রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিচারের কাঠগড়ায় মিয়ানমার

রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিচারের কাঠগড়ায় মিয়ানমার

মোঃ রবিউল ইসলাম রবীন : ২০১৭ সালের ২৫ আগষ্ট থেকে বন্যার ¯্রােতের মতো রোহিঙ্গারা মিয়ানমার (সাবেক বার্মা) থেকে বিতাড়িত হয়ে আমাদের দেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছে। বর্তমানে যার সংখ্যা ১১ লাখ। এত বিশাল সংখ্যক শরণার্থী পৃথিবীর কোন দেশেই মনে হয় নেই। রোহিঙ্গারা যে মর্মান্তিক এবং হৃদয়বিদারক ঘটনার মধ্যে দিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে এসেছিল সেটি ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে শরণার্থী হিসেবে বাঙালিদের আশ্রয় নেওয়ার ঘটনাকে মনে করে দেয়। সরকার এই বিশাল সমস্যার সমাধান চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছে, বিশ্বের নানা মহল থেকে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু মনে হয়, সমস্যা যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই আছে। মুক্তিযুদ্ধের পর অন্য কোন ইস্যুতে এতো বিপুল সংখ্যক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ এ দেশে আসেনি। সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনেক দেন-দরবার হয়েছে।  কিন্তুু কয়েকটি পরাশক্তির সমর্থনে চলা মিয়ানমার আলোচনার নামে শুধু সময় ক্ষেপণ করেছে।  
আশার কথা, রোহিঙ্গা ইস্যুতে একটি বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। জেনোসাইড কনভেনশন লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়া সরকার ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাষ্টিসে (আইসিজে) মামলা করেছে এবং মিয়ানমারের গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ তদন্তে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট (আইসিসি) তদন্ত করছে। গাম্বিয়ার করা মামলাটি যদিও দীর্ঘ ও জটিল হবে। গাম্বিয়ার মামলাটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ নানা কারণে। এটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আদালতটিতে এবং এই মামলায় মিয়ানমারের বিচারের জন্য সবচেয়ে শক্ত আইনগত ভিত্তি রয়েছে। তাই এই মামলার ওপর গভীর দৃষ্টি রাখছে আন্তর্জাতিক সম্প্রাদায়। নেদারল্যান্ডসের পিস প্যালেসে ১০ ডিসেম্বর শুরু হচ্ছে এই মামলার শুনানি। ১১ নভেম্বর মিয়ানমারের বিরুদ্ধে করা গাম্বিয়ার বর্তমান সময়ে বহুল আলোচিত মামলার নেতৃত্ব দিচ্ছেন গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী আবু বাকার তান্বাদুর। যিনি রুয়ান্ডায় গণহত্যার বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনালে কাজ করেছেন। বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেছেন।
গাম্বিয়া মূল আফ্রিকার একটি ক্ষুদ্রতম দেশ, মাত্র লাখ বিশেক লোক, হতদরিদ্র আর আন্তর্জাতিক কুটনীতিতে অনুল্লেখ্য। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) একমাত্র গণহত্যা কনভেনশন অনুসারেই যে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলার সুযোগ রয়েছে, তা বহু দেশেরই জানার কথা। কিন্তুু কোনো ’মানবাধিকার গুরু’ রাষ্ট্র না, ঐতিহাসিক এই কাজটি করেছে শুধু গাম্বিয়া। গাম্বিয়া আইসিজিতে মামলা দায়ের করেছে ওআইসির পক্ষ থেকে।
মামলাটিতে দায়ের করা অভিযোগপত্রে ২০১৭ সালে রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণহত্যা,  ধর্ষণ ও তাঁদের পরিকল্পিতভাবে উৎখাত করার দায়ে মিয়ানমারকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এ মামলায় কেন ও কীভাবে গাম্বিয়া পক্ষ হয়েছে, তার বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগপত্রের শেষ দিকে গণহত্যার জন্য মিয়ামারকে দোষী সাব্যস্ত, দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি এবং ভিকটিমদের জন্য ক্ষতিপূরণের আবেদন করা হয়েছে। এ ছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নিপীড়নমূলক আচরণগুলো জরুরি ভিত্তিতে বন্ধ করার নির্দেশ চাওয়া হয়েছে। এ মাসে এই মামলার শুনানি শুরু হয়েছে। আইসিজেতে মিয়ানমারের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন অং সান সূ চি। যদিও তিনি বিচারিক ভাষায় পরোক্ষ অর্থে একজন অভিযুক্ত। আইসিজেতে গাম্বিয়া হলো আরজি পেশকারী আর মিয়ানমারের ভূমিকা জবাবদাতার। তবে বিষয়টিতে অন্যান্য রাষ্ট্রের অংশগ্রহণের পথ আছে। আইসিজের কার্যপ্রণালী পরিচালিত হয় তার ষ্ট্যাটিউটের ভিত্তিতে: সেই ষ্ট্যাটিউট জাতিসংঘের সঙ্গে সংযুক্ত। সেটিতে বিধান আছে, কোনো আন্তর্জাতিক বিরোধ নিয়ে মামলা হলে সেই মামলার দুই পক্ষ ছাড়া তৃতীয় কোন রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করতে পারবে। বিশেষ অধিকারমূলক হস্তক্ষেপের জন্য সর্বোত্তম প্রার্থী হতে পারে বাংলাদেশ, কারণ মিয়ানমার থেকে ১১ লাখ বিতাড়িত বিপুলসংখ্যক মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ।
বিচারিক প্রশ্নে কী ফল বের হবে, তা পরিষ্কার নয়। কারণ আগেই উল্লেখ করা হয়েছে বিষয়টি জটিল এবং দীর্ঘ। এই দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। রোহিঙ্গাদের বসবাস ওই এলাকার মানুষের জন্য, পরিবেশের, আইন-শৃঙ্খলা ইত্যাদি বিষয়ে হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই দুই বছরের অভিজ্ঞতা বলে মিয়ানমার এই রোহিঙ্গাদের আর ফিরে নিতে ইচ্ছুক নয়।  আর রোহিঙ্গারাও ধর্ষণ ইত্যাদির ভয়ে আর সেখানে ফিরে যেতে চাইবে না। মানবিক কারণে একটা সময় যে জনগোষ্ঠিকে বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছিল, এখন সেটি বিশাল ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত দুই বছরের মিয়ানমারের আচরণে কিন্তু মনে হয় না তাঁদের বিরুদ্ধে করা এই মামলার বিষয়ে তাঁরা খুব উদ্বিগ্ন। তাঁদের অতীত কর্মকান্ডও তা বলেনা। ২০১৬ ও ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনী ও অনান্য নিরাপত্তা বাহিনী রোহিঙ্গা মুসলামানদের ওপর যে রক্ত হিম করা নিধনযজ্ঞ চালিয়েছে, অং সান সূচি ও তাঁর মিত্ররা তার সত্যতা আগাগোড়া অস্বীকার করার বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে হতবাক করেছে।  নিরাপত্তা বাহিনী কথিত’ ক্লিয়ারেন্স  অপারেশন ’ এর নামে যেভাবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর জাতিগত নির্মূল  অভিযান  চালিয়েছে, যেভাবে রোহিঙ্গাদের  ঘড়-বাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে তাঁদের  ভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য  করেছে, তা নজিরবিহীন।  কিন্তু বরাবর তাঁরা এসব অস্বীকার করেছে। তাই এই মামলাতে মিয়ানমার সব সহিংসতাকে অস্বীকার করতে পারে। আমরা ঘর পেড়া গরু, সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় লাগে।
লেখক ঃ সহকারি অধ্যাপক-কলামিষ্ট
০১৭২৫-০৪৫১০৫