শিশুর প্রতি কেন এই হিং¯্রতা?

শিশুর প্রতি কেন এই হিং¯্রতা?

রবিউল ইসলাম রবীন: চারিদিকে অব্যাহত খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাস, নির্মমতা, অবিবেচিত ঘটনা ঘটতে দেখে  দেশের অনেকের মতো বেদনাহত হচ্ছি প্রতিনিয়ত। কি করবো বুঝতে পারি না। তখন লিখতে বসি। মনকে বলি, এই আমার সাধ্য। এই আমার প্রতিবাদ। আমি অকিঞ্চিৎকর মানুষ। নিতান্তই ছা পোষা মানুষ। থামছে না, থামানো যাচ্ছে না ধর্ষণের ঘটনা।  শিশু থেকে বৃদ্ধা পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। ধর্ষিত হচ্ছে সমাজের শিক্ষিত শ্রেণীর হাতে। সমাজে যে মানুষগুলি সবচেয়ে শ্রদ্ধার পাত্র। আস্থা রাখে মানুষ যাঁদের উপর সবচেয়ে বেশি। তাই তো দুঃখ যে, আমাদের  আস্থার জায়গাগুলি ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। তাহলে মানুষ কার উপর আর ভরসা করবে? সবচেয়ে ভয়াবহ যে বিষয়, কোমলমতি শিশুরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। শিকার হচ্ছে তাঁর শিক্ষক দ্বারা। শিক্ষকের স্থান পিতা-মাতার পরেই। শিশুরা ধর্ষিত হবে শিক্ষকের হাতে, এ কথা শোনাও যে পাপ। এ কোন সর্বনাশা সময় এলো?
চলতি বছরের প্রথমার্ধে গড়ে মাসে অন্তত ৪৩টি শিশু ধর্ষিতা হয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে ধর্ষণের পর শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষণের শিকার হচ্ছে ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে। আইন ও সালিস কেন্দ্রের (আসক) এর হিসেবে ২০১৯ সালের প্রথম ছয় মাসে মোট ধর্ষণের ঘটনা ছিল ৬৩০টি। তাদের সিংহভাগেরই বয়স ১৮ বছর বা তার নিচে। আরও কয়েকটি শিশু সংস্থার ধর্ষণের পরিসংখ্যান আরো ভয়াবহ। লিখতে বিবেকে বাঁধছে। এইসব লোমহর্ষক খবর দেবার মতো না। আনন্দের খবর প্রচার করা যায় আনন্দচিত্রে। তাতে সমাজ উপকৃত হয়। সমাজ উন্নত হয়। মন্দ খবর প্রচার করা যায় না।
ধর্ষণ, গণধর্ষণ একের পর এক ঘটে চলছে। আসামীরা গ্রেফতার হচ্ছে। তাঁদের কাউকে কাউকে বুলেটপ্রুফ পোশাক পড়ে টিভিতে দেখছি আমরা। তাঁদের রিমান্ডে নেওয়া হচ্ছে এবং প্রায় সবাই ধর্ষণের কথা স্বীকার করছে। আমাদের দেশেই সম্ভবত এসব ভয়ংকর অপরাধিদের গণমাধ্যমে দেখানো হয়। বহুল আলোচিত তসলিমার কুখ্যাত আসামী মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজও তাঁর সহযোগিরা বাদিদের উদ্দেশ্যে কয়েকদিন আগে আদালত চত্বরে নানা ভঙ্গিতে চিৎকার, হুঙ্কার দিচ্ছে এও আমরা গণমাধ্যমে দেখেছি। এসব দেখাতে হবে কেন? এতে করে বাদির মনে প্রতিক্রিয়া হয়। পৃথিবীর কোন গণমাধ্যমে আসামীদের আদালত চত্বরের ছবি দেখানো হয় না মনে হয়। এখানে ফাঁসির ঘটনা লাইভ দেখানো হয়। প্রতিবেশি দেশ ভারতের মন্ত্রিসভা শিশুর ওপর ভয়াবহ যৌন অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদন্ডের বিধান রেখে একটি ধারা সংশোধন করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, যদি শিশুদের ধর্ষণ করা হয়, তাহলে তার শাস্তি হবে মৃত্যুদন্ড। আমাদের দেশে বেশিরভাগ মানুষ শিশু ধর্ষণ রোধে এই ধরনের শাস্তি চান মনে হয়। খোদ সরকারি দলের প্রভাবশালী সদস্যরাও প্রকাশ্যে ধর্ষণের শাস্তি চান। ’চিলড্রেন এ্যাক্ট’ অনুযায়ী ১৮ বয়সের নীচে সবাই শিশু হিসেবে গণ্য হয়। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে শিশুরা স্বাধীনভাবে স্কুল যাবে, খেলাধূলা করবে। এখন নানা কারণে শিশুরা প্রাইভেট, কোচিং সেন্টারে অধিক সময় থাকেন। সেই সময়গুলিতে শিশুদের অনেক মায়েরা স্কুলে, কোচিং সেন্টারে অবস্থান করেন। এখন মায়েদের মনে একটা দীর্ঘস্থায়ী ’ভয়’ দেখা দিল। কারণ সব মায়েদের কাছে তাঁর সন্তানই সবচেয়ে প্রিয়জন। কাছের মানুষ। আমি বেশ কিছু মায়েদের সাথে কথা বলেছি, তাঁরা অনেকেই শঙ্কিত, চিন্তিত।
ধর্ষণ, ধর্ষণকে কেন্দ্র করে হত্যা, আত্মহত্যা-এটাই এখন সর্বত্র আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মা, বোন, স্ত্রী, কন্যার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন- এমন মানুষের সংখ্যা এখন বাড়ছে। সামাজিক, জাতীয়ও রাষ্ট্রীয় ঘটনাপ্রবাহের দিকে দৃষ্টি দিলে বলতে হয়, বাংলাদেশে সভ্যতার সংকট চলছে। পরিবার, প্রতিষ্ঠান, সংগঠন, শিক্ষাব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা, প্রশাসনিক ব্যবস্থা-সবই মনে হয় ভেতর থেকে পচে যাচ্ছে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তির অপব্যবহার চলছে। নৈতিক চেতনা, মূল্যবোধ দুর্গত। মর্মান্তিক বিষয় হচ্ছে, দেশের লেখক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী-সাহিত্যিকদের মধ্যে এসব নিয়ে গভীর কোন চিন্তা নেই, প্রতিবাদ নেই। রাজনীতিবিদদের মধ্যে এসব নিয়ে যথেষ্ট উদ্বেগ নেই। নানা বিষয় নিয়ে যে ছাত্রসমাজ আন্দোলন করেন, তারাও নিশ্চুপ। শিশু সংগঠন বা নারী সংগঠনগুলিও প্রতিবাদী হয়ে রাস্তায় নামেনি। দেশের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এসময় সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারতো। প্রতিবাদ আসেনি ধর্মীয় সংগঠনগুলির কাছ থেকে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভূমিকাও সেভাবে চোখে পড়েনি। দেশের কোন স্থানে মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে। তবে ব্যাপক প্রতিবাদের ভূমিকা রাখছে সামাজিক মাধ্যম। তবুও আমরা আশায় থাকবো শিশু ধর্ষণের মতো জঘন্য বিষয়কে সরকার দ্রুত সমাধান করবে। আর মানুষ হিসেবে আমাদের যার যার অবস্থান থেকে প্রতিবাদী হয়ে উঠবো শিশু ধর্ষণের বিরুদ্ধে।
লেখক ঃ সহকারী অধ্যাপক-কলামিষ্ট
০১৭২৫-০৪৫১০৫