শাবান মাসে করণীয়

শাবান মাসে করণীয়

মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ : কুরআন সুন্নাহ মোতাবেক শা’বান মাসে আমাদের করণীয় বিষয়গুলি অনেকেই জানেনা। যারা জানেন তাদের জানা বিষয়টি সমাজে প্রচলিত নেই বললেই চলে। কমসংখ্যকই মুসলিম আছেন বিষয়টি অনুধাবন করেন এবং সুন্নাহ মোতাবেক আমল করেন। অধিকাংশরাই এ মাসের আমল সম্পর্কে সুন্নাতের খবর রাখে না। বরং আগের মতই কিছু আনুষ্ঠানিকতা পালন করাই যথেষ্ট মনে করে। এতেই সবাই খুশি। তবে মুমিনের জন্য উচিত, যে কোন ইবাদত রাসুলুল্লাহ (সা) এর সুন্নাত বা পদ্ধতি কিংবা সাহাবীগণের পদ্ধতি অনুসারে পালন করতে হবে। যদি কোন ইবাদত রাসুলের কিংবা সাহাবীদের পদ্ধতির খেলাফ হয়, তাহলে যত আন্তরিকতাই থাক না কেন এই ইবাদত কোন অবস্থাতেই আল্লাহর দরবারে গৃহীত বা কবুল হবে না। বরং ক্ষেত্র বিশেষে গুণাহ হতে পারে। তাই প্রতিটি মুমিনের জন্য কর্তব্য হলো ইবাদত করলে আগে সঠিক পদ্ধতি জেনে নেয়া। আসুন এ মাসে আল্লাহর নবী এবং নবীর সাথীরা যে আমল করতেন তা জেনে নিয়ে নিজেও আমল করি অপরকেও করতে উৎসাহিত করি। প্রাক ইসলামিক যুগে আরবরা শা’বান মাস আমলে লুট তারাজের জন্য বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়ে পড়তো। রজব মাসকে সম্মানিত হলে মনে করে যুদ্ধ বিগ্রহ, মারামারি, লুট-তারাজ ইত্যাকার খারাপ কাজ বন্ধ রাখতো আর শা’বান চাঁদ উঠলে পরের দিন হতে পূর্বের মতই আবার খারাপ কাজের জন্য ছড়ে পড়তো। ইসলাম যখন প্রতিষ্ঠিত হলো তখন রাসুলুল্লাহ (সা) শা’বান মাসে বেশি বেশি সিয়াম পালন করতেন। প্রশ্ন করা হলো আপনি এ মাসে কেন বেশি বেশি সিয়াম পালন করেন উত্তরে তিনি বললেন এ মাসে বান্দার আমল আল্লাহর কাছে চলে যায় তাই আমি চাই সিয়াম অবস্থায় আমার আমল আল্লাহর কাছে চলে যাক।

 মানুষের অসৎ প্রবৃত্তি দমনের জন্য সিয়াম হলো সবচেয়ে মহৎ ফর্মুলা। শা’বান মাসে সিয়াম পালনের মাধ্যমে মুমিন তার প্রবৃত্তিকে পরিচ্ছন্ন করে রমজানের সিয়াম পালনের উপযোগী করে তুলবে এটাই এ মাসের সিয়ামের তাৎপর্য। আবার অতিরিক্ত সিয়াম যেন মুমিনকে দুর্বল করে না তোলে এ জন্য মাসের ১৫ তারিখের পর রোজা না রাখার জন্য হাদীসে উৎসাহিত করা হয়েছে। ইসলাম মানুষের স্বভাবজাত ধর্ম। অন্য কথায় ইসলাম সহজ ও সরলতার ধর্ম। মানুষের অসাধ্য কিছু ইসলাম চাপিয়ে দেয় না। যা কষ্টকর অসাধ্যতা ক্ষমার্হ। রাসুলুল্লাহ (সা) এর সাহাবীগণ শা’বান মাসে বেশি করে কুরআন অধ্যায়ন করতেন। কেননা কুরআন অধ্যায়ন করে আল্লাহর পরিচয় ও তাঁর আদেশ-নিষেধ অবগত হওয়া যায়। এ জন্য অর্থ ব্যবস্থা সহ কুরআন পাঠ সর্বোত্তম। যার ভিতরে কুরআন নাই সে ছাদবিহীন ঘরের মত। ছাদবিহীন ঘরে মানুষ বসবাস করতে পারে না অনুরূপ কুরআন শূন্য অন্তরে ইমান মজবুত হয় না। এতে রয়েছে মানব জাতির জন্য সঠিক হেদায়াত বা পথ। এর প্রতিটি তথ্যই মহাসত্য। অন্যান্য কুরআন শুধু ধর্মগ্রন্থ নয় বরং এ হচ্ছে সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক রাষ্ট্রীয়, আন্তর্জাতিক জীবনব্যবস্থা সম্বলিত একটি আসমানী কিতাব। মহানবী (সা) মাত্র ২৩ বছরে কুরআনের আলোকে এমন এক সমাজ গঠন করেছিলেন যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। এজন্য প্রত্যেক মুমিনকে কুরআন শিখতে হবে বুঝতে হবে এবং কুরআন মোতাবেক জীবন গড়তে হবে। কুরআন যে পড়তে পারে না সে যদি ভক্তি ও শ্রদ্ধার সাথে অন্যের কুরআন পাঠ শুনে তাতেও যথেষ্ট সওয়াব মিলবে। আর বুঝে কুরআন পাঠ আরও অধিক পুণ্যময়। সকলকে কুরআন শেখা উচিৎ।

 
সাহাবাদের আরও একটি অভ্যাস ছিল শা’বান মাসে তাঁরা সম্পদের হিসাব করে যাকাত দিয়ে দিতেন। যেন গরীবরাও রমজানের সিয়াম পালনে সচ্ছলতা বা সক্ষমতা লাভ করে। তাই আমরা এ মাসে অন্তত পক্ষে গরিবদেক রমজানের পূর্ব প্রস্তুতিমূলক সামর্থ্য অর্জনে আর্থিক সহায়তা দান করবো। এটাও সাহাবাগণের সুন্নত। বলা বাহুল্য আমাদের সমাজে বর্তমানে শা’বান মাসে যা আমল করা হয় তা অতি সামান্য বললে ভুল হবে না। ২/৪ জন হয়তো বা ১৩, ১৪ ও ১৫ শাবান রোজা রাখলো আর সবাই মিলে শব-ই-বরাত পালন করলো ১৪ শাবান দিবাগত রাতে মসজিদে মিলাদ মাহফিল হলো তাবারক গাওয়া হলো এতেই আমরা খুশি হয়ে ঘুমে আছি। শবে বরাতের ফজিলত ও তাৎপর্যের যতগুলি হাদীস আছে সবগুলোর মধ্যে নিম্নোক্ত হাদীসটি হাদীস বিজ্ঞানীদের মতে গ্রহণযোগ্য। অন্যান্য হাদীসগুলোর তুলনায় এ হাদীসটির মান মুহাদ্দিসগণের মতে হাসান পর্যায়ের। অর্থাৎ যে হাদীসটির বর্ণনা কারীদের বিষয়ে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও তা প্রত্যাখ্যান যোগ্য নয়। হাদীসটি আবু হোরায়রা, আবু বকর, আবু মুসা আশআরা, মুয়াজ ইবনু জাবান এবং আউফ ইবনু মালেক (রা: অর্থাৎ আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হোন) ৫ জন সাহাবী কিছু শব্দের পার্থক্যসহ একই অর্থে বর্ণনা করেছেন। হাদীসটির ভাবার্থ হলো ১৪ই শাবান দিবাগত রাতে (অর্থাৎ শবে বরাতের রাতে) আল্লাহ তার সৃষ্টির প্রতি দৃকপাত করেন সকলকে ক্ষমা করেন কিন্তু মুশারক ও বিদ্বেষী ব্যক্তি ছাড়া (ইবনু মাজাহ সহ বিভিন্ন হাদীসগ্রন্থ)। শির্ক মহাপাপ। শির্ক করলে জাহান্নাম কনফার্ম হয়ে যায়। শির্ক আমলনামা পুণ্য শূন্য করে দেয়। আর হিংসা বিদ্বেষ থাকলে শবে বরাতেরও মাফ পাওয়া যাবে না। বিষয়টি অনুধাবন করা উচিত।
লেখক ঃ খতিব, উপশহর, মসজিদ, বগুড়া।
মুহাদ্দিস, উম্মুল কুরা কওমি মাদ্রাসা
০১৭১২-৫১৪৪৭৮