লাহোরে কেন পারছে না বাংলাদেশ?

লাহোরে কেন পারছে না বাংলাদেশ?

হোক র‍্যাংকিংয়ে এক নম্বর দল পাকিস্তান; কিন্তু গত বছর, অর্থ্যাৎ ২০১৯ সালে সেই পাকিস্তানিরাই ৯টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলে মাত্র একাটিতে জিতেছিল। এমনকি প্রথম সারির ৫ থেকে ৬ জন ক্রিকেটার ছাড়া খেলতে আসা শ্রীলঙ্কার সাথেও পারেনি।

এই তো কয়েক মাস আগে পাকিস্তানের মাটিতে এসে বাবর আজমদের নাকাল করে তিন ম্যাচের সিরিজে রীতিমত পাকিস্তনীদের ধবলধোলাই করে গেছে শ্রীলঙ্কা জাতীয় দল নামধারি দ্বিতীয় সারির দলটি।

বলার অপেক্ষা রাখে না, নিরাপত্তার কথা ভেবে পাকিস্তানে আসেননি লঙ্কান টি-টোয়েন্টি দলের ফ্রন্টলাইন ক্রিকেটারদের মূল অংশ। অন্তত ১০জন আসেননি পাকিস্তানে সিরিজ খেলতে। তাদেরকে ছাড়াই পাকিস্তানীদের নাক-কান কেটে বিজয়ের পরিতৃপ্তি নিয়ে দেশে ফিরে গিয়েছিল লঙ্কানরা।

আর সেখানে বাংলাদেশ প্রায় পুরো শক্তির দল নিয়ে জেতার বদলে উল্টো একের পর এক খাবি খাচ্ছে। গত ৪৮ ঘন্টায় লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে প্রথম দুই ম্যাচে জেতা বহুদুর, এতটুকু লড়াইও করতে পারেননি মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, তামিম ইকবাল, লিটন দাস, সৌম্য সরকার ও মোস্তাফিজরা।

অথচ প্রায় এই দলটিই গত নভেম্বরে ভারতের মত শক্তিশালী দলের বিপক্ষে তিন ম্যাচের সিরিজে প্রায় সমানতালে লড়ে ১-২ ব্যবধানে সিরিজ হেরেছে। এর মধ্যে প্রথম ম্যাচে ৭ উইকেটের উদ্ভাসিত জয়ের রেকর্ডও আছে।

সাকিব তো আগে থেকেই নেই। নিষেধাজ্ঞার খাঁড়ায় ঝুলে মাঠের বাইরে; কিন্তু সাকিব ছাড়াও ভারতের মত শক্তিশালী দলের বিপক্ষে তিন ম্যাচের সিরিজের প্রথম ম্যাচে উজ্জীবিত বোলিং আর উদ্যমী ব্যাটিংয়ের মিশেলে রোহিত শর্মার ভারতীয় বাহিনীকে ৭ উইকেটের বড় ব্যবধানে হারিয়েছে রিয়াদের দল।


এবার সেই দলের মুশফিকুর রহীম শুধু নেই, বাকি সবাই অছেন। যারা আছেন, তারা আরও শানিত এবং টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে আরও বেশী ম্যাচ খেলে এখন আরও ভাল ফর্মে। বিপিএলে সবাই রান করে গেলেন। লিটন, আফিফ, তামিম, সৌম্য- সবার ব্যাট কথা বলেছে। হেসেছে। চার ছক্কার নহর বয়েছে।

দেশি ও বিদেশি বোলারদের বিপক্ষে কম-বেশি ভাল ভাল ইনিংস উপহার দিয়েছে। দল জেতানো ব্যাটিংও করেছেন প্রায় সবাই। সেই তারাই পাকিস্তান গিয়ে ব্যর্থতার ঘানি টানছেন। পাকিস্তানি বোলারদের ইচ্ছেমত পিটিয়ে চার-ছক্কার ফুলঝুরি ছোটানো বহুদুরে, রান করতেই কষ্ট হচ্ছে।

তামিম ইকবাল দুই ম্যাচেই রান পেয়েছেন। প্রথম দিন ৪৩ আর কাল দ্বিতীয় ম্যাচে ৬৬ রানের দু’দুটি বড় ইনিংসও খেলেছেন। তবে সেটা টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের সাথে মোটেই লাগসই কিংবা কার্যকর নয়। যে কোন মানদন্ডে অনেক স্লো।

মানা গেল, দলের প্রয়োজনে তামিম রয়ে-সয়ে খেলে একদিক আগলে রাখার কাজ করছেন। সেটা দ্বিতীয় ম্যাচে পাকিস্তানের মোহাম্মদ হাফিজও করেছেন। ইনিংসের মাঝামাঝি মানে ২৫-৩০ রান পর্যন্ত ১০০’র আশপাশে স্ট্রাইকরেটে পরিবেশ-পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে তারপর এক সময় হাত খুলে মেরে রানের চাকা সচল করে ১৪০ স্ট্রাইকরেটে শেষ করেছেন।

 

সেই কাজটিই তামিম পারেননি। আর না পারায় তার ওই দুই ইনংসের একটিও কাজে আসেনি। এক ম্যাচে দল ১৪১ এ- গিয়ে থেমেছে। পরেটিতে ১৩৬-১৩৭ এই শেষ।

অত কম রান করে আজকাল টি-টোয়েন্টি জেতা যায় না। যেমন, পিচেই খেলা হোক না কেন, আজকাল টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে অন্তত দেড়শো বা ১৬০’র কম স্কোর গড়ে জেতা কঠিন। তাই বাংলাদেশ দুই ম্যাচের একটিতেও পারেনি। প্রথম দিন ৭ উইেকেটে আর পরের খেলায় ৯ উইকেটের বড় ব্যবধানে হেরে মাঠ ছেড়েছে।

গত বছর ৯ খেলার একটিতেও প্রিয় দলের এমন অনুজ্জ্বল, শ্রী-হীন ও দূর্বল, জীর্ন ব্যাটিং দেখে সমর্থক ও ভক্তরা চরম হতাশ। তারা কার খুঁজছেন কেন এমন হলো? অনেকেরই প্রশ্ন, হাসনাইন, রউফ, শাদাব খানরা কি অত বড় মাপের বোলার যে বাংলাদেশ জেতা বহুদুর, দেড়শোর ঘরও পার করতে পারছে না। মনে হচ্ছে রান করতে খুব কষ্ট হচ্ছে।

কেন এই না না পারা? এর উত্তর দিয়েছেন, মিনহ্জুল আবেদিন নান্নু। আজ রোববার মুঠোফোনে লাগোর থেকে সাথে কথা বলেছেন প্রধান নির্বাচক।

বাংলাদেশ জাতীয় দলের এই সাবেক অধিনায়ক মনে করেন, ‘ব্যাটিং ডিপার্টমেন্ট জ্বলে উঠতে পারছেন না। বোর্ডে রান নেই। যে পরিমাণ রান থাকলে লড়াই করা সম্ভব এবং পাকিস্তানীদের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়া সম্ভব, লড়াই করা যায়, সেই পরিমাণ রান হয়নি। দুই ম্যাচে আমরা ১৪০ ও তার নিচে থাকছি। ওই রান করে জেতা আসলে অসম্ভব। অন্তত ১৬০ থেকে ১৭০ রান করতে না পারলে ওদের মাটিতে পাকিস্তানীদের চাপে ফেলা এবং জয়ের সম্ভাবনা জাগানো খুব কঠিন।’

প্রধান নির্বাচকের ব্যাখ্যা, ‘বিপিএলে আমাদের ক্রিকেটাররা যে গড়পড়তা বোলিংয়ের বিপক্ষে রান করেছে, পাকিস্তানের বোলিয়ের মান তার চেয়ে ভাল ও ধারালো। এটা একটা কারণ।’ এর বাইরে নান্নু লাহোরের উইকেট এবং আবহাওয়ায় অনভ্যস্ততাকেও পারফরমেন্স ভাল ও উজ্জ্বল না হবার কারণ বলে মন্তব্য করেন।

বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশের বর্তমান দলের তামিম ও রিয়াদ ছাড়া আর কেউ আগে লাহোরে পাকিস্তান জাতীয় দলের বিপক্ষে খেলেননি। লাহোরের আবহাওয়া আর উইকেট কেমন? সে ধারনা নেই দলের ৯৫ ভাগ ক্রিকেটারের।

এছাড়া এখানে একদিন মাত্র প্র্যাকটিস করে মাঠে নেমে গেছে বাংলাদেশ দল। যেটাও ভাল খেলার পথে বড় একটা বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাত্র একদিনের প্রস্তুতি নিয়ে একটি তিন ম্যাচের সিরিজে ভাল খেলা কঠিন।

নান্নু যোগ করেন, ‘আমাদের এই দলের এক তামিম ছাড়া আসলে পাকিস্তানের কন্ডিশন সম্পর্কে কারো ধারনাই নেই। এখানে একেকদিন আকাশ ও আবহাওয়া দুই রকম। একদিন একটু রোদ; আর অন্যদিন একদম ঘন কুয়াশায় ঢাকা। উইকেটও তাই। একদিন স্লো আর একদিন তুলনামূলক দ্রুত গতির। ম্যুভমেন্টও ছিল। আমাদের ব্যাটসম্যানরা তার সাথে মানিয়ে নিতে পারেনি।’

প্রধান নির্বাচকের শেষ কথা, ‘আমাদের দলের মূল শক্তি ও ম্যাচ জেতার প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে ব্যাটিং। ব্যাটসম্যানরা জ্বলে উঠে ভাল খেলে স্কোরবোর্ডটাকে মোটা তাজা করতে পারলেই কেবল জেতা সম্ভব। পাকিস্তানের মাটিতে গিয়ে ১৩৭-১৪০ বা ১৪২ করে জেতা সম্ভব নয়। এখন বোলারদের জয়ের মত পুঁজি গড়ে দিতে হবে ব্যাটসম্যানদের। এই কাজটি আগের দুই ম্যাচে হয়নি। দেখা যাক, আগামীকাল সোমবার শেষ ম্যাচে ব্যাটসম্যানরা জ্বলে উঠতে পারে কিনা? আমার বিশ্বাস স্কোরবোর্ড মোটা তাজা হলে অন্তত ১৬০ থেকে ১৭০ রান করতে পারলে জয়ের সম্ভাবনা তৈরি করা যাবে।’