শুদ্ধ নৃত্যচর্চা

শুদ্ধ নৃত্যচর্চা

আব্দুস সামাদ পলাশ : আজ ২৯ এপ্রিল আন্তর্জাতিক নৃত্যদিবস। সারা বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে এ দিনটি। নৃত্যশিল্পীরা সবাই একত্র হয়ে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিনটি পালন করবে। র‌্যালি, আলোচনা সভা, সেমিনার, নৃত্যানুষ্ঠানসহ আরো অনেক আয়োজন রয়েছে এই কর্মসূচিতে। আর এসব করা হয় নৃত্য শিল্পীদের একান্ত প্রচেষ্টায়। নৃত্যে আদি ইতিহাস খুব প্রাচীন। নৃত্য সৃষ্টির আলাদা ভাষা আছে। আছে তার নানা রকম পরিচয়। শরীরের অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে আমরা যা প্রকাশ করি তাকেই নৃত্য বলে। আর এই নৃত্য পৃথিবীর সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিনোদনের সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যম হিসাবে পরিচিত। বিনোদনের যত মাধ্যম আছে নৃত্যকলাই সহজ, সুন্দর, পরিচ্ছন্ন একটি মাধ্যম হিসাবে আমাদের দেশে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। আর তার কারণ হলো নৃত্যের আলাদা আলাদা বৈচিত্র্য। অতি সহজেই একজন নৃত্যশিল্পী তার দক্ষতা দিয়ে সবার পরিচিতি অর্জন করেন। একজন নৃত্যশিল্পী যত সহজেই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন অন্য মাধ্যমের শিল্পীদের বেলায় তা সহজ হয়ে উঠে না। এদেশে অনেক যোগ্যতাসম্পন্ন নৃত্যশিল্পী আছেন, যারা ইতিপূর্বে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে দেশের জন্য সুনাম বয়ে এনেছেন। এ দেশের নৃত্যশিল্পীরা অনেক শক্তিশালী।

 তাদের আছে অসাধারণ প্রতিভা। তারা তাদের নিজ নিজ চিন্তা-চেতনায় নতুন নতুন কম্পোজিশন করে বাংলাদেশকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করছেন বিশ্বের কাছে। আমাদের দেশীয় লোকজ নৃত্য দেশের বাহিরে খুবই জনপ্রিয়। একজন দক্ষ নৃত্যশিল্পী হতে গেলে অবশ্যই তাকে শাস্ত্রীয় নৃত্য শিখতে হবে। শাস্ত্রীয় নৃত্য জানা থাকলে একজন নৃত্যশিল্পীর চলার রাস্তা সুগম হয়। অদক্ষ নৃত্য শিল্পীর সস্তা জনপ্রিয়তা পেলেও সত্যিকারের নৃত্যশিল্পী হতে পারে না। সত্যিকারের নৃত্যশিল্পী হতে গেলে সাধনা এবং চর্চার ব্যাপক প্রয়োজন। একজন নৃত্যশিল্পী তৈরি করতে অভিভাবকদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। কঠোর অনুশীলনই একজন নৃত্যশিল্পীর জন্ম দেবে। কোন পুরস্কারে কিংবা মেডেলে নৃত্যশিল্পী হওয়া যায় না।

তার পরেও প্রতিযোগিতার দরকার আছে। যারা অনেক মেধা খরচ করে উচ্চাঙ্গ নৃত্য শিখেছে তারা তাদের যোগ্যতা কাদের সামনে প্রকাশ করবেন। বিশেষ করে মফস্বল শহরে ওইসব শিল্পীদের দক্ষ বিচারক না থাকার কারণে তাদের যোগ্যতার মূল্যায়ন হয় না। আর তখনই তারা কেউ কেউ হতাশায় নৃত্যশিল্প থেকে সরে দাঁড়ান। তাই বাংলাদেশ শিশু একাডেমি’র উচিত বিভিন্ন জাতীয় প্রতিযোগিতায় উচ্চাঙ্গ নৃত্যের বিচারক ঢাকা থেকে বিভিন্ন জেলায় প্রেরণ অথবা উচ্চাঙ্গ নৃত্যের একটি আলাদা প্রতিযোগিতা ঢাকাতেই আয়োজন করা। অন্যসব কিছুর চেয়ে নৃত্যশিল্পীর ব্যয় অনেক বেশি। তাছাড়া নৃত্যশিল্পীদের প্রাথমিক অবস্থা থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন প্রশিক্ষকের কাছে প্রশিক্ষণ নিতে হয়। কারণ নৃত্যের ভিন্ন ভিন্ন ধারা আছে, যা বিভিন্ন প্রশিক্ষক প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। একজন নৃত্য শিল্পীর তার পরিপূর্ণতার জন্য অনেক সাধনা করতে হয়, করতে হয় কঠোর অনুশীলন। যারা অনেক বড় নৃত্যশিল্পী হিসাবে দেশে-বিদেশে খ্যাত, তারা সবাই কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে নৃত্যশিল্পের মানোন্নয়ন করেছেন।

নৃত্য নৃত্যশিল্পীরা এদেশের সম্পদ, তারা তাদের নৃত্যের মাধ্যমে এদেশের সুনাম বার বার বয়ে আনছে। তার প্রমাণ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। প্রতি বছর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি’র মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এদেশের নৃত্যশিল্পীরা নৃত্য পরিবেশন করে বিদেশে অনেক সম্মান অর্জন করে আসছে। আজকের এই দিনে সব নৃত্যশিল্পীর একটি দাবি হওয়া উচিত। আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবসে সরকারিভাবে নৃত্য উৎসব করা এবং সে দায়িত্ব পালন করবে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। সেখানে বাংলাদেশের সমস্ত নৃত্যশিল্পীরা উপস্থিত থাকবেন। হবে নৃত্যশিল্পীর প্রাণের মিলন মেলা। নৃত্য একটি পারফরমিং আর্টস যা সহজেই মানুষের মনকে দোলা দিয়ে যায়। এদেশে যারা নৃত্যের একটি প্লাটফর্ম গঠনের জন্য জীবন বিসর্জন দিয়েছেন, তাদেরকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি যার ফলে বর্তমানে নৃত্যশিল্পীদের জন্য বাংলাদেশের নৃত্যকলা আর নৃত্যশিল্পীরা এখন একটি শক্ত মাটিতে দাঁড়াতে পেরেছে। আজ স্মরণ করছি মরহুম বুলবুল চৌধুরী, জি এ মান্নান, গহওর জামিল, রাইজা খানম ঝুনুসহ অনেক নৃত্যশিল্পীদের। তাঁরা যদি এখন নৃত্যের এই রাস্তা না তৈরি করতেন, তবে আজ হয়ত আমরা এই রাস্তায় হাঁটতে পারতাম না। তাইতো বাংলাদেশে নৃত্যের কথা এলেই প্রথমে ঐসব কালজয়ী নৃত্যশিল্পীদের নাম স্মরণ হয়। একজন নৃত্যশিল্পীর আসল জায়গা হলো মঞ্চ। আজকাল নকলের প্রবণতা চারিদিকে ছড়িয়ে গেছে। সকল নৃত্যশিল্পীর প্রতি আমার আকুল আবেদন, ‘তোমরা শুদ্ধভাবে চর্চা কর। চর্চার বিকল্প কিছুই নেই। মনে প্রাণে সংকল্প কর নৃত্য আমার ধ্যান জ্ঞান। দেখবে সাফল্য আসবেই।’ সবাইকে নূপুরের শুভেচ্ছা।
লেখক: নৃত্যশিল্পী ও সভাপতি
আমরা ক’জন শিল্পী গোষ্ঠী, বগুড়া
-০১৭১৯৭৭১৩৯১