রাজনীতি থেকে সুশিক্ষা কতদূর.....

রাজনীতি থেকে সুশিক্ষা কতদূর.....

অচিন্ত্য চয়ন : যে জাতি যত শিক্ষিত, সে জাতি তত উন্নতÑএমন পঙ্ক্তির সঙ্গে সবাই পরিচিত এবং স্বীকারও করেন। কিন্তু রাজনীতির জন্য যে সুশিক্ষিত ও মেধাসম্পন্ন নেতা জরুরি তা অনেকেই স্বীকার করতে নারাজ! সমাজ ও রাজনীতিতে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম কারণ শিক্ষা ও রাজনীতির সম্পর্ক পরিপূরক। শুধু একাডেমিক বা উচ্চ শিক্ষার কথা বলছি নাÑ বলছি সুশিক্ষার কথা। চরম বাস্তবতা হচ্ছেÑশিক্ষায় অনগ্রসর কোনো রাষ্ট্রের জনসাধারণও রাজনৈতিক সচেতন নয়, ফলে সেখানে ভোটাধিকারের ব্যবস্থা সরকারি প্রশাসনকে দুর্নীতিগ্রস্ত হতে বাধ্য হয়। শুধু তাই-ই নয়, দুর্নীতিপরায়ণ নেতারা অনুন্নত শ্রেণির মানুষের ভোট কেনার জন্য নানা ভ ামির পথ খুঁজে নেয়। এ ক্ষেত্রে ধূর্ত নেতাদের সফলতাই বেশি। নেতার পক্ষে বোকা জনগণ  ‘ফুলু ভাইয়ের চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র।’ ‘ফুলু ভাই ভালো লোক, জয়ের মালা তারি হোক...’ এমন হাজারো স্লোগানে মুখরিত। ভোট এলেই দেশে যেন উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হয় সবার মনে। মেতে ওঠেন জননেতারা তাদের নির্বাচনী প্রচারণায়। আর তার সঙ্গে মেতে ওঠে সাধারণ  মানুষের জীবন-যাত্রা। সাধারণ মানুষ তখন হয়ে পড়েন অসাধারণ মূল্যবান সম্পদ। তখন দেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ তাদের হাতেই থাকে বন্দি।  জয়পরাজয়ের জাদুরকাঠির মালিক মূলত এ সাধারণ মানুষেরাই। কারণ আমরা গণতান্ত্রিক দেশে বসবাস করি। সাধারণ মানুষের এক একটি ভোটের মাধ্যমে  নির্বাচনের ব্যালট বাক্স ভরে যায়। আর এই ভোটদাতারা হলেন দেশের প্রকৃত নাগরিক, সাধারণ জনগণ। তারাই হলেন, আমাদের দেশের মতো গণতান্ত্রিক দেশের সরকার গঠনের হাতিয়ার।

রাজনৈতিক দলগুলো যাদের কাঁধে ভর করেই টিকে থাকে। হাজারো প্রতিশ্র“তির খসড়া পৌঁছে দেয়া হয় বোকা জনগণের কানে। দেখানো হয় রঙিন স্বপ্ন। রঙিন স্বপ্নের ফানুস বানিয়ে ঝুলিয়ে দেয়া হয়। নেয়া হয় নানান কর্মকা  জনগণের মনকে আকৃষ্ট করার জন্য। তাদের রাখা হয় নেতাদের মাথার মুকুট করে। তখন ফুটপাতে শুয়ে থাকা নোংরা কাপড়ে মোড়া সাধারণ ভিক্ষুককেও গলায় জড়িয়ে নিয়ে, বুকে আলিঙ্গন করতে, একবিন্দুও ঘৃণা হবে না আমাদের ভোটপ্রার্থীদের। তখন সবাই মানুষ হয়ে ওঠে তাদের কাছে। জনগণের খাওয়া, ঘুম হারাম করে তোলেন তারা এ সময়ে। আর নির্বাচন শেষ হলে তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না। এ যেনÑ‘কাজের সময় কাজি আর কাজ ফুরালেই পাজি।’ এ সময়ে আকাশের নক্ষত্রদের পতন ঘটে, বুক থেকে নেমে আসে মাটিতেÑশুরু হয় অবহেলা করা। কারণ মাটিতেই তো তাদের বাসÑ মাটির ছোট্ট ঘরে, ছোট্ট পিদিম। যা তাদের আঙিনাজুড়ে মিট মিট করে জ্বলতে থাকে। এই মাটির মানুষের সেই মিট মিট করে জ্বলা, পিদিম বাতির আলোই তোদের ক্ষমতার উৎস। আর আমরা যারা অসহায় হতদরিদ্র জনগণ তারা বড্ড বোকা। সব ভুলে আপন করে নেই সেই দূরের আকাশের নক্ষত্রদের। তাদের মিথ্যা প্রতিশ্র“তিতে হয়ে যাই অন্ধ। হাতে তুলে নেই আবারো ব্যালট পেপার। আবারো নির্বাচন করি সেই তাদের, যারা আমাদের ভুলে যাবে। পরিস্থিতি রবীন্দ্রনাথের ‘কুটুম্বিতা’ কবিতার মতোÑ‘কেরোসিন শিখা বলে মাটির প্রদীপে, ভাই বলে ডাকো যদি দেবো গলা টিপে। হেনকালে গগণেতে উঠিলেন চাঁদ, কেরোসিন বলি উঠে, এসো মোর দাদা..’।

 মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে আমাদের নেতারা এক প্লেটে বসে ক্ষুধার অন্নও ভাগ করে খেতে প্রস্তুত থাকেন। আর নির্বাচনে জয়লাভের পর সেই অসহায় জনগণদের খোঁজ নিতে পারে না, নেয়ার চেষ্টাও করে না। দুঃখজনক হলেও সত্যÑকোন নেতা ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় জনগণের দুঃখ-সুখের খবর নিতে দ্বারে দ্বারে যাওয়া তো দূরে থাক তাদের নিয়ে চিন্তা করার মতো সময়-সুযোগ তাদের থাকে না! গোঁফ খেঁজুরে এসব বিড়াল তপস্বীরা হয়ে পড়েন তখন নেতাদের কাছের মানুষ। সেই বোকা জনগণকে কোনো কাজে গুনতে হয় চা-পানের খরচ। প্রতিশ্র“তি ও স্বপ্ন হয়ে যায় বিবর্ণ হতাশার চাদর। বর্তমান এটাই  আমাদের নেতাদের সংস্কৃতি।
এখানেই থমকে যেতে হয়Ñএখানেই প্রশ্ন আসে নানা রকম, প্রশ্ন আসে রাজনীতি থেকে সুশিক্ষা কতদুর? গুরুত্ব আসে শিক্ষার! শিক্ষা ছাড়া কোনো মানুষ তার মেধা বিকশিত করতে পারে না। আর মেধা বিকশিত না হলে কোনো মানুষই রাজনীতি কিংবা ব্যবসাÑকোনো ক্ষেত্রেই পরিপূর্ণভাবে সফলতা অর্জন করতে পারে না। তাই একজন মানুষকে পরিপূর্ণভাবে মানুষ হতে হলে তার জীবনে শিক্ষা একান্ত প্রয়োজন। শিক্ষিত মানুষ দেশ ও জাতির সম্পদ। তার কাছ থেকে জাতি পেতে পারে দেশকে সঠিকভাবে পরিচালনা করার পরিকল্পনা। একজন শিক্ষিত মানুষ ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি, রাজনীতি যে কোনো কর্মে প্রবেশ করলেই তার জীবনে সফলতা আসতে পারে।

 কারণ সে তার মেধা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী কর্মপরিচালনা করে। তাই দেশের প্রতিটা নাগরিকের শিক্ষা গ্রহণ করা একান্ত কর্তব্য। দেশের শিক্ষিত লোকেরাই দেশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য কাজ করে থাকে। দেশ ও দেশের মানুষের সেবার মনমানসিকতা নিয়ে যারা রাজনীতি করে তাদেরও শিক্ষার প্রয়োজন আছে। কারণ একজন শিক্ষিত রাজনৈতিক নেতা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে তার কাছ থেকে দেশের মানুষ সঠিক দিকনির্দেশনা পেয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। একজন সুশিক্ষিত রাজনৈতিক নেতা তিনি দেশের ও দেশের মানুষের কাছে অহংকার। ভালো রাজনীতিক হতে হলে প্রয়োজন দৃঢ়তা, মোটিভেশন, কমিটমেন্ট এবং কথা বলা ও কথা বোঝানোর দক্ষতা। এ জন্য প্রয়োজন শিক্ষা ও রাজনৈতিক সচেতনতা। সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে রাজনৈতিক শিক্ষা নিতে হবে। তবে এটাও সত্য যে, দেশের সেরা রাজনীতিক হওয়ার জন্য উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন নেইÑপৃথিবীতে যে একশ’টি ভাষণ বিখ্যাত তার অনেক বক্তাই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত নন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। একজন রাজনীতিকের জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতার বিধান  করার প্রয়োজন নেই কিন্তু সুশিক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের ও দুঃখজনক ব্যাপার হলো, আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা সেসব দেশে অতি উন্নতমানের অত্যাধুনিক টেকসই দৃষ্টিনন্দন নির্মাণ ও বিভিন্ন সেবামূলক কাজ করছে। কিন্তু দেশের ভেতরে আমরা তাদের কাজে লাগাতে পারছি না। এ ক্ষেত্রে রাজনীতিকদের ভাবতে হবে। এখানে নোংরা রাজনীতির কিংবা রাজনীতি নিয়ে নোংরামিও দায়ী হতে পারে। তা না হলে আমাদের অর্থনীতি, শিক্ষা, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান খাতগুলো এত পিছিয়ে কেন? স্বাধীনতার ৪৭ বছর কি একটি জাতির জন্য কম সময় ও সুযোগ? এ হতাশাজনক ও লজ্জাকর পরিস্থিতির কবে অবসান হবে? বর্তমানে সাধারণ মানুষ রাজনীতিসচেতন নয়, তাই তথাকথিত নেতারা এদের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে শোষণ করছেন।

রাজনীতিকদের মতলব কেবল ক্ষমতা দখল করা, তারা সব সময় কাদা ছোড়াছুড়িতে মত্ত থাকে। এমন মানসিকতার নেতারা সমাজের কোনোই কাজে আসবে নাÑ এমনটি সত্য! কিন্তু এভাবে চলতে পারে না। সচেতন মানুষের কর্তব্য রাজনৈতিক ভন্ডদের চিহ্নিত করে তাদের সমাজসেবার মুখোশ উšে§াচন করা। ভুলে গেলে চলবে নাÑ ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। জর্জ সান্তায়ানার একটি বহুল উচ্চারিত উক্তিÑ‘যারা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না, তাদেরকে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির মাশুল গুনতে হয়।’ মানবসভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এর বহু দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু স্টিভ এরিকসন বলছেনÑ‘ইতিহাসের অন্যতম শিক্ষা হলো, ইতিহাস থেকে মানুষ সাধারণত শিক্ষা নেয় না, এর পরিণতি যত অনাকাক্সিক্ষত এবং মূল্য যত উচ্চই হোক।’ বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসেও এর ভূরি ভূরি উদাহরণ রয়েছে। তাই ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ একজন নেতার জন্য জরুরি। নেতার কমিটমেন্ট এবং জনগণের সমর্থন আদায়ের দক্ষতা ও জনগণের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের ক্ষমতা থাকতে হবে। তবেই দেশের সব কিছুতে শৃঙ্খলা আসবে।বর্তমান বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক দৈন্যদশা চলছে তার জন্য শিক্ষিত সমাজ বহুলাংশে দায়ি। জাতীয় স্বার্থে দেশ গড়ার যথার্থ কর্মীকে স্বীকৃতি দিতে এগিয়ে আসতে হবে। রাজনীতি নয়, জাতীয় স্বার্থে কৃত উচ্চমানের কর্মই সাফল্যের মাপকাঠি-এ ধারণা যত বদ্ধমূল হবে, দেশ তত দ্রুত সাফল্যের পথে এগোবে। বর্তমান দেশের রাজনীতি থেকে সুশিক্ষা কতদুরÑএ প্রশ্নের উত্তর মিললেই সমস্যা চিহ্নিত হবে। সমাধান মিলবে সব সংকটের। ভালো থাকবে জনগণ, ভালো থাকবে স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট
[email protected]
০১৭২১-৫৬৫২১৮