শিশু শ্রম আদৌ কি বন্ধ হবে

শিশু শ্রম আদৌ কি বন্ধ হবে

আব্দুল হাই রঞ্জু  : মূলত দারিদ্রতার কারণেই শিশুরা শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য হয়। অথচ মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে শিক্ষা অন্যতম। সেই শিক্ষা গ্রহণ না করে শুধু জঠর জ্বালা নিবারণের জন্যই শিশুদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে কাজ করতে হয়। যদিও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজির আওতায় ২০১২ সালের মধ্যে বিশ্ব থেকে ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রম বন্ধ করতে চায় জাতিসংঘ। এমনকি ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে শিশুশ্রম নির্মূল করার লক্ষ্য আছে এসডিজিতে। আবার ২০১৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে শিশু শ্রম নির্মুলের টার্গেট থাকলেও তা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। এ লক্ষ্যে পৌছুতে হলে প্রায় ৩৪ লাখ শিশুকে পুনর্বাসন করতে হবে। অথচ এ বিষয়ে সরকারের বার্ষিক কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় পরিধিও পর্যাপ্ত নয়। যদিও সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এক প্রকল্পের আওতায় ২০২০ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত প্রায় দুই লাখ শিশুকে পুনর্বাসন করতে চায়। এই পরিমাণ শিশুকে পুনর্বাসন করা সম্ভব হলেও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে আরো নিয়োজিত থাকবে প্রায় ১০ লাখ ৮০ হাজার শিশু। আবার উল্লেখিত সময়ের মধ্যে জীবিকার তাগিদে আরো শিশু কর্মক্ষেত্রে যোগ হবে। অর্থাৎ যে পরিমাণ শিশুকে পুনর্বাসন করা হবে, আবার সেই পরিমাণ শিশু কর্মক্ষেত্রে যোগ হবে। বরং শিশু শ্রম বন্ধ করতে হলে বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি করে শিশু পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতা বাড়াতে হবে, যার কোন বিকল্প নেই।

দাতব্য সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দারিদ্র, সংঘাত ও কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্যের ঝুঁকিতে রয়েছে বিশ্বের অর্ধেকের বেশি শিশু। উক্ত প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, এই ঝুঁকিগুলোর মধ্যে আলাদাভাবে ১২০ কোটি শিশু রয়েছে। মুলত গত ১ জুন আন্তর্জাতিক শিশু দিবসকে ঘিরে সংস্থাটি এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, দারিদ্র কবলিত দেশগুলোতে ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে প্রায় ১০০ কোটি শিশু। এর মধ্যে যুদ্ধ ও সংঘাত প্রভাবিত করছে ২৪ কোটি শিশুর জীবন। এর বাইরে যে সব দেশে নারীদের বিরুদ্ধে বৈষম্যকে স্বাভাবিক বিষয় মনে করা হয়, সেখানে ৫৭ কোটি ৫০ লাখ কন্যা শিশু ঝুঁকির মুখে রয়েছে। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী হেলে খনিং সখমিট বলেন, ২০১৫ সালে জাতিসংঘে প্রতিটি দেশ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিটি শিশু বেঁচে থাকবে, শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে এবং তারা সুরক্ষিত থাকবে। এখনই যদি দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয়, তাহলে প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না মর্মেও তিনি মন্তব্য করেন। উক্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৭৫ দেশের মধ্যে ৯৫টিতে শিশুদের উন্নতি হলেও বাকি ৪০টি দেশে অবনতি হয়েছে। যুদ্ধ ও ভয়াবহ সহিংসতায় শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে। আবার ৫ বছরের নিচের শিশুদের মৃত্যুহার, অপুষ্টিজনিত সমস্যা, শিক্ষার অভাব, বাল্যবিয়ে এবং শিশু শ্রমের ওপর ভিত্তি করে দেশগুলোর র‌্যাংকিং নির্ধারণ করে ১০টি মূল প্রবণতা চিহ্নিত করে তা নিরসনে পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সংঘাত ও নিপীড়নের কারণে গোটা বিশ্বে প্রতি মিনিটে ২০ জন মানুষ বা¯ুÍচ্যুত হচ্ছে। সংস্থাটির দৃষ্টিতে, গত এক বছরে ১৭৫টি দেশের মধ্যে ৫৮টি দেশে শিশুর স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা আগের তুলনায় আরো অবনতি ঘটেছে। তবে সাব সাহারান আফ্রিকার দেশের ৫১ শতাংশ, মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকার ৪৭ শতাংশ শিশুদের অবস্থার উন্নতি হয়েছে।

আমাদের দেশের শিশুশ্রম নিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিবিএস সর্বশেষ ২০১৩ সালে জরিপ করেছে। উক্ত জরিপে বলা হয়, দেশে প্রায় সাড়ে ৩৪ লাখ শিশু শ্রমে নিয়োজিত। এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত ১২ লাখ ৮০ হাজার শিশু। আর অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িত আছে ২ লাখ ৬০ হাজার শিশু। বিবিএসের মতে, ওই সময় ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিতের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৩ লাখ। এ হিসাব মতে, এক দশকের বেশি সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রমিকের সংখ্যা কমেছে মাত্র ২০ হাজার। প্রকৃত অর্থে আমাদের দেশে প্রতি বছর প্রায় ২০ লক্ষ কর্মক্ষম মানুষ শ্রম বাজারে যুক্ত হচ্ছে। যাদের কর্মসংস্থানের তেমন কোন সুযোগ নেই। কারণ দেশে সরকারি-বেসরকারিভাবে বিনিয়োগ বাড়ছে না। ফলে বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে তাদেরকে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। আর বিনিয়োগ না বাড়ায় কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হচ্ছে না। আবার কর্মসংস্থান না থাকলে আয়-রোজগারও বাড়ে না। এমতাবস্থায় মানুষের ক্রয় ক্ষমতা দিনে দিনে কমে আসছে। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমলে দোকানিরা থরে থরে পণ্যের পসরা নিয়ে আয়ের বসে থাকলেও বিক্রি বাড়ে না।

 অর্থাৎ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। যার বিরূপ প্রভাব পড়ে স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোয়। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র, ও নি¤œআয়ের পরিবারগুলোর দৈন্যদশা বেড়ে যায়। ফলে দরিদ্রতা বাড়ে এবং এসব পরিবারের শিশুরা শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য হয়। বাহ্যিকভাবে দেশের অবকাঠামোগত উন্নতি ঘটলেও প্রকৃত অর্থে সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। উল্টো শোষণ বঞ্চনার শিকার হয়ে বা¯ুÍচ্যুত হয়ে মানুষ ছুটছে নগর মহানগরগুলোয়। ফলে জৌলুসে ভরা সুবিশাল অট্টালিকার নিচে বস্তিবাসীর সংখ্যা ক্রমান্বয়েই বাড়ছে। যেখানে কর্মক্ষম একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের কর্মসংস্থানের গ্যারান্টি নেই, সেখানে অবুঝ শিশুদের বাঁচতে হলে শ্রম বিক্রির কোন বিকল্পও নেই। আর সস্তা শ্রমের ওপর ভর করে দেশের বিত্তশালীদের বিত্ত আরো সমৃদ্ধ হচ্ছে। অথচ সরকারিভাবে দাবি করা হয়, ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত মাত্র ৯০ হাজার শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম থেকে বের করে আনা সম্ভব হয়েছে (সুত্র: বাংলাদেশের খবর ১২/০৬/১৮)। এখানে স্পষ্ট, যেখানে দীর্ঘ ১০ বছরে মাত্র ৯০ হাজার শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম থেকে বের করার কথা স্বীকার করা হচ্ছে, সেখানে ১০ বছরে আরও যে কয়েক লাখ শিশু শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে, তা সহজে অনুমেয়।

যদিও শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মোঃ মজিবুল হক এ প্রসঙ্গে বলেন, ২০১৬ সালে লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব হয়নি, তবে ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। তিনি আরো বলেন, কোন কোন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে কত শিশু নিয়োজিত আছে, তা নিরুপণে জরিপ হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনে সামগ্রিক কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণেরও কাজ চলছে। ইতিমধ্যেই সরকার ৩৮টি খাতকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে। এ বিষয়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের শিশু বাজেটে বলা হয়েছে, গত তিন বছরে শিশু সুরক্ষায় নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৫০ হাজার শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম থেকে সরানো হবে। আর এক লাখ শিশুকে কারিগরি শিক্ষা দেওয়া হবে। শিক্ষা শেষে তারা যেন কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে। বাস্তবে আমাদের দেশে বিপুল পরিমাণ শিশু শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। যারা জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন খাতে কাজ করতে বাধ্য হয়। আবার কর্মক্ষেত্রে এসব শিশুদের ওপর নানাভাবে নির্যাতন করা হয়। তবুও ওরা কাজ করতে বাধ্য হয়, কারণ খেয়ে পরে বেঁচে থাকতে হলে কাজ না করে উপায় বা কি আছে? খোদ বিবিএস সুত্র বলছে, কর্মক্ষেত্রে প্রতিনিয়তই শিশুদের ধমক, অপমান, শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে। এমনকি অনেক শিশুকে যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। বিবিএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্মকালীন নিরাপত্তার অভবের শিকার হচ্ছে ১ দশমিক ২ শতাংশ শিশু শ্রমিক। যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে ২ দশমিক ৫ শতাংশ শিশু শ্রমিক। মূলত সিটি কর্পোরেশন এলাকায় যৌন নির্যাতনের হার ৯ দশমিক ৭ শতাংশ, গ্রামাঞ্চলে এ হার ১ দশমিক ৩ শতাংশ। ১২ থেকে ১৩ বছর বয়সের শিশুরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছে মর্মে বিবিএসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

শিশুশ্রম, শিশুনির্যাতনের ভয়াবহ এ চিত্র বাংলাদেশেই নয় বরং গোটা বিশ্বে প্রবলভাবে বিদ্যমান। এ প্রসঙ্গেঁ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বা আইএলওর পর্যালোচনা হচ্ছে, ২০০০ সালের পর থেকে বিশ্বের শিশু শ্রমিকের সংখ্যা কিছুটা কমেছে। যা ২০০০ সালে ছিল ২৪ কোটি ৬০ লাখ। বর্তমানে এ সংখ্যা হচ্ছে ১৬ কোটি ৮০ লাখ। যখন উন্নত দেশগুলো যুদ্ধ এবং যুদ্ধাস্ত্র তৈরিতে হাজার হাজার কোটি ডলার ব্যয় করছে, তখন বিশ্বের কোটি কোটি শিশুর মৌলিক অধিকার বিপন্ন হচ্ছে। যারা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে এক মুঠো খাবারের জন্য জীবনের সংগে যুদ্ধ করছে। তখন মানবতার কি পরিমাণ লংঘন হচ্ছে, তা সভ্য যুগে বসবাস করেও আমাদের বিবেককে সামান্যতম কি নাড়া দেয়? না, কারণ সা¤্রাজ্যবাদি গোষ্ঠীকে যে কোন মূল্যেই হোক নিজেদের অধিকার প্রভাব প্রতিপত্যকে অস্ত্র দিয়ে হলেও সমুন্নত রাখতে হবে। এটাই বাস্তবতা। বাস্তব এ অবস্থার পরিবর্তন ছাড়া প্রকৃত অর্থে নিষ্পাপ শিশুদের বাসোপযোগী পৃথিবী বিনির্মাণ করা কস্মিনকালেও সম্ভব হবে না। এ কারণেই গোটা বিশ্বের শোষিত মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বদলাতে হবে তথাকথিত উন্নত দেশের লেবাসে থাকা সা¤্র্রাজ্যবাদি, আধিপত্যবাদি শক্তি এবং তাদের তাঁবেদারদের। যতদিন তা করা সম্ভব হবে না, ততদিন আপেক্ষিক অর্থে শিশুশ্রম, শিশু নির্যাতন বন্ধে নানা প্রতিশ্রুতি, নানা প্রকল্প গৃহীত হবে সত্য, কিন্তু বাস্তবে অমানবিক এসব আচরণ বন্ধ করা আদৌ সম্ভব হবে না। এটাই নিখাদ সত্য।
লেখক : প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৯২২-৬৯৮৮২৮