শিশুদের পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা কমাতে হবে

শিশুদের পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা কমাতে হবে

মো. ওসমান গনি  : সরকারের নিয়মনীতির প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে একশ্রেণীর অসাধু মুনাফাখোর লোকের কারণে আমাদের দেশের ভবিষ্যত প্রজন্ম শিশুরা আজ শিক্ষাক্ষেত্রে বইয়ের ব্যাগের বোঝা টানতে টানতে শিক্ষাক্ষেত্রে তাদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। সরকারের নির্দেশনা ও আদালতের রায়ের পরও শিশুদের পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা কমছে না। বরং সরকার অনুমোদিত বই ছাড়া হরেক রকমের বই শিশুপাঠ্যভুক্ত করছে এক শ্রেণীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এর ফলে শিশুরা বইয়ের ভারি ব্যাগ বহন করতে বাধ্য হচ্ছে। অথচ শিশুদের বইয়ের বোঝা কমাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা আছে। এ ব্যাপারে হাইকোর্টেরও একটি রায় আছে।
আড়াই বছর আগে এ রায় দিয়ে একটি আইন প্রণয়নের নির্দেশনা দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। কিন্তু বাস্তবে জাতীয় পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) বইয়ের ‘আকার’ ছোট ও দু-একটি অফিস আদেশ ছাড়া আর কিছু হয়নি। কিন্তু সরকারের তরফ হতে বলা হয়, আমাদের প্রকাশিত বইয়ের আকার ও ওজন খুবই কম। সরকারি কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এনসিটিবি প্রকাশিত বইয়ের অতিরিক্ত পড়ানো হয় না। এর সঙ্গে খাতা থাকে। সব মিলিয়ে প্রথম শ্রেণীর বইয়ের ওজন হয়তো এক কেজিও হবে না।
অথচ দেশের বিভিন্ন এলাকায়  বিভিন্ন বেসরকারি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত বাহারি নামের চটকদার বই শিশুপাঠ্যভুক্ত করা হয়েছে। প্রতিটি বইয়ের দাম আবার চড়া। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২০-২৫ পৃষ্ঠার বইয়ের দাম ৪০০-৫০০ টাকা। প্রথম শ্রেণীতে সরকারের পক্ষ থেকে বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের ওপর মাত্র তিনটি বই দেয়া হয়। কিন্তু এর বাইরে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে ১০টি পর্যন্ত পাঠ্যবই তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
এখনও দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিশুদের পিঠে বইয়ের বোঝা দেখা যায়। বিভিন্ন শ্রেণীর তুলনায় নার্সারি ও কেজি স্তরের শিশুদেরই বাড়তি বই বেশি। এর মধ্যে নার্সারি ক্লাসে ১০টি বই কিনতে বাধ্য করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে- শিশুদের বাংলা পড়া, লেখাশেখা, ছড়া বই, ইংলিশ, অক্ষর চেনা, ইংরেজি গ্রামার, সংখ্যা শিক্ষা, অঙ্ক, ছবি আঁকা ও আরবি শিক্ষা।
কেজিতে দেয়া হয়েছে- আমার সাথী বাংলা বই, এসো লেখা শিখি, ইংরেজি গ্রামার, মাই পিকচার ওয়ার্ড, মজার পড়া, অঙ্ক শেখা, পরিবেশ পরিচিতি, নৈতিক শিক্ষা, এসো রং নিয়ে খেলা করি, আদর্শ হিন্দু ধর্ম শিক্ষা।
এর মধ্যে প্রথম শ্রেণীতে ইংরেজি গ্রামার, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা, সাধারণ জ্ঞান, আদর্শ হিন্দু শিক্ষা ও বিদ্যাকুঁড়ি ছবি আঁকা। প্রশ্ন উঠেছে নার্সারি, শিশু ও প্রথম শ্রেণীতে গ্রামার বা ব্যাকরণ পড়ানো কতটা জরুরি। এভাবে অন্যসব শ্রেণীতেও যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত বই। তৃতীয় শ্রেণীতে অতিরিক্ত তিনটি বই পাঠ্য করা হয়েছে। এগুলো হল- বাংলা ব্যাকরণ, ইংরেজি গ্রামার ও ড্রইং। এ ছাড়া নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের গাইড কিনতে বাধ্য করা হয়েছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহর এমনকি জেলা-উপজেলার স্কুলেও একইভাবে অখ্যাত ও ভুইফোঁড় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিম্নমানের বই পাঠ্যভুক্ত করা হয়েছে। শিক্ষা কর্মকর্তাদের চোখের সামনে এসব অপকর্ম করা হলেও তারা কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না।
অতিরিক্ত বই পাঠ্যভুক্ত না করার ব্যাপারে এনসিটিবি বছরের শুরুতেই গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সতর্ক করে। কিন্তু এরপরও এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। এ ক্ষেত্রে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর সহায়তা ছাড়া আদালতের আদেশ ও সরকারি সার্কুলার বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। এটা বন্ধে উচ্চ পর্যায়ের একটি মনিটরিং কমিটি করা দরকার।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট
[email protected]
০১৮১৮-৯৩৬৯০৯