রাজনৈতিক প্রশ্রয় দুর্নীতিবাজদের বড় অস্ত্র

রাজনৈতিক প্রশ্রয় দুর্নীতিবাজদের বড় অস্ত্র

রাশেদুল ইসলাম রাশেদ : ২০২০ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মের শত বর্ষ পূর্ণ হবে। এর ঠিক পরের বছর ২০২১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপিত হবে। তাই সরকার ২০২০-২১ সালকে মুজিব বর্ষ হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী উদযাপিত হবে ব্যাপকভাবে এবং সকল শ্রেণি পেশার মানুষকে এই উদযাপনের সাথে সম্পৃক্ত করা হবে। শিশু, তরুণ, যুবক সকলের জন্য আলাদা আলাদা কর্মসূচির ব্যবস্থা থাকবে এবং প্রতিটি ইউনিয়নের ওয়ার্ড  তথা গ্রামে গঞ্জে এই আয়োজন বিস্তৃত থাকবে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে আমরা কতটুকু লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছি সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে। কারণ আমাদের দেশে যে হারে দারিদ্র্যের হ্রাস পাচ্ছে ঠিক তার দ্বিগুন হারে বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। গড় মাথাপিছু আয় ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে উন্নয়নের হিসাব কষা হলে এটি একটি মস্তবড় ফারাক পাওয়া যাবে। সুতরাং দারিদ্র্য হ্রাসের তথ্যের  তত্ত্বে যে একটি শুভংকরের ফাঁকি রয়েছে সেটিও আমাদের বুঝতে হবে। রাষ্ট্রের পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোর মৌলিক চাহিদা পূরণে রাষ্ট্র কতটুকু সাফল্য অর্জন করতে পেরেছি সেটি হওয়া উচিত উন্নয়নের মাপকাঠি। কারণ বাংলাদেশে অতি ধনীর সংখ্যা এত দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে যে বিশ্বের বড় বড় পুঁজিবাদী দেশগুলো যেমন- আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ভারত ও চীনের মতো দেশকে পিছনে ফেলে আমরা অতি ধনীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধির তালিকায় স্থান করে নিচ্ছি। অথচ কর দেয়ার সময় করদাতার সংখ্যা খুঁজেই পাওয়া যায় না। তখন আমরা সবাই গরিব হয়ে যাই!  লন্ডন ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ এক্স  বা আলট্রা হাই নেট ওয়ার্থ অনুযায়ী যাদের সম্পদের পরিমাণ তিন কোটি ডলার অর্থাৎ ২৫০ কোটি টাকা বা তার চেয়ে বেশি তাদেরকেই মূলত অতি ধনীর তালিকায় রাখা হয়। একটি পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে বাংলাদেশের ১০ শতাংশ ধনী শ্রেণির হাতে দেশের মোট আয়ের ৩৮ শতাংশ চলে যায় এবং সবথেকে গরিব ১০ শতাংশের হাতে আয় হয় মাত্র ১ শতাংশ। এরকম অস্বাভাবিকভাবে সম্পদ বৃদ্ধির সাথে দুর্নীতির একটি বড় যোগসাজস অবশ্যই আছে। আর এসব দুর্নীতিতে রয়েছে রাজনৈতিক আনুকূল্যতা। অবকাঠামোগত খাত এরকম দুর্নীতির বড়ক্ষেত্র।

 বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে যেখানে ভারতে চার লেনের একটি রাস্তা নির্মাণে কিলোমিটার প্রতি ব্যয় হয় ১১ থেকে ১৩ লাখ ডলার , চীনে ব্যয় হয় ১৩ থেকে ১৬ লাখ ডলার এবং ইউরোপের দেশগুলোতে ব্যয় হয় ২৫ থেকে ৩৫ লাখ ডলার সেখানে আমাদের বাংলাদেশে  ২০১৬ সালে ১৮ নভেম্বর শুরু হওয়া ঢাকা ও মাওয়া চার  লেন বিশিষ্ট ৫৫ কিলোমিটার রাস্তার কিলোমিটার প্রতি নিমার্ণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ কোটি  ১৯ লাখ ডলার। সুতরাং ব্যয়ের দিক থেকে চার লেন রাস্তার নির্মাণে আমরা পৃথিবীর সব রেকর্ড  ছাড়িয়ে গেছি। এভাবেই আমরা একটি নির্দিষ্ট ক্ষুদ্র গোষ্ঠীকে তেল মসলা ঢেলে ফুলে ফেঁপে  ধনিক শ্রেণি বানিয়েছি। ধনীরা আরো বেশি ধনী, বিত্তশালীরা আরো বেশি বিত্তবান এবং গরিবেরা আরো বেশি গরিব হয়ে যাচ্ছে। এখন আমরা একটি ধনিতন্ত্র, শ্রেণিতন্ত্র ও গোষ্ঠীতন্ত্রের মধ্যে জীবিকা নির্বাহ করছি। যেখানে একটি শ্রেণি সারাজীবন ওপর তলায় বসে নিচতলার মানুষগুলোকে তাদের তাবেদার, গোলাম বানিয়ে রাখবে। অবশ্য  অনেকেই বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন কারণ দেশে যে হারে মাথাপিছু আয় ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ছে সেখানে একটি ধনিক শ্রেণি উদ্ভব ঘটবে এটা খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়। সুতারাং  এটা নিয়ে মাথা ঘামানোর কিছু নেই, তবে যাদের  নাক একটু বেশি লম্বা তারা বিষয়টি নিয়ে একটু নাক গলাতেই পারেন, এটি তাদের বাহুল্য দোষ ছাড়া আর কিছুই নয়। আবার এই ধনিক শ্রেণির চুইয়ে পড়া সম্পদ থেকে গড়ে ওঠেছে একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণি। সুতরাং দেশে যে সামগ্রিকভাবে উন্নয়ন হচ্ছে এই ধনিক ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি তারই একটি বড় প্রমাণ। সুতরাং এখানেও কোন কথা বলা যাবে না। কথা বললেই উন্নয়ন বিরোধী এবং সরকার বিরোধীর একটি তকমা লেগে যেতে পারে।

এজন্য প্রথমে আমাদের মূল গলদটাকে খুঁজে বের করতে হবে। আমাদের সমাজব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক কাঠামো ব্যবস্থায় যে ত্রুটি বিচ্যুতি রয়েছে সেগুলোকে খুঁজে বের করতে হবে। আমাদের প্রতিটি শিরা-উপশিরা ও সমাজের প্রতিটি স্তরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে দুর্নীতি, অনিয়ম, ভন্ডামি, ধাপ্পাবাজি ছাপ লেগে আছে সেগুলো খুঁজে বের  করতে হবে।  পুরো দোষ তো আমাদেরই কারণ আমরাই সব সময় পুঁজিবাদকেই বিকশিত করেছি, বুকের মধ্যে আগলে রেখেছি, লালন-পালন করছি এবং এই পুঁিজবাদকে টিকিয়ে রাখার জন্য জানপ্রাণ দিয়ে লড়াই করে যাচ্ছে। আমরা এমন একটি সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছি যেখানে শাসকের কাজই হচ্ছে সবাইকে দমিয়ে রেখে শুধু শাসন আর শোষণ করা। কারণ আমরা প্রচন্ড আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর, সম্পদ লোভী ও ক্ষমতা লোভী। আমরা অনন্তকাল শুধু শাসন করে যেতে চাই আর সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলতে চাই। এটি আমাদের সামাজিক অবক্ষয় ও নৈতিক অবক্ষয়ের একটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল আমরা একটি শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলব। কেউ খাবে তো কেউ খাবে না , তা হবে না তা হবে না। এসব স্লোগান ছিল মুক্তির মূলমন্ত্র। এখনো আমরা আঞ্চলিক বৈষম্যের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছি। কারণ একটি অঞ্চলকে পিছনে ফেলে আরেকটি অঞ্চল এগিয়ে যেতে পারে না। উত্তরাঞ্চল থেকে আমরা মঙ্গা দূর করতে পেরেছি কিন্তু দরিদ্রতা এখনো দূর করতে পারিনি। উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রামে যেখানে ৭১ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নীচে বসবাস করে সেখানে নারায়নগঞ্জে দারিদ্র্যের হার  মাত্র ২.৬ শতাংশ।

 তার মানে নারায়ণগঞ্জকে আমরা যতটা গুরুত্ব দিয়েছি, শিল্পকারখানা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছি কুড়িগ্রামকে সেই বিবেচনায় গুরুত্ব দেয়া হয়নি। এটি একটি বৈষম্যমূলক পদ্ধতি।  এটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পরিপন্থি।  সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার একটা সমতা থাকতে হবে। উন্নয়ন যেন শুধু ঢাকা আর নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রিক না হয়। ধনীকে আরো ধনী বানানো আর গরীবদেরকে ভিজিডি, ভিজিএফ কার্ড দিয়ে কোন মতে বাঁচিয়ে রাখার সুষ্ঠু পরিকল্পনা থেকে আমাদেরকে সরে আসতে হবে। ধনি ও দারিদ্র্যের মধ্যে এখন বৈষম্য বাড়ছে , ধনিদের আয় বাড়ছে এবং গরিবদের আয় কমছে। একটি দেশের বৈষম্য পরিমাপক জিনি সহগ। বাংলাদেশের বিবিএস খায় আয় ও ব্যয় জরিপে তথ্যমতে এই সহগের মান ২০১৬ সালে  ছিল ০.৪৮৩ এবং যা ২০১০ সালে ছিল ০.৪৬৫। তার মানে হচ্ছে দেশে আয় বৈষম্য বাড়ছে। কোন দেশ যদি ০.৫ পেরিয়ে যায় তবে সেই দেশকে উচ্চ আয়বৈষম্যের দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সুতরাং বলা যায় বাংলাদেশ এখন উচ্চ আয়বৈষম্যের তালিকায় প্রায় চলে এসেছে।

এটি আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় একটি বড় অশনিসংকেত। বাংলাদেশ দারিদ্র্যমুক্ত করতে হলে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে, আঞ্চলিক বৈষম্য কমিয়ে উন্নয়নে সমতা আনতে হবে, সম্পদের সুষম বণ্টন করতে হবে। স্থানীয়ভাবে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদী ইউনিয়ন ভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে। অবশ্য সরকার ইতোমধ্যে রূপকল্প-২০২১ সামনে রেখে ‘বাংলাদেশ প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০১০-২০২১)’ প্রণয়ন করে কাজ করেছে। প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০১০-২০২১ ) প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে ’২০২১ সাল নাগাদ দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসকারী জনগণের সংখ্যা (২০১০) ৩১% থেকে (২০২১) ১৩.৫% নামিয়ে আনা যা  ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০১১-১৫) ও সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০১৬-২০) বাস্তবায়নের কাজ চলছে। কিন্তু অসহায়, দরিদ্র, হতদরিদ্র ও দুস্থ মানুষের দোরগোড়ায়  সরকারে সেই সেবা কতটুকু পৌছাচ্ছে সেটিও একটি প্রশ্নবোধক বিষয়। কারণ স্থানীয় ও জাতীয় সব জায়গায় এখন রাজনৈতিক বিবেচনায় সুবিধাভোগীদের বাছাই করা হয়, নেতাদের  ছত্রছায়ায়, আশ্রয় ও প্রশ্রয়ে যারা থাকেন তারাই বেশিভাগ সুবিধাগুলো ভোগ করে থাকেন।

সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সরকারি সেবাসমূহ তেমনটা পৌছায় না। সুতরাং এখানে আমাদেরকে স্বচ্ছতার পরিচয় দিতে হবে। আমরা যদি ২০২১ সালের মধ্যে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত  বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই সেক্ষেত্রে ইউনিয়ন ভিত্তিক পরিকল্পনা অপরিহার্য। সেক্ষেত্রে সরকার পরিচালিত সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীকে আরো জোরদার ও কার্যকর করতে হবে। আমরা যদি প্রতিটি ইউনিয়নকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে পারি তাহলে আমরা দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব। এজন্য প্রতিটি ইউনিয়নকে তাদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে এবং  নিজ নিজ উদ্যোগে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে দারিদ্র্য মোকাবেলায় এগিয়ে যেতে হবে। তবেই আমরা একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব।
লেখক ঃ সংগঠক  ও প্রাবন্ধিক
[email protected]
 ০১৭৫০-৫৩৪০২৮