৪ জন একেবারেই নতুন। অর্থাৎ মোট ভোটারের ২০ শতাংশই হলো তরুণ। তাই তাদের মনোযোগ আকর্ষণটাই এখন রাজনৈতিক দলগুলোর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে আলোচ্য বিষয় হলো আসন্ন নির্বাচনে তরুণদের প্রত্যাশা কি? সেটা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো কতটুকু ভেবেছেন? সেটাও দেখার বিষয়, কেননা আধুনিক যুগের সচেতন তরুণ অবশ্যই একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ, সন্ত্রাসমুক্ত ও অসাম্প্রদায়িক একটি দেশ দেখতে চায়। এখানে তরুণদের কাছে যেমনি প্রত্যাশা আছে তেমনি তরুণদেরও কিছু প্রত্যাশা আছে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে। বর্তমান বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড ভোগ করছে। অর্থাৎ দেশের ৬৫ শতাংশ লোকজন কর্মশীল আর মাত্র ৩৫ শতাংশ মানুষ নির্ভরশীল। তাই এ বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগাতে হবে। আবার তরুণদেরও স্বতঃস্ফূর্তভাবে দেশ গঠনে কাজ করাতে হবে। বেকারত্ব আমাদের দেশের প্রধান সমস্যা। আবার দিন দিন শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে সমান হারে।

 বর্তমান বাংলাদেশের তরুণরা অনেক সচেতন, অসাম্প্রদায়িক এবং সমতায় বিশ্বাসী। তাই নির্বাচনী ইশতেহারে তারা নিজেদের বিষয়ের পাশাপাশি নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের অধিকারের নিশ্চয়তা দেখতে চায়। তরুণরা বিগত বছরগুলোতে লক্ষ করেছে, চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানো নিয়ে সকলেই একমত হলেও তা বাড়েনি। চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা নতুন চমক হতে পারে তরুণদের কাছে। পাশাপাশি দেশের কয়েক লক্ষ মানসম্মত শিক্ষার্থী শিক্ষক নিবন্ধিত হয়েও শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে পারেনি। বছরের পর বছর ধরে শিক্ষক নিবন্ধিতদের সংখ্যা বাড়িয়েছেন কিন্তু তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হয়েছে। অনেক তরুণ মনে করছে সব উন্নয়ন হয়েছে রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিশেষ কিছু অঞ্চলকেন্দ্রিক। তাই তরুণসমাজ সব জেলায় সমানভাবে (ডিসেন্ট্রালাইজড এন্ড ইকুইটেবল) উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি সংবলিত ইশতেহার বেশি পছন্দ করবে। এ বৃহৎ যুবসমাজ এমন নির্বাচনী ইশতেহারকে প্রাধান্য দিবে, যেখানে শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ থাকবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন, কারিগরি শিক্ষার প্রসার, প্রশ্ন ফাঁস রোধ ও শিক্ষা খাতে অধিক স্বচ্ছতা আনয়নের নিশ্চয়তা থাকবে। এ ছাড়া তাদের শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তরুণদের টানতে হলে অবশ্যই সুষ্ঠু ছাত্র-রাজনীতির প্রতিশ্রুতি নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষণা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম সব সময় সংস্কৃতিমনা তাই সে বিষয়ও খেয়াল রাখতে হবে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর।

সর্বোপরি, এ কথা স্মরণ রাখতে হবে যে, তরুণরা কখনো বিবেচনাহীনভাবে ভোট দিবে না। নির্বাচন চলাকালীন রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা এবং কর্মিদের আচার-আচরণও তাদের ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। একটি সুন্দর, সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে তরুণরা নির্বাচিত করবে তাদের পছন্দের সরকারকে তাই সকলের প্রত্যাশা এবারের ইশতেহার হবে কর্মবান্ধব ও সময় উপযোগী। কেবল তখনই এগিয়ে যাবে তারুণ্য, এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ একইভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে সড়ক নিয়ে যুগোপযুগী পরিকল্পনা সংযুক্ত করা জরুরি হয়ে পড়েছে, সাম্প্রতিক নিরাপদ সড়কের দাবিতে যে উত্তাল জোয়ারের সৃষ্টি হয়েছিল তা কারো দৃষ্টি এড়ায়নি। এর পিছনে অনেক ন্যায় সংগত যুক্তি রয়েছে, দেশে রাস্তা বাড়ছে না কিন্তু প্রতিদিন বাড়ছে যানবাহনের সংখ্যা। কম রাস্তায় অধিক যানবাহন ঢুকে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। এতে বাড়ছে দুর্ঘটনা। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ইশতেহারে  রাস্তার পরিমাণ বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। সড়কে বিশৃঙ্খলা ও অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও শৃঙ্খলা ফেরাতে নির্বাচনী ইশতেহারে অঙ্গীকারের ওপর গুরুত্বারোপ করা অতীব জরুরি। যেহেতু আমাদের দেশে নির্বাচনী ইশতেহার তৈরিতে রাজনৈতিক দলগুলো কোনো জরিপ বা জনগনের মতামত নেয় বলে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না? তারা তাদের মতো করে একটি ইশতেহার তৈরি করে, যাতে জনগণের কোনো মতামত বা অংশগ্রহণ থাকে না? পাশাপাশি ইশতেহার বাস্তবায়ন হলো কিনা, তা নিয়েও জবাবদিহি করতে হয় না যারা ক্ষমতায় যান তাদের? আবার এ ধরনের জবাবদিহিতার কোনো বাধ্যবাধকতাও নেই। তাই  আমরা এমন ইশতেহার চাই যা শুধু কথার ফুলঝুরির মধ্যে আটকে থাকবে না, হবে বাস্তবায়নযোগ্য এবং সকলের কাছে গ্রহণীয়।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সংগঠক  
০১৭১৭-৪৯৬৮০৩