রীপার পড়ালেখার পরিবেশ

রীপার পড়ালেখার পরিবেশ

রীপা পড়তে বসেছে। বাবার মোবাইল ফোনে রিংটনের শব্দ হচ্ছে। রিংটনের শব্দ শুনে রীপা এগিয়ে গেল। মোবাইল ফোনটা বিছানায় রাখা। রীপা সেখানে গিয়ে দাঁড়াল। মোবাইলের হালকা আলোতে স্ক্রিনে দেখতে পেল একটা নাম। নামটা দুই শব্দের নাম। নামটা সেভ করা আছে বলেই রীপা নামটা পড়তে পারল। নামটা লেখা আছে সজল এসি। সজল শব্দটা রীপা বুঝল কিন্তু এসি মানে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। এটা কোন আংকেল সে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। তাই কলটা রিভিস করল না। কলের নির্দিষ্ট সময় পার শব্দ বন্ধ হয়ে গেল। আবার মোবাইলে স্ক্রিনে আলো জ্বলে উঠল। এবার অন্য নম্বর না একি নাম সজল এসি। রীপা এবার ভাবল নিশ্চিয় জরুরি কল হবে। তাই সে  তার বাবাকে ডাক দেওয়ার প্রস্তুতি নিল। কিন্তু তার বাবা যে আশপাশে নেই। বাবা গোসল করতে বাথরুমে ঢুকেছেন। রীপার মা রান্না ঘরে। তাই সে একবার ভাবল মাকে ডাক দেবে কিন্তু মাকে ডাক দিল না। মোবাইলটা নিয়ে বাথরুমের দরজার সামনে নিয়ে গেল। মোবাইলটা নিয়ে যেতে যেতে কলটা কেটে গেল। মোবাইলটা হাতে নিয়ে এসে আবার বিছানায় রাখল। রাখা মাত্র আবার শব্দ। রিংটনের শব্দ। রীপা এবার ভাবল, হয়তো অন্য নম্বর। কিন্তু না এবার ওই একি নম্বর। মানে আগের দুই বারের সেই নাম সজল এসি। রীপা এবার আর কোন কিছু না ভেবে সে মোবাইলের স্ক্রিনে হাত স্পর্শ করে কল বাজা বন্ধ করল। রীপা কল রিসিভ করে হ্যালো বলল।
ওপাশ থেকে সজল এসি বলল, ‘হ্যালো, রীপা মামণি।’
রীপা বলল, ‘আপনি তো আমাকে ভিডিও কল দেননি। আমাকে চিনলেন কেমনে?’
সজল বলল, ‘তা করেনি। তবে কি জানো। এটা যে তোমার বাবার কণ্ঠ না, আমি বুঝে ফেলেছি। তাই সিউর হয়েছি। এটা তুমি হবে। মানে আমাদের রীপা মামণি। আমি কি ঠিক বলেছি মামণি?’
রীপা মনে মনে ভাবল তাই তো। আংকেলের তো অনেক বুদ্ধি আছে। রীপা খুশি হয়ে বলল, ‘ঠিক বলেছেন আংকেল। আমি রীপা বলছি।’
‘তুমি কেমন আছ মামণি?’
‘আমি ভালো আছি। আপনি ভালো আছেন?’
‘আমি ভালো নেই। ভালো থাকার জন্য তোমার বাবাকে ফোন করেছি।’
‘ভালো থাকার জন্য আমার বাবাকে ফোন করেছেন। কারণ কি আংকেল?’
‘কারণ আছে। তোমাকে বলা যাবে না। তুমি ছোট মানুষ। বড় হও। তোমার বাবাকে একটু ডাকো।’
‘আংকেল আমার বাবা তো বাথরুমে। বের হোক তারপর আপনার কথা বাবাকে বলব।’
‘ওকে।’
 ‘আংকেল আপনি একটু অপেক্ষা করেন। অনেক সময় হলো ঢুকেছেন। এখন হয়তো বের হওয়ার সময় হয়েছে। বাবা বাথরুম থেকে বের হলে আপনার কথা বলব।’
‘ঠিক আছে মামণি।’
‘ধন্যবাদ আংকেল।’
রীপা এবার পড়ার টেবিলে গিয়ে বসল। ওর পড়ার টেবিলটা জানালার পাশে। পাশের ফ্ল্যাটে অবশ্য রীপার এক বান্ধবী প্রিয়াংকা থাকে। স্কুলে তো দেখা হয়। দুজন দুপাশের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে গ্রিল ধরে কথা বলে।
রীপা মনোযোগ দিয়ে পড়ছে। এর মধ্যে আবার মায়ের মোবাইল ফোন কল এসেছে। রীপা মায়ের মোবাইল ফোনে কল এসেছে বুঝতে পারল কীভাবে। কারণ তার মায়ের মোবাইল ফোনে রিংটনের আলাদা শব্দ...। রীপা পড়া মনোযোগ বসাতে পারছে না। একটু বিরক্ত হয়ে বলল, ‘মা তোমার মোবাইল বাজে।’
মা বললেন, ‘রীপা, ফোন নিয়ে এসো।’
রীপা মায়ের কথা রক্ষা করার জন্য পড়ার টেবিলে থেকে উঠে গেল। গিয়ে মোবাইল ফোনটা নিয়ে মাকে দিল। এর মধ্যে ওর বাবা বাথরুম থেকে বের হলেন। রীপা টের পেলেন। ও সঙ্গে সঙ্গে বাবার কাছে গিয়ে বলল, ‘বাবা, সজল আংকেল তোমার মোবাইলে কল করেছিলেন। কি যেন জরুরি কথা আছে। তুমি এখুনি কল কর।’
‘তাই !’
‘হ্যাঁ বাবা। আমি কিন্তু আংকেলকে কথা দিয়েছি। আমার কথা রক্ষা করলাম। এবার তুমি কল করে সজল আংকেলের সাথে কথা বলো।’
‘খুব ভালো করেছে মামণি।’
রীপার বাবা বিছানার থেকে মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে দেখে সজল এসি কল করেছে। পোশাক পরিবর্তন করে রীপার বাবা কল করে বললেন, ‘সজল ভাই। কল করেছেন। সরি। আমি বাথরুমে ছিল।’
সজল বললেন, ‘কল করেছিলাম। আপনার সাথে আমার জরুরি কথা আছে। আপনি কখন অফিসে আসবেন।’
‘ঘণ্টাখানের মধ্যে।’
‘ও আচ্ছা, তাহলে আপনি আসেন। আমি আপনার জন্য অফিসে অপেক্ষা করছি।’
‘ঠিক আছে।’
রীপা আর ওর মা রান্না রুমে। রীপা মা মোবাইল ফোন কথা বলছেন। রীপা চেয়ে থেকে দেখছে। কথা বলা শেষ হলো রীপা বলল, ‘মা তুমি কার সাথে কথা বললে?’
‘কেন তুমি মোবাইলে তার নাম দেখনি?’
‘না মা। এই নম্বরটা তো তোমার মোবাইলে সেফ করা নেই। তাই নাম দেখতে পাইনি।’
‘ও আচ্ছা, থাক জানার দরকার নেই। যাও তুমি গিয়ে পড়তে বস।’
রীপা আর কোন কথা না বলে মন খারাপ করে রান্নাঘর থেকে বের হলো। পড়ার টেবিলে এসে বসল। বসা মাত্র পাশের ফ্ল্যাটের একটা বাসায় থেকে গানের শব্দ এলো। হিন্দি গান বাজাচ্ছে জোরে। যে শব্দটা রীপার কানে এসে লাগছে। পড়ালেখায় খুব ডির্স্টাব হচ্ছে। কিন্তু কেউ যেন রীপার সুবিধা অসুবিধার কথা বুঝছে না। রীপা মনে মনে বিরক্ত হলো। তারপর পড়ার টেবিল থেকে উঠে এলো খাবার টেবিলের কাছে। খাবার টেবিলে বাবা নাস্তা করছেন। মা পাশে বসে আছেন। রীপা দাঁড়াল মন খারাপ করে। রীপার মন খারাপ দেখে বাবা বললেন, ‘মামণি তোমার কিছু হয়েছে?’
রীপা বেলুনের মতো নিজের গাল ফুলিয়ে বলল, ‘এই বাসায় আর থাকব না।’
বাবা রীপার কথা শুনে অবাক হলেন। বললেন, ‘কী হয়েছে মামণি?’
‘পাশের ফ্ল্যাটে হয়তো নতুন ভাড়াটিয়া এসেছেন। তারা জোরে শব্দে করে গান বাজায়। তাদের আনন্দে আমার যে পড়ালেখার সমস্যা হয়। তারা কি বুঝতে পারে না। তাদের বাসায় কি পড়ালেখা করার মানুষ নাই। আছে শুধু টিভি দেখা আর উচ্চ শব্দে গান শোনোর মানুষ।’
রীপার বাবা বললেন, ‘তুমি তো সত্যি কথাই বলেছ মামণি। প্রতিবাদ করতে হবে।
রীপার মা বললেন, ‘প্রতিবাদ করে কাজ হবে। তোমার কি তাই মনে হয়, কাজ হবে।’
‘আমরা আমাদের অসুবিধার কথা বলব না। অবশ্যই বলব।’
রীপার মা এক হতাশা নিয়ে বলল, ‘বলার দরকার নেই। কয়েক দিন আগে ঢাকায় স্বামীবাগে একটা ফ্লাটে বিয়ের অনুষ্ঠানে গান বাজনাকে কেন্দ্র করে নাজমুল হক নামে এক অবসরপ্রান্ত ব্যক্তি মারা গেছেন প্রতিবেশির হাতে।’
‘এ ঘটনা তো মোটামুটি সবাই জানে। জানার পরও যেন অনেকেই শর্তক হোন। এটা আশা করি।’
‘আশা করে লাভ নেই। আমরা বাঙালি। আমরা নিজের সুবিধাটা আগে বুঝি। নিজের দ্বারা সৃষ্টি অন্যেকে অসুবিধা করতে পছন্দ করি।’
‘তা অবশ্য তুমি ঠিক বলেছ।’
এর মধ্যে রীপা ঠাকুরমা এসে বললেন, ‘তোমাদের একটা কথা বলতে চাই।’
রীপার বাবা বললেন, ‘আচ্ছা, তুমি আবার কি বলবে।?’
‘শোনো, আমার কথা। অনেক দিন হলো তোমারদের একটা বিষয় লক্ষ্য করছিলাম। বলব বলব করে আর তোমাদের বলা হয়নি।
‘আচ্ছা বলো।’
‘রীপার পড়তে বসলে তোমারদের মোবাইল ফোন আসে। মোবাইল ফোনে আসা শব্দে রীপার পড়ালেখার সমস্যা হয়। মোবাইল ফোনের রিংটনের শব্দে শুনে ও দৌড়ে গিয়ে ফোন ধরে। কথা বলে। পড়ার সময় কথা বললে সময় নষ্ট হয়। আর সময় নষ্ট করার ফলে পরীক্ষা খারাপ করবে। তখন  আর রীপা ভালো কিছু করতে পারবে না। এভাবে চলতে থাকলে।’
‘তাই তো মা। তুমি তো ঠিক ধরেছ।’
‘সে জন্য ঘরের ভেতর আগে পড়ালেখার পরিবেশ তৈরি করো। তারপর বাইরে কথা চিন্তা করো।’
‘মা তো ঠিক কথাই বলেছেন। আজ থেকে রীপার পড়ার সময় মোবাইল ফোন নীরব থাকবে।’
বাবার কথা শুনে রীপা আনন্দে ঠাকুর মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘হুররে হায়।’
সবাই একসঙ্গে নাস্তা করতে লাগল। তারপর বাবা অফিসে গেলেন। একটু পর মা রীপাকে নিয়ে স্কুলে উদ্দেশে রেব হলেন। বাড়ির কর্তা মানে ঠাকুরমা বাড়িতেই রইলেন।