লবণ আমদানিতে রেকর্ড : বিপাকে লবণ চাষী

লবণ আমদানিতে রেকর্ড : বিপাকে লবণ চাষী

আব্দুল হাই রঞ্জু :মূলত ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় সরকার পণ্য আমদানি কিম্বা রফতানি করে থাকে। যখন দেশীয় ভাবে, পণ্য উৎপাদনে ঘাটতি হয়, তখন সরবরাহ কম থাকার কারণে পণ্যের মূল্য বাড়ে। আর অর্থনীতির নিয়মই হচ্ছে, পণ্যের সরবরাহ বাড়লে দাম কমে, সরবরাহ কমলে দাম বাড়ে। গত বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে দেশে লবণ উৎপাদন কম হয়। ফলে নিত্যপণ্যের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পণ্যটির বাজার বেড়ে দ্বি-গুণ হয়। ফলে সরকার ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় বিদেশ থেকে ৫ লাখ টন লবণ আমদানির অনুমোদন দেয়। বেড়ে যায় লবণ আমদানি। এবারই প্রথম লক্ষ্যমাত্রার পুরো ৫ লাখ টন লবন ইতিমধ্যেই আমদানি হয়েছে। এ দিকে দেশীয়ভাবে লবণ উৎপাদনও শুরু হয়েছে। ফলে লবণের বাজার মূল্যও কমে এসেছে। আশা করা হচ্ছে, আবহাওয়া অনুকুলে থাকলে লবন উৎপাদন কাঙ্খিত মাত্রা অর্জনে সক্ষম হবে।

 শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এ বছর দেশে লবণের চাহিদা ১৫ লাখ ৭৬ হাজার টন। আর গত বছর দেশীয়ভাবে লবণ উৎপাদন হয়েছিল, ১৩ লাখ ৬৪ হাজার টন। হিসাব মতে, ঘাটতি ছিল ২ লাখ ১২ হাজার টন। মূলত এই ঘাটতির কারণে লবণের প্রতি কেজির মূল্য ৪০ টাকা পর্যন্ত ওঠে যায়। অথচ এর আগে লবণ বিক্রি হয়েছে ২০ টাকা কেজি দরে। অর্থাৎ যে পরিমাণ লবণ আমদানি হয়েছে এবং আবহওয়া অনুকুলে থাকলে যদি ১৩ লাখ টন লবণ দেশীয়ভাবে উৎপাদন হয়, তাহলে কাঙ্খিত মূল্য থেকে লবণ চাষিরা যে বঞ্চিত হবেন, যা নিশ্চিত করেই বলা যায়।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে অতিবৃষ্টি, জলোচ্ছাসের মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন বাংলাদেশের মানুষের নিত্যসঙ্গি। এ মুহূর্তে আবহাওয়া অনুকুলে থাকলেও সমুদ্রে লঘু চাপের কারণে পর পর দু’বার নি¤œচাপের সৃষ্টি হয়ে গোটা দেশে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়েছে। সুতরাং হলপ করে বলাও কঠিন, যে লবণ উৎপাদনের সর্বশেষ মাস মে পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকুলে থাকবে। সংগত কারণেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ভোক্তার স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে বেশি পরিমাণ লবণ আমদানির অনুমতি দিয়েছে। যেহেতু প্রতিবেশি দেশ ভারত  থেকে লবণ আমদানি হয়ে থাকে, সেহেতু প্রয়োজন হলে লবণ আমদানির সুযোগ ছিল। কিন্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিষয়টি আমলে না নিয়ে একেবারেই ৫ লাখ টন লবণ আমদানির অনুমোদন দেওয়ায় লবণ চাষীরা মূল্য সংকটে পড়তে পারে। দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, আমাদের দেশের ক্ষমতাসীনরা বাস্তব এ অবস্থাগুলোকে অনেক সময়ই বিবেচনায় নেন না।

 কেন নেন না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই ভাল বলতে পারবেন। তবে, খালি চোখে দেশের মানুষ যা দেখে, তাহলো অনেক ক্ষেত্রেই উৎপাদনকারীর স্বার্থের চেয়ে আমদানিকারকদের স্বার্থকে বিশেষ ভাবে বিবেচনায় নেয়া হয়। ফলে গুটিকতক ব্যবসায়ীর মুনাফার পাল্লা ভারি হলেও উৎপাদনকারীদের বিপাকে পড়তে হয়। অথচ লবণ প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাবনাময় একটি পণ্য। যার সঙ্গে যুক্ত আছে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে লাখ লাখ মানুষের রুটি রুজি। এই অপরিশোধিত লবণ পরিশোধনে লবনের রিফাইন শিল্পও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প। এ শিল্পকে রক্ষা করতে হলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং দেশীয় শিল্প বিকাশ উপযোগী সরকারি নীতিমালা থাকাও জরুরি। অনেক ক্ষেত্রেই সরকারের ভ্রান্ত নীতিমালার কারণে দেশীয় শিল্প ও শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদনকারী চাষীর স্বার্থ ক্ষুন্ন হয়ে থাকে। এ অবস্থা শুধু লবণ চাষী ও লবণ শিল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং এ ধরনের অপরিকল্পিত নীতিমালার কারণে কৃষিপণ্য ধান, চাল ও পাটের ক্ষেত্রেও চাষী ও শিল্পের স্বার্থ ক্ষুন্ন হয়ে থাকে।

কৃষি অর্থনীতির বাংলাদেশ, কৃষি পণ্যই আমাদের সমৃদ্ধ অর্থনীতির চাবিকাঠি। সে কৃষি পণ্যের উৎপাদনের ধারাবাহিকতাকে ধরে রাখতে হলে পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। উৎপাদন বেশি হলে যেমন চাষীরা মূল্য সংকটে পড়ে, আবার কোন কারণে উৎপাদন ব্যাহত হলে আমদানি করা ছাড়া ভোক্তার চাহিদাও পূরণ করা কঠিন হয়ে যায়। বিশেষ করে সোনালী আঁশ খ্যাত পাট বাংলাদেশের এক সময়ে রফতানি আয়ের বড় খাত ছিল। সরকারি ভ্রান্তনীতি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত্ব পাট শিল্পগুলো দুর্নীতি, লুটপাটের কারণে মুখ থুবড়ে পড়ায় পাট চাষীরা উপযুক্ত মূল্য থেকে বঞ্চিত হতে থাকে। সোনালী আঁশ পাট এক পর্যায়ে কৃষকের গলার ফাঁসে পরিণত হয়। ফলে চাষীরা পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার ফলে পাটের অভাবে একে একে সকল পাটকল বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি এ শিল্পের সবচেয়ে বড় পাটকল আদমজি বিএনপি সরকারের আমলে বন্ধ করে দেয়া হয়

 হাজার হাজার শ্রমিক কর্মচারি কাজ হারিয়ে পথে বসতে বাধ্য হয়। চিরচেনা পাটকল থেকে চোখের পানি ফেলে বিদায় নিতে বাধ্য হয়। যে মুহূর্তে আদমজীর মতো সর্ববৃহৎ পাটকল ধ্বংস করা হয়েছে, সে মুহূর্তে প্রতিবেশি দেশ ভারতে পাট শিল্পের উত্থান ঘটে তরতর করে। একমাত্র বিদেশি প্রেসক্রিপশনের শর্ত পূরণ করতেই আদমজী সহ দেশের সকল পাটকলকে ধ্বংস করা হয়েছে। সে স্থান দখল করেছে সিনথেটিক, প্লাস্টিকের মতো পরিবেশ বিধ্বংসী পণ্য। সে অবস্থা এখনও বিরাজমান। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে ঐতিহ্যবাহী পাট শিল্পের উত্থানে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করায় বেশ ক’বছর ধরে দেশে পাটের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকার বন্ধ থাকা পাটকলগুলোকে পুনর্জীবিত করার উদ্যোগও নিয়েছে। ইতিমধ্যেই পাট ও পাটজাত পণ্যের বাজার বিদেশমুখী হয়েছে। আবার পাটও রফতানি শুরু হয়েছে। এমনকি দেশে পাটজাত পণ্য উৎপাদন ও বিপণনে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। অর্থাৎ পাট ও পাট শিল্পকে ঘিরে নতুন করে সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। মূলত আমাদের দেশের পাট ও পাটজাত পণ্যের বড় বাজার প্রতিবেশি দেশ ভারত।

 ভারতে আমাদের পাট পণ্যের কদর অনেক বেড়েছে। ফলে সে দেশের পাট শিল্পের প্রতিকুল পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ায় ভারত সরকার পাট ও পাট পণ্য আমদানিতে এ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করেছে। ফলে আগের তুলনায় ভারতে আমাদের পাট পণ্যের রফতানি কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তারা বলেছেন, যতদ্রুত সম্ভব এ সংকট মোকাবিলায় ভারতের সঙ্গে কুটনীতিক তৎপরতা চালানো উচিৎ। আমাদের এ আকাঙ্খা যৌক্তিক, এ নিয়ে মতদ্বৈততার কোন সুযোগ নেই, সত্য। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে- এটাই স্বাভাবিক। শুধু পাট ও পাটজাত পণ্যের ক্ষেত্রেই ভারতের কৌশল সীমাবদ্ধ নয়। আমরা দেখেছি, সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বাংলাদেশে চালের তীব্র সংকট বিরাজমান ছিল।

 সে সময় সরকার ভারতের কাছে বাড়তি দামে চাল কেনার জন্য ধর্ণা দিলে ৫ লাখ টন চাল দেওয়ার প্রতিশ্রুতি মিললেও তারা তা রক্ষা করেনি। আবার অনেক সময় আমাদের কোন নিত্যপণ্যের ঘাটতি হলে, তা ভারত  থেকে আমদানি হয়ে থাকে। সে সুযোগে ভারত সে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। যেমন বর্তমানে পেঁয়াজকে ঘিরে ভারত পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধি করেছে। ফলে বাড়তি দামে পিঁয়াজ আমদানি হওয়ায় আমাদের দেশের ভোক্তাদেরকেও বাড়তি দামে পেঁয়াজ কিনে খেতে হচ্ছে। অর্থাৎ তারা তাদের স্বার্থে আমদানি কিম্বা রফতানিতে প্রতিবেশির স্বার্থের কথা বিবেচনায় না নিয়ে নিজেদের সুবিধার্থে দাম বৃদ্ধি কিংবা বাড়তি শুল্ক আরোপ করে থাকে। আমরা আশা করতেই পারি, বন্ধুপ্রতিম দেশের নীতিকৌশল যেন আমাদের স্বার্থ ক্ষুন্নের কারণ না হয় । কিন্তু আমরা চাইলেই তো হবে না, ভারত এখন গোটা বিশে^র মধ্যে উদিয়মান সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশ। তারা তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে কাজ করবে, এটাই স্বাভাবিক।


বাস্তব এ অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়ে আমাদের সরকারকেও সময়োপযোগী বাস্তব নীতিকৌশল অবলম্বন করা দরকার। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের দেশের ক্ষমতাসীনরা জাতীয় স্বার্থে তা নিশ্চিত করতে পারে না। যেমন -সংকটের কারণে একবারে ৫ লাখ টন লবণ আমদানি না করে, কম পরিমাণ লবণ আমদানি করলে, হয়ত লবণ চাষীদের বিপাকে পড়তে হতো না। আগেই বলেছি, মাত্র ২ লাখ টন লবনের ঘাটতি ছিল। ঘাটতির সেই ২ লাখ টন লবণ আমদানির অনুমতি দিলে হয়ত দেশীয় শিল্প ও লবন চাষীদের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হতো না। অর্থাৎ ভোক্তার স্বার্থে আমদানি ও রফতানির ক্ষেত্রে আরো বেশি সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। আবার ভারতের লবণ নি¤œমানের। তারা কাঁচামালের সঙ্গে কেমিক্যাল মেশানোর কারণে লবনের রং লাল ও কালচে ধরনের হয় এবং দাগগুলি মোটা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে লবণ উৎপাদনে কোন কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয় না। ফলে আমাদের দেশের লবণ ঝরঝরে ও চিকন দানার হয় এবং স্বাদও অনেক ভাল। সবদিক বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে নিত্য পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ভোক্তার স্বার্থ ও জাতীয় স্বার্থকে বিশেষ করে বিবেচনায় নিতে হবে। তা না হলে ভোক্তার স্বার্থ ও উৎপাদকের স্বার্থ রক্ষা করা অনেকাংশেই কঠিন হবে।
পরিশেষে শুধু এটুকুই বলতে চাই, লবণ উৎপাদনে চাষীদের প্রণোদনা দিলে এবং লবণ শিল্পে সরকার সহায়তা করলে সুবিশাল সমুদ্র উপকুলে চাহিদার বাড়তি লবণ চাষ ও পরিশোধিত লবণ উৎপাদন করা সম্ভব। তাহলে আমরা লবণ আমদানি নয় বরং লবণ রফতানির সক্ষমতাও বৃদ্ধি করতে পারবো। এ জন্য লবণ চাষীদের স্বার্থ ক্ষুন্ন হবে, এমন কর্মকান্ড থেকে সরকারকে বিরত থাকতে হবে। তাহলে লবণ আমদানির বদলে মান সম্মত লবণ রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন করা সম্ভব হবে। আর সম্ভাবনার এ দিগন্ত সম্প্রসারিত হলে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে- এটাই নিখাদ সত্য।    
  লেখক: প্রাবন্ধিক
[email protected]
-০১৯২২৬৯৮৮২৮