লাল-সবুজ এর বাংলাদেশ

লাল-সবুজ এর বাংলাদেশ

     ওসমান গনি:  বহু ত্যাগ, তিতিক্ষা আর কঠিন সংগ্রাম করে, এ দেশের  লক্ষ লক্ষ মানুষের তাজা রক্তের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি একটা স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। বাঙালি জাতির দাবিও ছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র আর একটি পতাকার জন্য। সেই দাবি অনুযায়ী কাজও করেছিল,  আজ আমাদের দেশে আমরা যে লাল সবুজের পতাকা দেখতে পাই, এই সেই লাল-সবুজের পতাকা, যা আমাদের লাখো বাঙালির চেতনায় ধরে রাখা আমাদের জাতীয় পতাকা আমাদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রতীক। এটির ভেতরে লুকিয়ে আছে আমাদের সংস্কৃতি,স্বপ্ন, আমাদের চেতনা, সব কিছু। হাজারো ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত এই পতাকা আমাদেরসহ সারাবিশ্বের  চোখের সামনে নিমিষেই তুলে ধরে আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রিয় জন্মভূমিকে। যে জন্মভূমিকে আমরা প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। জন্মভূমির প্রতি এই ভালোবাসা মানেই আমাদের জাতীয় পতাকার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো। কারণ, লাল-সবুজের এই পতাকা আমাদের স্বাধীনতার প্রতীক, আমাদের বিজয়ের প্রতীক, বাঙালি জাতির গর্বের প্রতীক । বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার আকৃতি ও রং এর ব্যাখ্যা (বাংলাদেশের সংবিধানের ৪ নং অনুচ্ছেদের ২ নং দফায়) হচ্ছে সবুজ জমিনের উপর খচিত রক্ত রঙের বৃত্ত। জাতীয় পতাকার রং হবে বটল গ্রীন (ইড়ঃঃষব এৎববহ)। সবুজ রং হবে চৎড়পরড়হ ইৎরষষরধহঃ এৎববহ ঐ-২জঝ ৫০ চধৎঃং ঢ়বৎ ১০০০. এর মধ্যে একটি লাল বৃত্তের রং হবে চৎড়পরড়হ ইৎরষষরধহঃ ঙৎধহমব ঐ-২জঝ ৬০ চধৎঃং ঢ়বৎ ১০০০. সবুজ রং তারুণ্যের উদ্দীপনা ও চির সবুজ আমাদের গ্রামবাংলার সবুজ পরিবেশের প্রতীক। ৪৭ বছর আগে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত হয়ে সাড়ে সাত কোটি বাঙালি পায় লাল-সবুজ পতাকার বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পড়ন্ত বিকেলে রেসকোর্স ময়দানে জেনারেল নিয়াজী আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ করলেও, সকাল থেকেই শুরু হয় বিজয় উৎসব। লাখো বাঙালির রক্ত, ত্যাগ, আর বিভীষিকাময় বহু কালোরাত্রির পথ মাড়িয়ে বিশ্ব মানচিত্রে জায়গা করে নেয় রক্তিম লাল আর স্নিগ্ধ সবুজের বাংলাদেশ। কিšু— এ বিজয় মোটেই মসৃণ ছিল না। এর জন্য প্রাণ দেয় ত্রিশ লাখ বীর শহীদ, সম্ভ্রম হারায় প্রায় দুই লাখ নারী। স্বাধীনতা কি ছিল শুধু নয় মাসের সম্মুখ সমর? না, হাজার বছরের লালিত স্বপ্ন আর কষ্টের দামে কেনা এ স্বাধীনতা? স্বাধীনতাকামী বাঙালির মনোবল এতটাই তুঙ্গে ছিল যে প্রায় খালি হাতেই এ দেশের যুবক, কৃষক, ছাত্রসহ আপামর মানুষ প্রতিরোধ গড়ে তোলে প্রশিক্ষিত-দুর্ধর্ষ পাকসেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। সময় নেয় মাত্র নয় মাস, তাতেই স্বাধীনতার সূর্য হাতে ধরা দেয় ১৬ ডিসেম্বরে। রচিত হয় নতুন এক অধ্যায়ের। বিকেল সাড়ে চারটায় রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণের দলিলে সই করেন পাক সেনাপতি লেফটেনেন্ট জেনারেল আমীর আব্দুল্লাহ খান নিয়াজী। প্রায় সাতান্ন হাজার নিয়মিত বাহিনী, আঠার হাজারেরও বেশি আধা-সামরিক বাহিনী এবং পনের হাজারেরও বেশি বে-সামরিক বাহিনী নিয়ে আত্মসমর্পণ দলিলে সই করেন জেনারেল নিয়াজী। না পাওয়ার অসংখ্য বেদনা, জনতার আতঙ্ক আর ক্লান্তি- সব ছাপিয়ে সেদিন সবার মুখে ফুটে ওঠে বিজয়ের হাসি আর আনন্দ উল্লাস । সেদিন থেকেই স্বাধীনতা শব্দটিকে নিজের করে নেয় সাত কোটি বাঙালি, যে সংখ্যা আজ ১৮ কোটিরও বেশি।পাকিস্তানি পতাকা নয়, বাংলার আকাশে উড়ছে শহীদের রক্তে রাঙা লাল সূর্য ও শ্যামল বাংলার প্রতীক লাল-সবুজ পতাকা। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পূর্ববাংলার সর্বত্র ওড়ে লাল-সবুজে গড়া প্রিয় পতাকা। ২৩ মার্চ ছিল পাকিস্তানের জাতীয় দিবস। কিন্তু ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবস নয়, পূর্ববাংলায় পালিত হয় প্রতিরোধ দিবস। আর বর্তমানে ২৩ মার্চ জাতীয় পতাকা দিবস। এই দিন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম উত্তোলিত হয় বাংলাদেশের প্রিয় লাল সবুজের জাতীয় পতাকা। এর আগে অবশ্য অনানুষ্ঠানিকভাবে পতাকা উত্তোলিত হয়েছিল। মার্চের তিন তারিখে সারা পূর্ববাংলায় পূর্ণদিবস হরতাল পালিত হয়। বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে পল্টন ময়দানের জনসভায় ওড়ে স্বাধীন বাংলার লাল সবুজের পতাকা। হরতালের সময় ঢাকার রাজপথে গাছ ও রেলের বগি দিয়ে ব্যারিকেড দেয় জনতা। মার্চ মাসের শুরু থেকেই বঙ্গবন্ধুর ডাকে চলে অসহযোগ আন্দোলন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পরই স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত হতে থাকে বাঙালি। অন্যদিকে ১৬ মার্চ থেকে ইয়াহিয়া বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সংকট নিরসনে আলোচনা বৈঠক চালালেও গোপনে গণহত্যার হীন ষড়যন্ত্র পাকা করতে থাকে। ২১ মার্চ জুলফিকার আলী ভুট্টো বাহ্যত আলোচনার জন্য ঢাকায় এলেও প্রকৃতপক্ষে ষড়যন্ত্র পূর্ণ করতেই আসেন। ছাত্রলীগ প্রতিরোধ বাহিনী ঢাকার পল্টন ময়দানে এক আনুষ্ঠানিক কুচকাওয়াজের আয়োজন করে, যেখানে বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় সংগীত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি গেয়ে পতাকা উত্তোলন করা হয়। এদিন স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের আনুষ্ঠানিক অভিবাদন গ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু। তার ধানমন্ডির বাসভবনে হাজারো জনতার কণ্ঠে ধ্বনিত হয় ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ শ্লোগান।
বঙ্গবন্ধুর বাড়িতেও আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলন করা হয় বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন। যশোর ইপিআর সদর দপ্তরে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। ঢাকায় ছাত্ররা চীনা দূতাবাস থেকে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। অন্যান্য দূতাবাসেও এদিন পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করা হয়নি। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ঢাকা ছিল মিছিলের নগরী। জনতা মিছিল করে সারাদিনই যায় বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে তার দেখা পেতে। এই দিন বঙ্গবন্ধু বারবার মিছিলকারীদের উদ্দেশ্যে শুভেচ্ছা জানিয়ে ভাষণ দেন। বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন ৭ কোটি মানুষের মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে। বঙ্গবন্ধু তার বক্তৃতা শেষে উদাত্ত কণ্ঠে বলেন, ‘জয় বাংলা, আমার দেশ তোমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ, জাগো জাগো বাঙালি জাগো, সংগ্রাম সংগ্রাম চলছে চলবে’।
১৯৭০ সালের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের পরও পূর্ববাংলার মানুষের মুখপাত্র দল আওয়ামী লীগকে সরকার গঠন করতে দেওয়া হয়নি এবং শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে প্রধানমন্ত্রিত্ব দেওয়া হয়নি। বাঙালির ন্যায্য দাবিকে অগ্রাহ্য করে পাকিস্তানি সামরিক শাসক প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান আঁতাত করেন পশ্চিম পাকিস্তানি দল পিপিপির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে। ১৯৭১ সালের শুরু থেকেই তাই চলতে থাকে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ যা পরে রূপ নেয় গণআন্দোলনে। চট্টগ্রাম বন্দরে সোয়াত নামে একটি জাহাজে অস্ত্র রসদ আসে পূর্ববাংলায় গণহত্যা চালানোর অভিপ্রায়ে। ডক শ্রমিকরা এই অস্ত্র ও রসদ খালাস করতে অস্বীকৃতি জানান। পাকিস্তানি সৈন্যরা এই অস্ত্র খালাস করতে গেলে শ্রমিকরা বাধা দেন। স্বৈরশাসক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের পূর্বনির্ধারিত বেতার ভাষণ বাতিল করা হয়। আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে ইয়াহিয়ার উপদেষ্টাদের দুদফা বৈঠক হয়। সেনা অফিসারদের সঙ্গেও বৈঠক করেন ইয়াহিয়া। এদিন জুলফিকার আলী ভুট্টো প্রেস কনফারেন্সে শেখ মুজিব ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার মধ্যে যে ব্যাপক মতৈক্য ও সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাতে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তিনি আবার সাক্ষাৎকারের আশা রাখেন বলে জানান। এসবই ছিল ভুট্টো ও ইয়াহিয়ার ভাঁওতাবাজি। আলোচনা ও সমঝোতার নামে কালক্ষেপণ করে তারা বিপুল পরিমাণে অস্ত্র আনেন পশিচম পাকিস্তান ও অন্যান্য দেশ থেকে। বাঙালিকে নিশ্চিহ্ন করার নির্মম ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে নরপিশাচরা।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
[email protected]
০১৮১৮-৯৩৬৯০৯