রিকশা ঠেলার হাবীব এখন অনেকেরই অন্ন জোগান

রিকশা ঠেলার হাবীব এখন অনেকেরই অন্ন জোগান

রুহুল আমিন সরকার, বদরগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি: নূরে হাবীব এক সময় জীবন বাঁচাতে রিকশা ঠেলার কাজ করতেন। তার জীবন চলত খেয়ে না খেয়ে। অথচ তিনি এখন সোয়েটার কারখানার মালিক হয়ে অনেকেরই অন্ন জোগাচ্ছেন। জীবন যুদ্ধে তিনি অনেকদূর এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। ১৯৯৯ সালের কথা। তিনি সবেমাত্র দশম শ্রেণিতে উঠেছেন। ঠিক সেসময়ই বাবা আজিম উদ্দিন কবি মৃত্যুবরণ করেন। বাবার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তার সবকিছুই শেষ হয়ে যায়। কারণ তার বাবা তাদের জন্য কিছুই রেখে যেতে পারেননি। তার মায়ের গর্ভে জন্ম নেয়া তিন বোনসহ পাঁচজনের মুখে ভাত তুলে দেয়ার মতো সামর্থ্য তাদের ছিল না। এ কারণে হাবীব দিনমজুরীর কাজ নেন। পরে ঢাকায় চলে যান। সেখানে গিয়ে তিনি রিকশা ঠেলার কাজ নেন। সারাদিন রিকশা ঠেলে যা পান তা’ দিয়ে কোনোরকমে পেটের ভাত জোগাড় করতে সক্ষম হন।

 একদিন রিকশা ঠেলতে গিয়ে তার সাথে পরিচয় হয় পিরোজপুরের এক গার্মেন্ট কর্মকর্তার সাথে। তিনি হাবীবকে একটি ভিজিটিং কার্ড ধরিয়ে দিয়ে তার সাথে দেখা করতে বলেন। পরদিন আমিনবাজারে ওই কর্মকর্তা তাকে গার্মেন্টে একটি কাজের ব্যবস্থা করে দেন। এতেই শুরু হয় তার নতুন জীবনের সূচনা। সেখানে সাত মাস কাজ করার পর আরেকটি গার্মেন্টে তিনি কাজ নেন এবং টানা দু’বছর সেখানে কাজ করেন। সেখানে কাজ করা অবস্থায় উন্মুক্ত বিশ^বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেন। এরপর নারায়ণগঞ্জে চলে যান। দু’বছর কাজ করেন। পরে গাজীপুরে কাজ করা অবস্থায় তিনি দু’ লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়ে একটি ফ্লাড লক মেশিন এবং একটি চেইন স্টীচ মেশিন কিনে গার্মেন্টেই ভাড়া দেন। ওই ভাড়ার অর্থ এবং নিজের পারিশ্রমিক দিয়ে তিনি তিনটি সেলাই মেশিন কেনেন এবং বাড়িতে ফিরে আসেন। ২০১২ সালে ধার দেনা করে দু’শতাংশ জমি কিনে নেন। আর সেই জমিতেই তিনি ছোট্ট পরিসরে গার্মেন্ট কারখানা গড়ে তোলেন। ২০১৪ সালে মাত্র তিনটি সেলাই মেশিন দিয়ে তার কারখানার যাত্রা শুরু হয়। আর সেই কারখানার উৎপাদিত পোশাক তিনি
 
 নিজেই ফেরি করে বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করতে থাকেন। এরপর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বর্তমানে তার কারখানার ১২ জন শ্রমিক দিনরাত কাজ করছেন। তিনি নিজেও কাটিং, সুইং এবং ফিনিশিংয়ের কাজ করে থাকেন। ওই কারখানার উৎপাদিত পোশাক উন্নতমানের হওয়ায় এরই মধ্যে রংপুরের বিভিন্ন উপজেলাসহ দিনাজপুর ও নীলফামারীর ব্যবসায়ীরা সেখানে ছুটছেন। বর্তমানে ওই কারখানায় সব ধরণের পোশাকই তৈরি হচ্ছে। নূরে হাবীব জানান, বর্তমানে জিন্স ও গ্যাভার্ডিন শার্ট-প্যান্টের প্রচুর অর্ডার আসছে। কিন্তু সামলানো যাচ্ছেনা। ক্রেতাদের চাহিদার তুলনায় নিজস্ব অর্থের পরিমাণ খুবই কম। সামান্য অর্থ দিয়ে যে কাপড় নিয়ে আসি সেটি বিক্রি করে শ্রমিকদের মজুরী মিটিয়ে আবার কাপড় কিনে আনি। তিনি বলেন, ব্যাংক ঋণ পেলে হয়ত বড় পরিসরে কাজ করার সুযোগ পেতাম। সম্পত্তি ছাড়া ব্যাংক ঋণ পাওয়া যাবে না, সেকারণে ওই চিন্তা বাদ দিয়ে পরিশ্রম করে এগিয়ে যাচ্ছি। নূরে হাবীব বলেন, আমার এখন একটাই লক্ষ্য; এলাকার দরিদ্র মানুষগুলোর মুখে হাসি ফোটানো। সে লক্ষ্যেই তাদের কাজ শেখাচ্ছি।