মতামত

লটারীর মাধ্যমে তৃতীয় শ্রেণীতে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করা হোক

লটারীর মাধ্যমে তৃতীয় শ্রেণীতে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করা হোক

মোঃ মুরশীদ আলম: দেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় সমূহের ২০২০ সালের শিক্ষাবর্ষে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণিতে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি পরীক্ষার কার্যক্রম শুরু হয়েছে বা হতে যাচ্ছে। সরকারি নির্দেশ আর নিয়মানুযায়ি প্রথম শ্রেণিতে লটারি ও দ্বিতীয় এবং তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করা হবে। প্রাথমিক ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করা নিয়ে খুব একটা তোড় জোড় দেখা যায় না। কিন্তু যত দক্ষযজ্ঞ বাধে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে। বিশেষ করে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তিকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর কী বালক কী বালিকা বিদ্যালয়ে চলে ভর্তি যুদ্ধ। মফস্বল জেলা শহরগুলোতেই এই ভর্তি যুদ্ধ চলে। কেননা সেখানে প্রয়োজনের তুলনায় সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা কম। শিশুর জন্মের পর প্রথম আট বছর তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় শিশুদেরকে বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে তাদের সম্পৃক্ত করা, ভয়ভীতি প্রদর্শন না করা, অন্য কথায় যে বয়সে শিশুরা তাদের জীবন আর জীবনের ভালমন্দ গতি-প্রকৃতি সম্বন্ধে কিছুই বুঝে ওঠেনি ঠিক সেই সময়ে তাদেরকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে ভর্তি পরীক্ষা নামক দানবকে। আর এই ভর্তির জন্য অভিভাবকরা তাদের কোমলমতি ছেলেমেয়েদের ওপর চালান ভর্তি পরীক্ষা নামের উৎপীড়ন। আর এক শ্রেণির শিক্ষা বেনিয়ারা কোচিং নামে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের ওপর হানে নির্মম শিক্ষাঘাত।
এক শ্রেণির অভিভাবক মনে করেন সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের তৃতীয় শ্রেণীতে তাদের ছেলে মেয়েকে ভর্তি করাতে না পারলে জাতে ওঠা যাবেনা। এটা তাদের ইজ্জতের বিষয় বলে তারা মনে করেন। এই জাতে ওঠা আর ভর্তি হবার প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে সারা বছর ধরে চলে তাদের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ওপর কোচিং পীড়ন। সুযোগ নেয় এক শ্রেণির কোচিং ব্যবসায়ী। তারা নানা রকম মনোলোভা আর দৃষ্টিনন্দন রঙ্গিন বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে আর প্রচারপত্র বিলি করে অভিভাবকদের আকৃষ্ট করে। তাদের কোচিং সেন্টার থেকে গত বছর ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে যে সব বালক-বালিকা সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে বা ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে তাদের রঙ্গিন ছবি আর ফিরিস্তি দিয়ে প্রচারপত্র বিলি করে। অভিভাবকরা তাদের বিজ্ঞাপনের ভাষার মারম্যাচে ভেবে দেখবার সুযোগ পায়না হিসাব করে না যে কতজন ছেলে মেয়ে ওই কোচিং সেন্টার থেকে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল আর কতজন উত্তীর্ণ হয়েছে। সফলতার হারই বা কত। এই ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে সারা বছর ধরে ছেলে-মেয়েদের ওপর কোচিং ব্যবসায়ীরা সাপ্তাহিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক ইত্যাদি পরীক্ষার নামে চালায় পরীক্ষাখাত। এতে ছেলে-মেয়েরা হয় মানসিক দিক থেকে ক্ষত-বিক্ষত। অভিভাবকরা হয় ক্ষতিগ্রস্ত। আর কোচিং ব্যবসায়ীরা পরীক্ষা ফিস, প্রবেশ পত্র ফিস সহ নানাবিধ ফিস আদায় করে ফুলে ফেঁপে ঢোল হন। যে শিশু ভালভাবে হাঁটতে পারে না তার। কাঁধে ঝোলান থাকে পানির পাত্র। আর নানাবিধ বাহারি শিক্ষা উপকরণ ও বই খাতা ভরা বিরাট এক ব্যাগ। সেই ব্যাগের ভারে শিশুটির পিঠ কুব্জ হয়ে যায়।
কেবল কোচিং সেন্টারে শিক্ষাগ্রহণ করে কতজন ছেলে মেয়ে ভর্তি হতে পারে বা ব্যর্থ হয় তা নির্ণয় করার কোন মাপক নেই। তবে এ কথা সত্য যে যারা ভর্তি হতে পারে তারা মেধার বলেই ভর্তি হতে পারে। একটা উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা পরিষ্কার করলেই বোঝা যাবে। ধরা যাক কোন একটা কোচিং সেন্টার থেকে ছেলে মেয়ে মিলে ৪০ জন ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। কিন্তু ভর্তি পরীক্ষা উত্তীর্ণ হলো ২০ জন। তাহলে ২০ জন উত্তীর্ণ হতে পারল না কেন? তারাতো ওই কোচিং সেন্টারেই পড়েছে। আর ওই শিক্ষকরাই শিক্ষা দিয়েছেন। ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করেছেন। তাহলে তারা কেন সফল হল না? আসলে মেধা আর ধী শক্তি বলেই ওই ২০ জন ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। আর যারা উত্তীর্ণ হতে পারেনি তাদের মেধা ও ধীশক্তি ওই ২০জনের মত প্রখর নয় বা এখনো তাদের পরিপক্কতা আসেনি। আবার কোচিং সেন্টারের শিক্ষকগণ ও তাদের শ্রম দিয়ে প্রচেষ্টা আর কলা কৌশল দিয়ে তাদের মেধার স্ফুরণ ঘটাতে পারেননি। কেননা কোচিং সেন্টারে যারা শিক্ষকতা করেন তারা তো অভিজ্ঞ শিক্ষক নন। তাঁরা শিক্ষানবিশ শিক্ষক।  
তারা স্থানীয় কলেজে পড়াশুনা করেন। সব কোচিং সেন্টারে যে এমন দশা তা ঢালাও ভাবে বলা যাবে না। তবে অধিকাংশ কোচিং সেন্টার এমনিভাবেই চলছে। এমন চুল চেরা হিসাব অভিভাবকরা করেন। খতিয়ে দেখেন না বলেই তারা শিশুকে কোচিং সেন্টারে ভর্তি করে দিয়ে নিরাপদে থাকতে চান। তাদের উদ্দেশ্যে এ কথা বলতে চাই আপনারা শত ব্যস্ততার মধ্যে নিজ সন্তানের শিক্ষার খোঁজ খবর রাখুন। হয়তো প্রশ্ন উঠবে চাকরি নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয় তা পেরে ওঠা যায় না। কিন্তু যতই ব্যস্ততা থাক ছেলে মেয়েদের শিক্ষা আর দেখভাল করার জন্য প্রতিদিন দু’ঘন্টা সময় ব্যয় করুন।
তাই বলছিলাম ২য় ও ৩য় শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা বাদ দিয়ে লটারির মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করা হোক। এতে যে ফলাফল হবে তা হচ্ছে কোমলমতি শিশুদেরকে ভর্তি নামক দানবের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে না। শিক্ষার প্রতি তাদের ভীতি থাকবে না। আর এই ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে অভিভাবকরা স্কুল কর্তৃপক্ষকে অহেতুক যে চাপ দিয়ে ত্যক্ত বিরক্ত করেন এবং অনেক সময় যে অশোভনীয় অবস্থার সৃষ্টি করেন তার আসান হবে। বিদেশে এই সব শ্রেণিতে ভর্তির জন্য কোন পরীক্ষা নেয়া হয় না। এমন কী ঢাকাস্থ কিছু বেসরকারি বিদ্যালয়ে ও ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হয় না। ভর্তি করা হয় শিশুর চলন বলন, কথাবার্তা ভঙ্গি কিছু উপস্থিত বুদ্ধিমত্তা যাচাই করে। আশা করি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বিষয়টি ভেবে দেখবেন।
লেখক ঃ উন্নয়নকর্মী
০১৭১৮-৫৩৩৭৬৬