শিক্ষার বন্ধুর পথ চলা মসৃণ হোক

শিক্ষার বন্ধুর পথ চলা মসৃণ হোক

রায়হান আহমেদ তপাদার : শিক্ষা নিয়ে প্রচুর কথা চলছে বেশ কয়েক বছর থেকে। তৃণমূল থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত সবার মুখে শিক্ষা শব্দটি বহুবার উচ্চারিত হয়। হতাশার দীর্ঘশ্বাস ফেলে এ কথা বলতেও শোনা যায় আগের দিনের পড়ালেখা এখন আর আমাদের দেশে হচ্ছে না। কিন্তু কেন হচ্ছে না, তা কেউ তলিয়ে দেখছেন না। হা-হুতাশ করেই সেমিনার-গোলটেবিল বৈঠক বা আলোচনাসভা শেষ হচ্ছে। এটা করতে হবে, সেটা করতে হবে, ভূমিকার মধ্যেই শেষ, উপসংহার কেউ টানেন না। মানসম্মত শিক্ষার জন্য প্রথমে দায়ী শিক্ষকরা। কারণ তারা পেশাদারিত্ব আনতে পারেননি। সবাই নয়, শতকরা আশিজন। মাত্র বিশভাগ কমিটেড শিক্ষক নিয়ে আমাদের শিক্ষা কোনোরকমে চলছে। বাকি আশিভাগ শিক্ষক চাকরি করেন।

 শিক্ষকতা এবং চাকরি দুটো ভিন্ন বিষয়, যারা নিজেদের প্রাণ দিয়ে খেটে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করেন; শ্রেণিকক্ষই তার সব ভালোবাসার স্থান, তারাই প্রকৃত শিক্ষক। শিক্ষা ও শিক্ষকদের নিয়ে গড়ে ওঠা সব স্তরের শিক্ষা সংগঠনগুলো শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য কোনো আন্দোলন করেনি। করেছে নিজেদের মর্যাদার জন্য, আর্থিক উন্নয়নের জন্য, চাকরি পাওয়ার জন্য, বদলির জন্য, পদোন্নতির জন্য, বেমালুম ভুলে গেছেন শিক্ষার মান উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে তাদেরও মর্যাদার উন্নয়ন ঘটবে সে কথাটি। জাতীয় পাঠ্যপুস্তক বোর্ড শিক্ষার্থীদের বয়স ও চাহিদার কথা বিবেচনা করে বই প্রকাশ করে না। ফলে শিক্ষার্থী বই পড়ে আনন্দ পায় না। তাই তারা বই পড়তে আগ্রহী নয়। পাঠ্যবই না পড়লে তো অবশ্যই কিছু একটা পড়তে হবে। হাতের কাছে গাইড বই, সেটাই শেষ ভরসা। নিজের সব সৃজনশীলতাকে মুছে ফেলে গাইড বই মুখস্থ করে পাস করার জন্য পরীক্ষা দেয়। পরীক্ষায় পাস করে; কিন্তু জ্ঞান অর্জন হয় না।
 
অন্যদিকে যারা শিক্ষকতা করেন, তারাই প্রশ্ন করেন, তাদের অধিকাংশই জানেন না প্রশ্ন কীভাবে করবেন। মানহীন প্রশ্নের উত্তর শ্রীহীন হয়। শিক্ষাও মানসম্মত নয়।পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে (পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি) এক স্কুলের শিক্ষার্থী অন্য স্কুলে পরীক্ষায় বসে। দুই স্কুলের মধ্যে বোঝাপড়া থাকে কেউ কোনো শিক্ষার্থীকে কিছু বলবে না। শিক্ষার্থীরা তাদের ইচ্ছামতো কথা বলবে, দেখাদেখি করবে, লিখবে, পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করবে, প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকের, সাময়িকভাবে শিক্ষার্থীর সুনাম বাড়বে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে মানহীন শিক্ষা অর্জিত হবে। শিক্ষার্থীরা জীবনের সর্বনাশ ডেকে আনবে। মানহীন শিক্ষা অর্জনের মধ্য দিয়ে ভালো ফলাফল করবে। কিন্তু ফাইনাল গোলে পৌঁছতে পারবে না। একই চিত্র প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা সর্বত্র।

 কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানপ্রধান ঘরের বিদ্যুৎ, হাট, বাজার, ফার্নিচার প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও সম্পত্তি মনে করে ব্যবহার করেন। এ প্রসঙ্গে কেউ কিছু বলতে চাইলে গোখরোর মতো ফণা তোলেন। কিন্তু তাদের মূল দায়িত্ব পাঠদান ও পাঠগ্রহণের কাজটি শিক্ষকরা যথাযথভাবে করছেন কি না, যথাসময়ে শিক্ষকরা উপস্থিত হচ্ছেন কি না, তা তদারকি তিনি করেছেন না। ফলে মানসম্মত শিক্ষাও পরিণত হচ্ছে সোনার হরিণে। প্রতিষ্ঠানপ্রধানরা শিক্ষকদের ওপর যতটা খবরদারি করেন তার একশভাগের একভাগও ছেলেমেয়ে অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর নেন না। কয়জন প্রতিষ্ঠানপ্রধান আছেন প্রত্যেকটা শিক্ষার্থীকে জানেন, তাদের বাবা-মার খবর রাখেন, তাদের বাড়িঘর পরিদর্শন করেছেন বা তাদের আর্থিক অবস্থার কথা জেনে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেছেন বা চেষ্টা করেছেন ইতিবাচক কিছু করার।

এছাড়া সব স্তরের শিক্ষকের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, পাঠদানে আন্তরিকতার অভাব, শ্রেণি কার্যক্রমে শিক্ষা উপকরণ ব্যবহারে অনীহা, শিক্ষার্থীদের পাঠে সক্রিয় করতে না পারা ইত্যাদি মানসম্মত শিক্ষার পথে বাধা। এছাড়া স্কুল-মাদ্রাসাগুলোর শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ গ্রহণে প্রতিষ্ঠান প্রধান ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের অসহযোগিতা অন্যতম কারণ। এ কথাও মনে রাখতে হবে, প্রকৃত শিক্ষকদের মৃত্যু নেই। কেন বিরাট সংখ্যক শিক্ষক পাঠদানে আন্তরিক নন, কারণ তারা বিভিন্ন উপায়ে চাকরি পেয়েছেন। প্রথম উপায় স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে স্কুল প্রতিষ্ঠাকালীন যারা বাঁশ-বেতের জোগান দিয়েছেন, তারা পরবর্তী সময়ে স্কুলের জুনিয়র শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন।

 নকলের বদৌলতে ডিগ্রি পাস করে শিক্ষক হয়েছেন, পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠান প্রধানও হয়েছেন; কিন্তু লেখাপড়ার যে ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে প্রকৃত শিক্ষক হওয়ার কথা ছিল, তা তিনি করেননি। আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা তাদের মতাদর্শী ছেলেমেয়েদের শিক্ষকতায় নিয়োজিত করেছেন। কতটা জানেন, তা বিচার না করেই। এটা সব রাজনৈতিক সরকারের সময়ে হয়েছে। এতে মানসম্মত শিক্ষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাননি। শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন রাজনৈতিক পরিচয়ে। অসাধু রাজনীতিবিদ এবং তথাকথিত সমাজপতিরা অর্থের বিনিময়ে শিক্ষকতা করার সুযোগ করে দিয়েছেন বেশকিছু সংখ্যক শিক্ষককে, যার জের টেনে আমরা এখনও শেষ করতে পারছি না। এসব কারণেই পড়াবিমুখতা। তারই পথ ধরে মানহীন শিক্ষা। এদের মধ্যে অনেকেই ধীরে ধীরে বড় হয়েছেন, প্রতিষ্ঠান প্রধানের দায়িত্ব নিয়েছেন। ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে।

এ কথা সত্য, কচু গাছ লাগালে যেমন আম খাওয়া যায় না, তেমনি ভালো শিক্ষক না থাকলে ভালো ফলও পাওয়া যাবে না। উল্লেখ্য ম্যানেজিং কমিটি বহুক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করে আর শিক্ষকদের মনে করে তাদের কেনা গোলাম। যেমন মনে আসে, তেমন করে ব্যবহার করেন। আবার অনেক ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বা সদস্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান মনে করে মাস শেষে, বছর শেষে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা করেন। মানহীন গাইড বই, সহায়ক বই নাম দিয়ে প্রকাশকদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য হারে অর্থ আদায় করেন। আবার এ অর্থ নিয়ে প্রতিষ্ঠান প্রধান ও অন্য শিক্ষকদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন। তাদের পছন্দ না হলে বা তাদের কথামতো না চললে বিভিন্ন ধরনের অজুহাত দেখিয়ে স্কুল থেকে বের করে দেওয়ার কৌশল বের করেন। একবারও ভাবেন না এ শিক্ষকরা আমাদের এলাকাকে আলোকিত করেছেন।

 আমাদের ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা শিখিয়ে মানুষ করছেন। বরং শিক্ষার্থীদের সামনে শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করতে এতটুকু ভাবেন না। সম্মানিত ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে বহুবার কথা উঠেছে। আমি সেদিকে যাব না, তার কারণ শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ থাকলেই চলবে না। ভেতরের মানুষটিও আলোকিত মানুষ হতে হবে। অনেক নিরক্ষর ব্যক্তি আছেন, যাদের ব্যবহার সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। আবার কেউ কেউ আছেন তারা নামে উচ্চশিক্ষিত প্রকৃত মনের আলো নেই। তারা শিক্ষিত কিন্তু সুশিক্ষিত নন। শিক্ষকদের পাঠ্যপুস্তকবিমুখতা মানসম্মত শিক্ষার ক্ষেত্রেও বিরাট বাধা। কালের প্রবাহে গা ভাসিয়ে শিক্ষকরাও গাইড বইমুখী হয়েছেন। অতি তাড়াতাড়ি বড় লোক অর্থাৎ গাড়ি-বাড়ির মালিক হওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি কোচিং সেন্টারে গিয়ে সময় দিচ্ছেন।
 
এমনকি অসততার পরিচয় দিচ্ছেন প্রাইভেট পড়া শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বলে দিয়ে। এতে আর যাই পান, মনের ভেতরের শ্রদ্ধাটা পাওয়া যায় না। এই শিক্ষার্থীরাই একদিন বড় হলে বুঝবেন শিক্ষকরা তাদের জীবনের কত বড় ক্ষতি করেছেন। কথায় আছে পুঁজি নেই তো ব্যবসা নেই। পড়ালেখা না জানলে প্রতিযোগিতার বাজারে বেঁচে থাকা কঠিন, কোথাও ভর্তি হতে গেলে পাস করছে না। চাকরির ইন্টারভিউয়ে টিকছে না। তার কারণ মানসম্মত শিক্ষা অর্জন করতে পারেনি। পাসের জন্য পড়েছে। নির্দিষ্ট গ্রেড পাওয়ার জন্য পড়েছে। মানুষ হওয়ার জন্য, মানবিক গুণের অধিকারী হওয়ার জন্য, সমাজে গ্রহণযোগ্য মানুষ হওয়ার জন্য পড়েনি। অভিভাবকরাও এর খোঁজখবর রাখেননি। সে কারণে কান্নায় হতাশা-কষ্ট এখন অধিকাংশেরই সঙ্গী। বরং কোনো কোনো বাবা-মা-শিক্ষক অন্যায় কাজে সহযোগিতা করেছেন কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীকে উত্তর বলে দিতে শিক্ষককে বাধ্য করেছেন।

 ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র জোগাড় করে দিয়েছেন। এতে লেখাপড়ার মান কমেছে। শিক্ষার দাম কমেছে। শিক্ষা পণ্যে পরিণত হয়েছে। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান যেমন সিটি করপোরেশন, সিডিএ, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, বন বিভাগ, বাংলাদেশ রেলওয়ে, পাটকল সংস্থা, সার কারখানাসহ অসংখ্য ব্যক্তি মালিকানায় গড়ে ওঠা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের পেশাগত প্রশিক্ষণ (বিএড) গ্রহণের জন্য ছুটি প্রদান না করা মানসম্মত শিক্ষার পথে অন্যতম বাধা। পরিশেষে বলব অঞ্চলভিত্তিক বা এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মাসে একবার ক্লাস্টার ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করলে শিক্ষকের পাঠদানের মান বাড়বে, ফলে শিক্ষার ও মান বাড়বে। এছাড়া শিক্ষকদের মধ্যে দলাদলি বন্ধ করতে হবে। এতে ম্যানেজিং কমিটি শিক্ষকদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। শিক্ষকদের মূল কাজ বাস্তবিকতার সঙ্গে পাঠদান এ কাজটি যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে পারলে অনেকটাই করা হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায়।

পাঠ্যক্রমিক শিক্ষার পাশাপাশি পাঠ্যক্রমিক কার্যাবলি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রচলন থাকলে শিক্ষা পূর্ণতায় মান ও বৃদ্ধি পায়। সরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়গুলোতে সাধারণ কলেজের প্রশিক্ষণ বিহীন শিক্ষকদের বদলি বন্ধ করতে হবে। নামমাত্র লেখাপড়ার প্রশিক্ষণ সনদ সংগ্রহ করা থেকে বিরত রাখতে হবে। শিক্ষার সব স্তরে শিক্ষায় স্নাতক ডিগ্রি ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিসম্পন্ন ব্যক্তিকে পদায়ন করতে হবে। যেমন মহাপরিচালকের দপ্তরের প্রশিক্ষণ শাখা, আঞ্চলিক অফিসগুলো, জেলা শিক্ষা অফিস, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস, প্রাথমিক শিক্ষা অফিস, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা বোর্ড, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, নায়েম, এনসিটিবি, এইচএসটিটি আইবি, এমটিটিআই, টিটিসি, আইইআসহ সব উচ্চ পর্যায়ের প্রশিক্ষণ ভেন্যুগুলোতে প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ সময়ের দাবি। কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও সমান নজরদারিতে আনতে হবে। তাহলে শিক্ষার বন্ধুর পথ চলা মসৃণ হবে।
লেখক : কলামিস্ট
[email protected]