শিক্ষা কতটা সেবা না পণ্য

শিক্ষা কতটা সেবা না পণ্য

অলোক আচার্য : শিক্ষা মানুষের মধ্যেকার অন্তর্নিহিত শক্তি জাগ্রত করার কাজ করলে বাস্তবিক ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ সঠিকভাবে হচ্ছে না। শিক্ষা তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সফল হচ্ছে না। প্রয়োগের উদ্দেশ্য এবং ধরনেই এমনটা হচ্ছে বলাই যায়। আমাদের দেশে চলে আসা শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে বহুবার ঘষামাজা করা হয়েছে। কখনো কোন বিষয় বাতিল করা হয়েছে আবার প্রয়োজনের খাতিরে কোন বিষয় বাদ দেয়া হয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থা প্রসারে ভূমিকা রেখেছিল ব্রিটিশরা। মূলত ব্রিটিশদের তৈরি করা শিক্ষা ব্যবস্থাতেই কিছুটা পরিবর্তন করে আজও আমাদের দেশে চলছে। ব্রিটিশ ভারতে আধুনিক একটি শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়নের দায়িত্ব পেয়েছিলেন লর্ড মেকলে সাহেব। লর্ড মেকলে সাহেবের এ উপমহাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন নিয়ে একটি চিন্তা চেতনা ছিল এরকম- ” তিনি ১৮৩৫ সালের ২ ফ্রেবুয়ারি ব্রিটিশ সংসদে তার বক্তব্যে বলেছিলেন, আমি ভারতের আনাচে-কানাচে ঘুরেও একজন ভিক্ষুক কিংবা একজন চোরের দেখা পাইনি। এদেশে এতটা ধনসম্পদ, এদেশের মানুষের মধ্যে নৈতিক চরিত্রের এতটা উচ্চস্তর দেখেছি যে, এদেশবাসীর শিক্ষা,তাদের ধর্মবিশ^াস,সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পুরোপুরি ভেঙে দিতে না পারলে আমরা কোনদিনই দেশটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবো না।”  এই ভাষণে তিনি প্রস্তাব করেছিলেন,’ আমরা এসব ঐতিহ্যগত শিক্ষাব্যবস্থা আর সংস্কৃতিকে এমনভাবে বদলে দেব যেন তারা যা কিছু বিদেশী, যা কিছু ইংলিশ,সে সব কিছুকেই তাদের নিজেদের চেয়ে উৎকৃষ্ট ভাবতে শিখবে। ফলে নিজেদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে তারা, ঠিক আমরা যেমনটা চাইবো, তেমনই একটি আত্মবিস্মৃত পদানত জাতিতে পরিণত হবে।” ইংরেজ সাহেবদের সেই ইচ্ছার প্রতিফলন আজও আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় দেখতে পাই। নিজেদের সংস্কৃতিকে গুলিয়ে আমরা পর সংস্কৃতির শিক্ষাই লাভ করতে শিখেছি। শিক্ষা প্রদান একটি সেবামূলক কাজ হলেও বিষয়টি আজ রীতিমত বাণিজ্যিক একটা ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। আমাদের দেশে কয়েক বছর আগে থেকেই শিক্ষা নিয়ে ব্যবসা করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভালো মানের স্কুল, ভালো ফলাফল, নামী দামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সার্টিফিকেট এসব নিয়ে বাণিজ্য হয়। আবার এক শ্রেণির দালাল বড় বড় ডিগ্রির সার্টিফিকেট বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা আয় করছে। সেসব ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়ে অনেকে চাকরিও করছে। শিক্ষা যদি পণ্য না হয় তো আর এত সহজলভ্য পণ্য কি আছে। দেশে কিন্ডারগার্টেনের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। একটা প্রতিষ্ঠানের গা ঘেঁষে আরেকটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকেই কেবল একটি বিল্ডিং ভাড়া করে গড়ে উঠছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একটাই লক্ষ্য ভালো ফল করানো।

পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে দেশে রীতিমত যুদ্ধ হয়। সেটা হলো জিপিএ-ফাইভ নিয়ে। এটা রীতিমত দেশের অভিভাবকদের কাছে মানসম্মানের ব্যাপার। সন্তান যদি জিপিএ ফাইভ না পায় তাহলে পাড়া মহল্লাাসুদ্ধ মানুষ গালমন্দ করতে থাকে। এমনকি নিজের মা বাবার মুখটাও সারাক্ষণ ভার হয়ে থাকে। কয়েক বছর ধরে মানে জিপিএ প্রথা চালু হওয়ার পর থেকেই এ রকম একটা ব্যাপার চোখে পড়ছে। আমাদের সময়কালে জিপিএ ছিল না, ছিল ডিভিশন। সেখানে এখনকার মত গ্রেড পয়েন্ট ছিল না তবে স্টার মার্কস, লেটার মার্কস,বোর্ড স্ট্যান্ড এসব বড় বড় সব স্থান ছিল। এখন সেসব নেই। যুগের পরিবর্তনের সাথে সবকিছু পরিবর্তন হয়। এটাও না হয় হয়েছে। কিন্তু তাই বলে জিপিএ বিক্রি হবে এটা মেনে নেওয়া যায় না। সর্বোচ্চ ফলাফল যদি কেনা সম্ভব হয় তাহলে সেখানে শিক্ষার মান বলে কিছুই থাকে না। অবশ্য আমাদের দেশে অনেক জিনিসই কিনতে পাওয়া যায়। সার্টিফিকেট কেনা বেচা তো হয়ই। রেজাল্ট, সার্টিফিকেট এমনকি মনুষ্যত্ব পর্যন্ত বিক্রি হয়ে যায় এদেশে। মনুষ্যত্ব বিক্রি করে দিব্বি চোখ বুঁজে চাকরি করে যাচ্ছে সারাজীবন।  

এই সিন্ডিকেটটা দেশের বারোটা বাজিয়ে দিল। শিক্ষাখাতে সিন্ডিকেট, নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজারে সিন্ডিকেট, পরিবহণে সিন্ডিকেট। সাধারণ পাবলিকের সিন্ডিকেট কোথায়? এর পর চাকরির বাজারে এসেও নানা কারসাজি হয়। এখানেও প্রশ্ন ফাঁসের গোলমাল আছে, আছে টাকা এবং লোকবল খাটিয়ে পরীক্ষার হলেই ম্যানেজ করার কারসাজি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় এরকম কারসাজি করতে গিয়ে অনেকেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছে। এর মধ্যে একজন কলেজের অধ্যক্ষও রয়েছেন। তিনি নাকি বহুবছর যাবৎ তার সিন্ডিকেট দিয়ে এসব অপকর্ম করে গেছে। তার নাকি বড় বড় সব ডিগ্রী আছে। সাথে আছে পিএইচডি! বাঁকা পথে সার্টিফিকেট অর্জন করে যারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাথা উঁচু করে চলাফেরা করছে। তাদের মনের মধ্যে কি কখনো এই পাপের জন্য একটুও অনুশোচনা হয় না। এভাবে দেশের বিভিন্ন সেক্টরে মেধাবীদের সাথে মেধাবীহীনরা প্রবেশ করেছে। আর তাই ভালোর সাথে খারাপ মিশে দেশটার বারোটা বাজাচ্ছে। কারণ যারা এভাবে পেছন দিয়ে উঁচু জায়গায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখে তাদের দ্বারা দেশের উন্নয়ন হওয়া সম্ভব না। এদেশে উচ্চ শিক্ষা লাভের রাস্তাটা আজও বেশ ব্যয়বহুল।  
একসময় দেশে পরীক্ষায় নকল করার একটা প্রবণতা ছিল। তখন পাসের হারও কম ছিল। কিন্তু সবাই নকল করতে পারতো না। তবে আশ্চর্যের বিষয় কিন্তু সেটা নয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো সেসময় পরীক্ষার কেন্দ্রে অসদুপায় অবলম্বন করলেও শিক্ষার্থীদের মেধা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতো না। কে পরীক্ষার কেন্দ্রে নকল করেছে সে বিষয়টার স্বাক্ষী কেবল আরেক পরীক্ষার্থী থেকে যেত। আজ কেন্দ্রের সামনে লেখা থাকে নকলমুক্ত পরীক্ষা কেন্দ্র। তবে শিক্ষার্থীদের মেধা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় কেন?
অনেক বড় বড় লেখক কবিদের আর্থিক অবস্থা ভাল থাকার পরেও কিন্তু তাদের অভিভাবকরা শুধু বড় চাকরি পাওয়ানোর উদ্দেশ্যে লেখাপড়া করাননি বরং তাদের ইচ্ছানুযায়ী পড়ার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে আজ সারা বিশ্বে বেশিরভাগ উচু দরের মানুষ কিন্তু নিজের ইচ্ছানুযায়ী পড়ালেখা করে তারপর সৃষ্টিশীল কোন কাজে বিখ্যাত হয়েছেন। শুধু চাকরি বাকরি করে টাকা কামাতে চাননি। বরং স্বপ্ন দেখেছেন আরও দশ জনকে চাকরি দেওয়ার। তাই আমাদের অভিভাবকদের বোঝা উচিত যে সন্তানের মেধা যে পথে বিকশিত হবার সুযোগ পায় বা পূর্ণতা লাভ করে সে পথেই তার প্রকৃত মঙ্গল রয়েছে। বাকি পথ কেবল জোর জবরদস্তির। আবার বিজ্ঞান বিভাগে পড়ালেখা করলেও আবিষ্কারক হওয়ার কথা কিন্তু তেমন একটা কেউ বলে না।

 কারণ প্রথম প্রথম ওতে শুধুই ধৈর্য্য লাগে পয়সা আসে না। কিন্তু অবাক বিষয় হলো মাঝে মাঝে পত্রিকায় দেশের আনাচে-কানাচে যেসব আশা প্রদানকারী নতুন কিছু আবিষ্কারের খবর চোখে পড়ে তার বেশিরভাগই তেমন উচ্চ শিক্ষিত নয়। বরং দীর্ঘদিন ওই বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে করতে একান্তই ইচ্ছা থেকে সে আবিষ্কারটি করে ফেলে। এখানে বিজ্ঞান তার কাছে নেশা বা ভালবাসা। তাই বিষয়ভিত্তিক ভালোবাসা ভিন্ন বিষয়। কোন একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে ফেল করলেই সবকিছু শেষ হয়ে যায় না। বরং অন্য কোন বিষয়ে তার আগ্রহ আছে ধরে নিতে হবে। কোন নির্দিষ্ট পরীক্ষায় ফেল বা কম মার্ক পেলেই জীবনের সবকিছু শেষ হয়ে যায় না। জীবনের সাফল্য ব্যর্থতা নির্ভর করে মনুষ্যত্ব অর্জনে আর তাই যারা পরীক্ষায় ফেল করেছে বা আশানুরূপ ফল করতে পারে নি তারা যেন সব শেষ হয়ে গেছে এটা মনে না করে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সঙ্গ দিতে পারে সন্তানের অভিভাবক। যেসব কলেজে কোন শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি সেসব কলেজ থেকে ভবিষ্যতে মেধাবী কেউ বের হবে না সে গ্যারান্টি কেউ দিতে পারেনা। তবে পাস না করার কারণ খতিয়ে দেখা দরকার। কলেজ কর্তৃপক্ষের গাফিলতি প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নিতে হবে। দক্ষ জনসম্পদ তৈরি করতে মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীই প্রয়োজন। পাসের হার বৃদ্ধি করে আপাত শিক্ষার প্রসার হলেও মান না বাড়লে স্থায়ী ক্ষতি হয়। শিক্ষার বাণিজ্যিকিকরণ আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য মারাত্বক। শিক্ষা যদি কোন ইতিবাচক মানসিকতা গড়ে তুলতে না পারে তাহলে ধরে নিতে হবে সেই শিক্ষা কেবল বিষ ঢেলেছে অমৃত নয়। আজ যারা বড় বড় পদে থেকেও বড় বড় চুরি করছে তারাও তো শিক্ষিত। তাহলে এই অন্যায় তারা করছে কিভাবে। এটা সম্ভব হচ্ছে কারণ তারা শিক্ষা অর্জন করলেও তা সার্টিফিকেট অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। আর তাই শিক্ষা বিষয়টা আজ এতটা প্রশ্নবিদ্ধ। লেখক ঃ সাংবদিক-কলাম লেখক    
   [email protected]
০১৭৩৭-০৪৪৯৪৬