রোহিঙ্গা সঙ্কটের দুই বছর

রোহিঙ্গা সঙ্কটের দুই বছর

নাজমুল হোসেন : গত দুই বছর আগে ২০১৭ সালের ২৫শে আগস্ট মিয়ানমার সরকারের জাতিগত নিধন ও নির্যাতনের মুখে নাফ নদী দিয়ে পালিয়ে আসে প্রায় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রোহিঙ্গা দল। তারা আশ্রয় নেয় কক্সবাজারের বিভিন্ন পাহাড়ে-জঙ্গলে। তখন তাদের মাথার উপরে ছিল না ছাউনি, পেটে ছিল না ভাত। পরনের কাপড়ও ছিল না থাকার মত। বর্তমানে তাদের সংখ্যা ১১ লাখেরও বেশি। গত দুই বছরে বাংলাদেশ সরকার, দেশের সাধারণ মানুষ, জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা এবং দেশি-বিদেশী শত শত সাহায্য সংস্থার প্রচেষ্টায় এখন অনেকটাই নিরাপদ, নিশ্চিত জীবন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের। তাদের জন্য কক্সবাজারের উখিয়া এবং টেকনাফ উপজেলার সাড়ে ছয় হাজার একর জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে ৩২টি শরণার্থী শিবির। সেখানে ঘরের সংখ্যা ২ লাখ ১২ হাজার। ক্যাম্পে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের জন্য এরই মধ্যে নিশ্চিত করা হয়েছে নানা সুযোগ-সুবিধা। ঘরের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে ৩৫ কিমি পাকা বা আধা পাকা সড়ক, পাকা নর্দমা, কালভার্ট। বসানো হয়েছে ২০ কিমি বিদ্যুৎ লাইন, সাড়ে ছয় হাজার স্ট্রিট লাইট, ঘরে ঘরে দেয়া হয়েছে সৌর বিদ্যুতের আলো, বসানো হয়েছে ১০ হাজার নলকূপ, ৫৮ হাজারের বেশি পাকা শৌচাগার এবং ১৭ হাজার গোসলখানা। অনেক ক্যাম্পে পাইপের মাধ্যমেও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে।

শরণার্থীরা বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির সাহায্যের আওতায় প্রতিমাসে পরিবারের সদস্য সংখ্যাভেদে  ৩০-১২০ কেজি চাল, ৯-২৭ কেজি ডাল, ৩-১২ লিটার ভোজ্য তেল পেয়ে থাকে। বিশেষ ই-টোকেনের মাধ্যমে সুপার শপের আদলে গড়ে তোলা দোকান থেকে তারা জনপ্রতি মাসিক ৭৮০ টাকার অন্যান্য পণ্য সামগ্রী কিনতে পারছে। এর বাইরে তারা অন্যান্য সাহায্য হিসেবে পাচ্ছে প্রতি তিন মাসের জন্য পরিবার প্রতি ১২ টি সাবান, ৪ বোতল স্যাভলন, নারীদের স্যানেটারি ন্যাপকিন, অন্তর্বাস ইত্যাদি। এছাড়া বালতি, মগ, থালা-বাসন, পানি রাখার পাত্র থেকে শুরু করে যাবতীয় গার্হস্থ্য সামগ্রী রয়েছে সাহায্যের তালিকায়। শরণার্থীদের স্বাস্থ্য সেবা দেয়ার জন্য খোলা হয়েছে কয়েক’শ হাসপাতাল এবং চিকিৎসাকেন্দ্র। সেখানে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা এবং ঔষধ দেয়া হয়। কোন জটিল রোগ ধরা পড়লে তাদেরকে কক্সবাজার, ঢাকা বা চট্টগ্রামের হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থাও আছে। গর্ভবতী নারীদের বিশেষ যতœ এবং প্রসবকালীন সুবিধাও নিশ্চিত করা হয়েছে বিভিন্ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে। তবে রোহিঙ্গা নারীদের সন্তান প্রসবের হার সেখানকার স্বাস্থ্য কর্মীদের মতে সম্ভবত বিশ্বের সর্বোচ্চ। গড়ে একেকজনের সন্তান সংখ্যা ৮ থেকে ১০ জন আবার কারও কারও ১৮ থেকে ২০ জনও রয়েছে যা জনবহুল এই দেশে রীতিমত উদ্বেগের বিষয়।

যদিও এ অবস্থায় সরকার ও সাহায্যকারী সংস্থা-গুলো রোহিঙ্গাদের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। সার্বিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য খোলা হয়েছে অনেকগুলো পরামর্শ কেন্দ্র। কারণ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে এতিম বা পিতা-মাতা থেকে বিচ্ছিন্ন শিশুর সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার এবং স্বামীহীন একক মায়ের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। রোহিঙ্গাদের ৬৪ হাজার শিশু পাচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা। এদের জন্য খোলা হয়েছে ১,৬৮২ টি শিক্ষা কেন্দ্র। দেশি এবং বিদেশী সাহায্য সংস্থাগুলো এসব স্কুল পরিচালনা করে। এর বাহিরে ক্যাম্পের ঘরে ঘরেও শিশুদের জন্য অনানুষ্ঠানিক স্কুলিং- এর ব্যবস্থা আছে। স্বল্প শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা শিশুদের রাখাইন ভাষা, ইংরেজি এবং প্রাথমিক গণিত শেখায়। রোহিঙ্গা নারীদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার জন্য চালু করা হয়েছে ‘নারী বান্ধব’ সেবা কেন্দ্র নামে বেশ কিছু প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এসব কেন্দ্রে নারীদের জন্য সেলাই, হাতের কাজ, বাঁশ-বেতের কাজ, মোবাইল ফোন সার্ভিসিং সহ নানা বৃত্তিমূলক কাজের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এসব প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা ক্যাম্পেই উপার্জনের ব্যবস্থা করতে পারবেন বলে আশা আয়োজকদের।প্রশিক্ষণ নিতে আসা নারীরাও মনে করছে সহসা তাদের দেশে ফেরার সম্ভাবনা নেই বলে এদেশেই কিছু একটা উপার্জনের ব্যবস্থা করতে হবে।

অবশ্য এরই মধ্যে অনেকেই ক্যাম্পের ভিতরে বা আশেপাশে শুরু করেছে নানা ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য। নিত্যপণ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন বিলাস দ্রব্য কেনাবেচাও হয় সেসব দোকানে। অন্যদিকে ক্যাম্প এলাকায় ঘরবাড়ি নির্মাণ এবং নানা উন্নয়ন কাজের কারণে কাঁটা পড়ছে হাজার হাজার গাছ। এক সময়ের সবুজ পাহাড়ী ভুমি এখন সারি সারি বস্তী ঘরে ডাঁশা। কোথাও পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে বসতি, রাস্তা বা হ্যালিপ্যাড। শুরুতে রোহিঙ্গারা রান্নার জন্য গাছ কেটে উজাড় করেছে বনের পর বন। এখন এই সংকট সমাধানের জন্য দাতা সংস্থাগুলো এগিয়ে এসেছে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে। পরিবারের সদস্য সংখ্যাভেদে মাসে তারা ১টি থেকে ৩টি পর্যন্ত সিলিন্ডার ব্যবহার করতে পারছেন বিনামূল্যে। তুলনামূলকভাবে তারা এ দেশের এক শ্রেণীর মানুষের চেয়ে বর্তমানে ভালোভাবেই দিনযাপন করছে। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে রোহিঙ্গাদের সম্পর্ক ততই খারাপ হচ্ছে। দু’বছর আগে যখন তারা এখানে আসেন তখন স্থানীয় লোকজনই তাদেরকে নিজ জমিতে, বাড়িতে, বাগানে থাকার জায়গা দিয়েছেন। দিয়েছেন খাদ্য ও পানি। দিনে দিনে রোহিঙ্গারা এই এলাকায় সংগঠিত হয়েছেন, জড়িয়েছেন বারবার নানা রকম বিরোধে। বর্তমানে এ নিয়ে এক রকম অস্বস্তি ও আতঙ্কে  দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয়রা। গত ২৫ শে আগস্ট রোহিঙ্গাদের সম্পর্কিত সমাবেশ এবং দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত দেশে ফিরে না যাওয়ার ঘোষণা সরকারের পাশপাশি শঙ্কা ও উদ্বেগে ফেলেছে স্থানীয় লোকদেরকেও। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বারবার রাষ্ট্রীয় সফরে গিয়ে ক্ষমতাধর বিভিন্ন রাষ্ট্রের কাছেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সহায়তা চেয়েছেন।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ভারত সম্মিলিতভাবে মিয়ানমারের উপর কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করলেই কেবল এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে। অন্যথায় রোহিঙ্গারা যে তিমিরে ছিল সরকার তথা দেশের গলার কাঁটা হয়ে সেই তিমিরেই রয়ে যাবে আর বাংলাদেশকে অনাধিকাল ধরে বয়ে বেড়াতে হবে এক দুঃসহ মানবিক সংকটের বোঝা।
লেখক ঃ প্রকৌশলী-প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৭৭২-৩৯১৪৯১