রাষ্ট্র দখলের ধারণা এখন পাল্টে গেছে

রাষ্ট্র দখলের ধারণা এখন পাল্টে গেছে

মাশরাফী হিরো : ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস। বাঙালি জাতির হাজার বছরের কাঙ্খিত এই দিনটি সেছিল মহান ৭১’এ। বিজয়ের এই দিন মানুষ আনন্দে পালন করলেও এর পিছনে ছিল হাজারও শোকগাঁথা। যার স্বাক্ষী হয়ে আছেন হাজারও নির্যাতিত মানুষের পরিবার। শুধুমাত্র মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী পরিবারই নয় বরং সমস্ত বাংলাদেশের মানুষই ছিল তাদের টার্গেট। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী শুধুমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই নয় বরং বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের মানুষকে সমূলে উৎপাটনের জন্যই এ হত্যাযজ্ঞে নেমেছিল। একে না বলা যায় যুদ্ধ, না বলা যায় রাজনৈতিক ধ্বংসযজ্ঞ। কারণ এই যুদ্ধে মানবতার লেশ পরিমাণ ছিল না। ছিল না কোন যুদ্ধ আইন মানার প্রবণতা। বরং হত্যাকান্ড ঘটানোই ছিল এই অপারেশনের মূল বিষয়। যেন পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের রাগ-ক্ষোভ, হিংসা-বিদ্বেষের এক চরম বহিঃপ্রকাশ। সেই ৪৭ থেকে শুরু ৭১ পর্যন্ত। দীর্ঘ ২৩ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম আর রক্তের উপর দাঁড়িয়ে বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল আরও এক সাগর রক্তের ¯্রােতে অবগাহনের জন্য। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী এই ধৃষ্টতা করার সাহস পেয়েছিল আন্তর্জাতিক কিছু শক্তির কারণে।

 যারা শুধুমাত্র পাকিস্তানের পক্ষই নেয়নি বরং বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে নিজেদের পরাজয় বলেই মনে করেছিল। এমন কোন অপচেষ্টা নাই যা পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী অবলম্বন করেনি। সমস্ত বিশ্বজনমত অগ্রাহ্য করে গণহত্যার ঘৃণ্য পথ বেছে নিয়েছিল। আমেরিকা এবং চীনের মত দেশগুলি আদাজল খেয়ে নেমেছিল বাংলাদেশের বিরোধীতায়। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিও বাংলাদেশের স্বাধীনতা চায়নি। আর দেশের অভ্যন্তরে জামায়াতে ইসলাম এবং মুসলিম লীগের সমর্থকরাতো ছিলই। রাজাকার, আলবদর, আলশামস্্ বাহিনী গঠন করে নিজের দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে পাকিস্তানীদের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য। বাংলাদেশের সেই দুঃসময়ে পাশে ছিল রাশিয়া এবং ভারতের মত প্রতিবেশী রাষ্ট্র। আর মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নিরস্ত্র বাঙালি। যারা নিজের দেশকে রক্ষা করতে চেয়েছিল। চেয়েছিল একটি সুখী-সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ। নিজের এবং পরিবারের জীবন বিপন্ন করে সেই দিন বেছে নিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের পথ। দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধের পর আজকের এই দিনে এসেছিল সেই কাঙ্খিত স্বাধীনতা।

 ততদিনে বাঙালি হারিয়েছে ৩০ লক্ষ মানুষ, ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম আর ১১শ’র উপর বুদ্ধিজীবী। এত বেদনার পরও বাঙালি জাতি পাকিস্তানীদের আত্মসমর্পণে খুশী হয়েছিল। আত্মহারা হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের বিজয়ে। কিন্তু সেই বিজয় বেশি দিন ধরে রাখতে পারেনি বাঙালি জাতি। ৭৫ এর ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতি আবারও অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছিল। ১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজুদ্দৌলার পরাজয়ে বাঙালি মনে করেছিল শুধুমাত্র শাসকের পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু তারা ভাবতেই পারেনি শাসকের পরিবর্তনের সাথে সাথে তাদের স্বাধীনতা হরণ হয়ে গেছে। আর তাদেরকে এ মাশুল দিতে হয়েছে ১৯০ বছর ধরে। ৭৫ এর ১৫ আগস্টও ঠিক অনুরূপ ঘটনা। শুধুমাত্র শাসকের পরিবর্তন হয়নি, হরণ হয়েছিল বাঙালির স্বাধীনতা। রাষ্ট্র দখলের ধারণা এখন পাল্টে গেছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যেমন বাংলায় এসেছিল ব্যবসা করতে তেমনি উন্নত রাষ্ট্রগুলোও চায় বাংলাদেশকে ব্যবসায়িক কলোনি বানাতে। রাষ্ট্র আর যুদ্ধ করে দখল করার প্রয়োজন হয় না। শুধুমাত্র নিজেদের পছন্দমত শাসকদের রাষ্ট্রক্ষমতায় বসিয়ে ব্যবসার নামে সম্পদ লুন্ঠন এটাই এখন শোষণের সবচাইতে স্মার্ট ধারণা।

 যাতে ভদ্র রাষ্ট্রগুলির গায়ে কালিমাও লাগে না, আবার ব্যবসা ও নিজের প্রভাব প্রতিপত্তিও রাখা যায়। এর শিকার মধ্যপ্রাচ্যসহ অধিকাংশ তৃতীয় বিশ্বের দেশ। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। ৭১ এর সেই বিরোধীতাকারীদের ষড়যন্ত্র এখনও বিদ্যমান। বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বলেছিলেন, শুধুমাত্র মানচিত্রের স্বাধীনতায় নয়, অর্থনৈতিক মুক্তিই আমাদের মূল লক্ষ্য। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাও বলেছেন আমরা অর্থনৈতিক রাজনীতিতে এগিয়ে যেতে চাই। বাঙালি জাতিকে স্বনির্ভর করে গড়ে তুলতে চাই। যেন কারও কাছে মাথানত করতে না হয়। বাঙালি জাতির প্রত্যাশাও ঠিক তেমনি। তবে এতে প্রয়োজন সচেতনতা এবং জনসমর্থন। যার প্রকাশ ঘটবে বিজয়ের মাস ডিসেম্বরেই।
লেখক : উপ-দপ্তর সম্পাদক
বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগ
০১৭১১-৯৪৪৮০৫