রাণীনগরের মাটির পাতিল বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ

রাণীনগরের মাটির পাতিল বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ

রাণীনগর (নওগাঁ) প্রতিনিধি : নওগাঁর রাণীনগরের মাটির  তৈরি পাতিল দামে কম মানে ভাল হওয়ায় স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চালান হচ্ছে। আধুনিকতার দাপটে মৃৎ শিল্পের তৈরি পূর্ণ সামগ্রীগুলো মান্ধাতা আমল থেকে গ্রামীণ জনপদের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে সাংসারিক কাজে ব্যবহৃত মাটির তৈরি হাঁড়ি, পাতিল, থালা, কলস, ঝাজর’র বেশ কদর থাকলেও প্লাস্টিক এলোমিনিয়াম, সিলভার, মালামাইনের তৈরি সামগ্রীগুলো পারিবারিক ব্যবহৃত কাজে দখল করায় মাটির তৈরি জিনিসপত্রের কদর এমনিতেই কমে গেছে। তারপরও উপজেলার গহেলাপুর, খট্টেশ্বর, আতাইকুলা, ভান্ডারা, ভান্ডারগ্রামসহ বিভিন্ন গ্রামের আদি পাল বংশের লোকজনরা এই ব্যবসা জীবন-জীবিকার তাগিদে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া এই ব্যবসা ঢিমেতালে চালিয়ে যাচ্ছে।

 কি লাভ কি লোকসান সেই দিকে বেশি গুরুত্ব না দিয়ে পাল পাড়ার লোকজন তাদের জাতি পেশা শক্ত করে আঁকড়ে আছে। ডিজিটালের এই সময়ে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে পরিবারের সকল সদস্য মিলে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে গহেলাপুর গ্রামের পাল পাড়ার লোকজন ভাল মানের মাটির পাতিল তৈরি করে স্থানীয় বাজারসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাইকারি চালান করছে। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণ অঞ্চলের এক শ্রেণির মাটির পাতিল পাইকারি ব্যবসায়ীরা রাণীনগর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের পালপাড়া থেকে নানা মাপের মাটির পাতিল পাইকারি দরে কিনে রেলসহ বিভিন্ন যানবাহন যোগে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। প্রতি সপ্তাহে পাইকাররা সরাসরি গ্রামে গিয়ে পাতিল তৈরি করছে এমন কারিগরদের কাছ থেকে নগদ টাকায় পাতিল কেনা-বেচা করছে। পাইকারদের কাছে বিক্রয় করার পর যে পরিমাণ পূর্ণসামগ্রী হাঁড়ি, পাতিল থাকে তা আবার এই পেশার সাথে জড়িতরা স্থানীয় বিভিন্ন হাট-বাজার ও গ্রামে-গঞ্জে বেচা-কেনা করে। বিভিন্ন এলাকায় মৃৎ শিল্পের     

দুর্দিন চললেও একমাত্র রাণীনগর উপজেলায় কয়েকটি গ্রামের পাল পাড়ায় পুরোদমে চলছে মাটির পাতিল তৈরির জমজমাট কর্মযজ্ঞ। এই অঞ্চলের মাটি মৃৎ শিল্পে উপযুগী হওয়ায় ভাল মানের পাতিল তৈরি করায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাহিদা মত পাতিল চালান হচ্ছে। বিশেষ করে ট্রেন যোগে দক্ষিণ জনপদে রাণীনগরের মাটির তৈরি পাতিল বেশি চালান হচ্ছে। চাহিদা বেশি থাকায় দিনদিন এই পাতিলের কদরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক সময় মাটির তৈরি জিনিসপত্রের চাহিদা শূন্যের কোঠায় পৌঁছলেও দিনদিন এর চাহিদা বাড়ার কারণে এই পেশার সাথে জড়িতরা কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু আধুনিক পদ্ধতিতে মাটির পাতিল তৈরির কোন কৌশল কিংবা উন্নয়নের কোন ছোঁয়া পাল পাড়ায় পৌঁছে না। বাপ-দাদারা যেভাবে পাতিল তৈরি করে গেছে ওই আগের পদ্ধতিতেই চলছে তাদের কর্মকান্ড।

সরকারি সহযোগিতা ও উন্নত কারিগরি পরামর্শ পেলে মৃৎ শিল্পের সামগ্রীগুলো আগের মতই ফিরে পাবে ঐতিহ্য এমনটায় আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। কেননা এখন পর্যন্ত বাঙালি জাতির ঐতিহ্যবাহী উৎসবগুলো মৃৎ শিল্পের মাটির তৈরি সামগ্রীর সাথে জড়িত। কুষ্টিয়া থেকে আসা মাটির তৈরি পাতিলে পাইকারি ব্যবসায়ী আরিফুল ইসলাম জানান, আমি প্রায় ৪ বছর ধরে রাণীনগরের গহেলাপুর পালপাড়া গ্রাম থেকে মাটির তৈরি পাতিলসহ নানা সামগ্রী এখান থেকে কিনে নিয়ে ট্রেন যোগে চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, ভেরামারা, দর্শনা এলাকায় খুচরা ও পাইকারি বিক্রি করি। এখানকার পাতিল ভাল হওয়ার কারণে আরও অনেক পাইকার এখানে আসে। প্রতি পিস ছোট সাইজের মাটির পাতিল পাইকারি মূল ৭ টাকা, মাঝারি সাইজের ১০ টাকা এবং বড় সাইজের পাতিল ১৪ টাকা পাইকারি দরে ক্রয় করি। যা নিয়ে গিয়ে খুচরা ও পাইকারি বিক্রি করে আমার ভালই লাভ হয়। একটু কষ্ট হলেও এই মুহূর্তে এটায় আমার প্রিয় ব্যবসা।

গহেলাপুর গ্রামের অর্জন পাল জানান, আধুনিকতার কাছে মৃৎ শিল্পের তৈরি সামগ্রীগুলো টিকতে না পারায় আমাদের এই জাতি ব্যবসা ছেড়ে অনেকেই অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। আমরা ছোট-খাটো মানুষ টাকা-পয়সা তেমন না থাকার কারণে এই পেশা ছাড়তে পারছি না। বিগত কয়েক বছর এই পেশার সাথে জড়িতদের খুব দুর্দিন গেছে। তারপরও আমি পৈতৃক এই পেশা ছাড়িনি। ইদানিং আমাদের তৈরি মাটির পাতিল, হাঁড়ি, কলস, ঝাজর বাজারে কদর বাড়ার কারণে এখন আমাদের ব্যবসাটা কোন মতে চলছে। সরকারি কিছু সুযোগ-সুবিধা পেলে মৃৎ শিল্প ব্যবসাটি ঘুরে দাঁড়াতে পারে।